ঢাকাঃ চিকিৎসক হতে হলে মানবদেহকে সঠিকভাবে জানা চাই। এ জন্য মেডিকেল শিক্ষার্থীদের দরকার মৃত মানুষের হাড় ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। বিশ্বের অনেক দেশে ডামি বা কৃত্রিম হাড়ের সাহায্যেই হয় এই পাঠদান। আমাদের দেশে চাইলেও এখনই চট করে সে পথে হাঁটা কঠিন। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আলাদা একটা ব্যবস্থা দাঁড় করাতে হবে। ফলে আমাদের এখানে এখনো মানবকঙ্কালই ভরসা। মানবকল্যাণে যিনি নিজের দেহ দান করে যান, তাঁর হাড় ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাজে লাগে বছরের পর বছর। তবে পুরো চাহিদা এভাবে মেটে না। তাই শিক্ষার্থীদের হাতে এমন অনেক মানুষের হাড় পৌঁছায়, যিনি নিজের দেহ দান করে যাননি। একে কেন্দ্র করে ব্যবসাও চলে। সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, হাড়ের জোগান দিতে অসাধু ব্যক্তিরা কবর থেকে লাশ চুরি করেন।
মানবদেহকে পণ্যের মতো কেনাবেচার এই ঘটনাগুলো থামাতে উদ্যোগ নিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। গড়ে তুলেছেন ‘ডিএমসি বোনস ব্যাংক’।
হাড়ের হাতবদল
একজন শিক্ষার্থী যে হাড়ের সেট নিয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন, তিনি পরের ব্যাচের কারও কাছে তা বিক্রি করে দেন। এটাই প্রচলিত ব্যবস্থা। সময়ের সঙ্গে হাড়ের দামও বাড়তে থাকে। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য তা কেনা বেশ কষ্টসাপেক্ষ। এক সেট হাড়ের দাম ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। সেটে খুঁত থাকলেও দাম পড়ে অন্তত ২৫ হাজার টাকা। অথচ নীতিগত বিবেচনায় মানবদেহের কোনো অংশ এভাবে কেনাবেচা হওয়ারই কথা না। বরং একজন শিক্ষার্থী যে হাড়ের সেট নিয়ে পড়ালেখা করেছেন, তা যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংগ্রহ করা যায়, তাহলে বছরের পর বছর বিনা মূল্যেই সেসব হাড় কাজে লাগাতে পারবেন শিক্ষার্থীরা।
এ ভাবনা থেকেই হাড়ের সেট নিয়ে একটি ‘বোনস ব্যাংক’ গড়ে তোলার কথা ভেবেছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের কে-৭৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী এনামুল করিম। ফেসবুক গ্রুপে সেই ভাবনা ভাগ করলে সাগ্রহে সাড়া দেন এহতেশাম সামিসহ আরও কয়েকজন বন্ধু। অন্যান্য ব্যাচেও হয় সেই ভাবনার অনুরণন।
বাধা পেরিয়ে
বোনস ব্যাংক তৈরির ভাবনাটা তখন অবশ্য খুব বেশি দূর এগোতে পারেনি। তখন হাড়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। রাজনৈতিক চক্রের হাত থেকে ব্যবসাটাকে বের করে মানবিক রূপ দেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল, জানালেন এনামুল ও এহতেশাম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বদলে যায় দৃশ্যপট। কারও চোখরাঙানির ভয় নেই। এই সময় কে-৭৮ ব্যাচের পক্ষ থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অফিশিয়াল গ্রুপে পোস্ট করা হয় বোনস ব্যাংকের ভাবনা। উদ্যোগটিকে স্বাগত জানান অন্যান্য ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। পুরোনোরাও এগিয়ে এলেন। অ্যালামনাইদের থেকেও এল নানা রকম সহযোগিতা। মাত্রই প্রথম পেশাদার পরীক্ষা শেষ হওয়ায় সবচেয়ে বেশি হাড়ের সেট ছিল কে-৮০ ব্যাচের কাছে। তারাই জোগাল ব্যাংকের অধিকাংশ হাড়ের সেট। অন্যরাও এগিয়ে এলেন। যেসব সেটের কোনো হাড় কম ছিল, সেগুলো পূরণ করার জন্য কেনা হলো কৃত্রিম হাড়। হাড়ের সেট রাখার জন্য অগ্রজদের অনুদানে ছোট ট্রাংক কেনারও ব্যবস্থা হলো।
গোছানো এক ব্যাংক
নবীনতম ব্যাচ কে-৮২–র ১২৪ জন শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ৪১ সেট হাড়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মো. কামরুল আলম, উপাধ্যক্ষ ডা. ফারুক আহাম্মদ এবং অন্য শিক্ষকদের উপস্থিতিতে গত ১৩ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে বোনস ব্যাংক। এই ব্যাংকের দারুণ একটা ওয়েবসাইটও আছে; তৈরি করেছেন কে-৭৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী সিফাত বিন সিদ্দিক। https://dmcbonesbank.org/ ঠিকানায় সংরক্ষিত আছে ব্যাংকের সব তথ্য। কোন শিক্ষার্থী কোন হাড়ের সেট পেয়েছেন, সেই হিসাব যেমন আছে; তেমনি তা ঠিকঠাক ফেরত এল কি না, রাখা হবে সেই হিসাবও। কে-৮০ ব্যাচের শিক্ষার্থী হালিমা তুস সাদিয়া বলছিলেন, ‘একটা সময় বোনস ব্যাংকের সব হাড় কৃত্রিম হাড় দিয়েই প্রতিস্থাপনের ইচ্ছা পোষণ করি আমরা।’ এহতেশাম যোগ করলেন, সেই সময় মৃত মানুষদের হাড় যথাযথ মর্যাদায় সমাধিস্থ করার ব্যবস্থাও করা হবে। মানবদেহের অবমাননাকর ব্যবসা বন্ধের লক্ষ্যে এ এক সম্মিলিত প্রতিজ্ঞা।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/৩১/০৮/২০২৫
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
