রাজনৈতিক বৃত্তের বাইরে শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব পাচ্ছেন রেহানা পারভীন

আল আমিন হোসেন মৃধা, ঢাকাঃ  শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের শূন্য থাকা সচিবের দায়িত্ব পাচ্ছেন জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যানের (সচিব) ও প্রশাসন ক্যাডারের ত্রয়োদশ ব্যাচের কর্মকর্তা রেহানা পারভীন (৬১০৫)। 

গত ২১শে জুলাই রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনার পর চলমান এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতকরণ প্রশ্নে সিদ্ধান্তহীনতা এবং সেই থেকে দেশব্যাপী ক্ষোভ-বিক্ষোভ নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের তৎকালীন সিনিয়র জ্যেষ্ঠ সচিব সিদ্দিক জোবায়েরকে প্রত্যাহার করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর থেকে পদটি শূন্য রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মজিবর রহমানকে রুটিন দায়িত্ব দিয়ে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল মন্ত্রণালয়টি। 

রেহানা পারভীনই পরবর্তী শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব পাচ্ছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ ও প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। 

রেহানা পারভীন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সচিব পদে পদোন্নতি পেয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে তিনি পরিকল্পনা কমিশন এর শিল্প ও শক্তি বিভাগ এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর আওয়ামী সরকারের শেষ সময়ে তিনি বেশ কিছুদিন ওএসডি ছিলেন। গত ৩ জুলাই  তিনি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যানের (সচিব) দায়িত্ব অদ্যবধি পালন করে আসছেন।

বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ত্রয়োদশ ব্যাচের সদস্য হিসেবে ২৫ এপ্রিল ১৯৯৪ তারিখে জনাব রেহানা পারভীন বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। রেহানা পারভীন এর নিজ জেলা নোয়াখালী। পিতা মরহুম এ. কে. এম রুহুল আমিন ও মাতা মরহুম পেয়ারা বেগম। পিতার কর্মসূত্রে শৈশব, কৈশোর ও শিক্ষা জীবন কেটেছে রাজধানী ঢাকা শহরে। অধ্যয়ন করেছেন মতিঝিল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, মতিঝিল আইডিয়াল হাই স্কুল, হলিক্রস কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন ছাড়াও পরবর্তীতে AusAid প্রোগামের আওতায় তিনি Australian National University (ANU), Canberra, Australia থেকে Masters in Economics of Development ডিগ্রী অর্জন করেন। এছাড়াও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ হতে Post Graduate Diploma in International Relations (PGDIR) এবং Institute of Business Administration (IBA) হতে Advanced Certificate in Business Administration (ACBA) সনদ অর্জন করেছেন জনাব রেহানা পারভীন। চাকুরিজীবনে MATT-2, MATT-2 stage 2 (Bradford University, UK), Change Management (North-South University, Dhaka and Civil Service College, Singapore), Financial Programming and Policies (IMF Institute, Washington, USA), Macroeconomic Model Building for Bangladesh economy (KDI, Bank of Korea), Fiscal Policy and Macroeconomic Management (IMF Institute, Singapore) সহ দেশে-বিদেশে নানাবিধ প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণ করেছেন তিনি।

মাঠ প্রশাসনে প্রায় ১২ বছরের চাকুরিকালে তিনি টাঙ্গাইল, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ জেলায় ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলায় কর্মরত ছিলেন। মন্ত্রণালয় পর্যায়ে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়ে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এপিডি অনুবিভাগ, সিপিটি অনুবিভাগ, উন্নয়ন অনুবিভাগ এর বিভিন্ন শাখায় তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। অর্থ বিভাগে তিনি কাজ করেছেন সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনুবিভাগ, ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ এবং বাজেট ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগে। এছাড়া, অর্থ বিভাগ এর Institute of Public Finance (IPF), Bangladesh এর মহাপরিচালক এবং জাতীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন তহবিল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালনের সুযোগ হয়েছে তাঁর।

সরকারের সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের পরিধি খুবই বড়। এ বিভাগের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, সরকারি বেসরকারি কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় শাখা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য কর্মকান্ডে মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অপরিসীম। এছাড়াও সরকারি কলেজগুলোতে হাজার হাজার বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডার শিক্ষকরা কর্মরত রয়েছেন এই বিভাগের। শিক্ষাঙ্গনে উদ্ভুদ যে কোন পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এসে থাকে এখান থেকে। নির্বাহী ক্ষমতাবলে মন্ত্রণালয়ের সচিবই এখানকার আদেশ-নির্দেশনা জারি করে থাকেন। কিন্তু গত এক মাস ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগ সচিব ছাড়াই চলছে। সেখানে সচিবের রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (কলেজ অনুবিভাগ) মোঃ মজিবর রহমান। গত ২১ জুলাই রাজধানী ঢাকা উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বাহিনীর জেট বিধ্বস্ত হওয়ার পর ছাত্রদের বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে ২২ জুলাই এই বিভাগের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়েরকে প্রত্যাহার করা হয়। তারপর থেকেই পদটি শুন্য রয়েছে। সচিব না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আটকে থাকছে। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে দ্রুত সচিব নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর যোগ্য কর্মকর্তাদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করা হয়। এ খবর জানাজানির পর দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের সমর্থক কর্মকর্তাদের পক্ষে শুরু হয় তদবির। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ঘরনা ও বিসিএস নবম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. সামসুল আলমকে চুক্তিতে সিনিয়র সচিব নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সার-সংক্ষেপ প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়। এর আগে শামসুল আলমকে সিনিয়র সচিব পদে নিয়োগ দিতে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টা স্বাক্ষর করেছেন। কিন্তু আমলা সিন্ডিকেট তাকে সচিব হিসেবে নিয়োগ না দিয়ে তালবাহানা শুরু করে। গত নয় মাসে চাকরিরত অবস্থায় শামসুল আলম অবসর গ্রহণ করেন। এর আগেও অর্থ উপদেষ্টা তাকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছেন। কারণ তিনি আওয়ামী লীগের আমলে ১৮ বছর ধরে বঞ্চিত। তারপরও তার নিয়োগ কার্যকর করেনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব। এদিকে জামায়াত সমর্থক কর্মকর্তা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলামকে ওই বিভাগে সচিব হিসেবে পদায়নের জোর লবিং শুরু হয়েছে। মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন প্রায় সব দপ্তর, মাধ্যমিক  ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন অধিদপ্তরের অনেক পদে জামায়াত মতাদর্শের ব্যক্তিদের পদায়ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। এছাড়াও পাঠ্যপুস্তকে জামায়াতের মতাদর্শ পুশইন করার সর্বোচ্চ চেষ্টাও করেছিলেন এই আমলা।  জামায়াত সমর্থক কর্মকর্তা হওয়ায়  বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে তাকে পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়েছিলো। অতি সম্প্রতি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে অবসর উত্তর ছুটিতে (পিআরএল) গেছেন তিনি। তাঁর পিআরএলের দিন তাকে সিনিয়র সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে জামায়াতের লবিংকারীদের খুশী করে সরকার। 

জানা গেছে, বিএনপি এবং জামায়াতের তরফ থেকে জোর তদবির চালানোয় দোটানোয় পরে আমলারা। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দুটি দল থেকে বিভিন্ন সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে প্রভাবিত করা হচ্ছে। যে কারণে সচিব নিয়োগ দিতে পারছে না। তাই সব কিছু নির্ভর করছে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর। প্রধান উপদেষ্টার চুড়ান্ত নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে অন্তর্বর্তী সরকার এই বিভাগে সচিব নিয়োগ দিতে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে গুরুত্বপূর্ণ এ বিভাগে সচিব নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কারণ এর আগেও সচিব নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক হওয়ায় সেই সমালোচনা থেকে মুক্ত হতে চাইছে সরকার। ফলে সবকিছু বিবেচনায় প্রশাসন ক্যাডারের ত্রয়োদশ ব্যাচের কর্মকর্তা রেহানা পারভীনকে যোগ্য মনে করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। 

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১৮/০৮/২০২৫   


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.