নায়েমেই কর্মজীবন ফ্যাসিস্ট আমলের কর্মকর্তা সাবিহাকে নায়েমের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন

আল আমিন হোসেন মৃধা, ঢাকা: ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে হাসিনার আস্থাভাজন অথবা তার আস্তাভাজনের নিকটাত্বীয় হলেই সেই কর্মকর্তা পদ পেতেন ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কোনো দপ্তরে। হাসিনার আমলে ঢাকার বাহিরে চাকরি করার প্রয়োজনই হয়নি তাদের। এমনই এক কর্মকর্তা সাবিহা ইয়াসমিন। যিনি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ইতিহাস বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক ও  জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) এর প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ। একযুগের বেশি ধরে চাকরি করছেন এই দপ্তরে। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালালেও এই কর্মকর্তাকে বদলি হতে হয়নি। গত ১৩ আগষ্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে নায়েমেই সহকারী পরিচালক (কমন সার্ভিস) পদে পদায়ন করেছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৬ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সহকারী অধ্যাপক সাবিহা ইয়াসমিন প্রায় এক যুগ ধরে নায়েমে কখনো সহকারী পরিচালক আবার কখনো প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। সাবিহা ইয়াসমিনের বোনের স্বামী (দুলাভাই) বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের সাবেক সচিব মুহাম্মদ আব্দুল হামিদ জমাদ্দার ছিল তার সকল ক্ষমতার উৎস। তার হাত ধরেই তিনি একই কর্মস্থলে কর্মরত রয়েছেন। পাঁচ আগস্টের পর নিজেকে ফ্যাসিবাদবিরোধী জাহির করে একই কর্মস্থলের সহকারী পরিচালক পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। 

নায়েম সূত্রে জানা গেছে, নায়েমের সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পদে কর্মরত থাকাকালীন সাবিহা ইয়াসমিন ২০২২ সালের শেষের দিকে নায়েমের মহিলা প্রশিক্ষণার্থীদের পোশাকের টাকা আত্মসাৎ, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তোলাসহ একাধিক অভিযোগে নায়েমের মহাপরিচালক (তৎকালীন) তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের তৎকালীন সচিবকে অবহিত করেন। এরপর তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে তাকে ওএসডি করার সিদ্ধান্ত নিলেও সাবিহা ইয়াসমিন তার দুলাভাই ফ্যাসিস্ট হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহচর সচিব মুহাম্মদ আব্দুল হামিদ জমাদ্দারকে দিয়ে ইডেন কলেজে পদায়ন বাগিয়ে নেন। ২০২৩ সালের ২৬ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ তাকে ইডেন কলেজে পদায়ন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এরপর বছর পেরোতে না পেরোতেই সাবিহা ইয়াসমিন ২০২৪ সালের ৯ জুন  নায়েমের প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রেষণে পদায়ন বাগিয়ে নেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের দাপুটে এই কর্মকর্তা নায়েমের অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে তটস্থ করে রাখতেন তার প্রভাবে। কেউ কিছু বলার সাহস পর্যন্ত করতে পারেননি সে সময়। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নায়েমের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেন, হাসিনা আমলের দাপুটে এই কর্মকর্তা এক যুগ ধুরে নায়েমকে স্থায়ী কর্মস্থলে পরিণত করে সহকারী হোষ্টেল সুপার থেকে শুরু করে এসইডিপি স্কিমের বিভিন্ন প্রশিক্ষণসহ নায়েম এর নিয়মিত প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত কোর্ডিনেশনকে সিন্ডিকেট এ রুপান্তর করেছেন। নারী কর্মকর্তা হওয়ায় তার বাজে আচরণ স্বত্বেও তাকে কিছু বলা যায় না। নানা রকম ভয়ভীতি দেখান। পাঁচ আগস্ট পট পরিবর্তনের ফলে তিনি বদলি হবেন এমনটাই প্রত্যাশা ছিল শিক্ষা ক্যাডারে। তবে পাঁচ আগস্টের পরে সাবিহা ইয়াসমিন নিজেকে ফ্যাসিবাদবিরোধী দাবি করে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করে নিজেকে জুলাই যোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করেছেন। শেখ হাসিনা পালালেও তাকে বদলি করা তো হয়ই নাই গত ১৩ আগস্ট ২০২৫ তারিখে তাকে নায়েমেই সহকারী পরিচালক (কমন) পদে পদায়ন করা হয়েছে। 

জানা গেছে, ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পটপরিবর্তনের পরপরই দ্রুত রং পরিবর্তন করে বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের সমালোচনাকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি নায়েম এর প্রশাসনিক পদে কর্মরত কর্মকর্তাদের সাথে সিন্ডিকেট করে নায়েমকে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করছেন। দেশের প্রায় সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক রদবদল হলেও নায়েম-এর উল্লেখযোগ্য কোনো রদবদল হয়নি অথচ এখানে অনেক অযোগ্য কর্মকর্তারা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চাকুরি করছেন। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় ৫ আগষ্ট ২০২৪ পরবর্তী সময়েও তিনি নিয়মিত নিজের সাবেক সচিব দুলাভাইসহ বিতর্কিত কর্মকর্তদের অতিথি বক্তা হিসেবে নায়েম-এ নিয়ে এসেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নায়েমের এক কর্মকর্তা বলেন, সাবিহা ইয়াসমিনের প্রশিক্ষণ দেবার সক্ষমতা খুবই নিম্নমানের এবং তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মনের ব্যাপক অভিযোগ আছে। এক যুগের বেশি সময় ধরে একই কর্মস্থলে কর্মরত বিতর্কিত এই কর্মকর্তাকে মন্ত্রণালয় কর্তৃক গুরুত্বপূর্ণ পদে ফের পদায়ন অত্যন্ত বিপদজনক, বিষয়টি তদন্তের দাবী রাখে।

এক যুগের বেশি নায়েমে কর্মরত থেকেও ফের কিভাবে পদায়ন বাগিয়ে নিলেন জানতে চেয়ে সাবিহা ইয়াসমিনের মুঠোফোনে কল করলে তার মুঠোফোনের সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলের নায়েমের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. মো: জুলফিকার হায়দারের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। 

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১৫/০৮/২০২৫


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.