।। মো: জসিম উদ্দিন আহমেদ ।।
প্রত্যেকটি সরকারের আমলেই কম-বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হয়েছে। ইতিহাস বলছে, কখনও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য, কখনও জনপ্রিয়তা অর্জনের লক্ষ্যে—প্রতি সরকারই শিক্ষকদের দাবিকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে। কিন্তু শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের মূল দাবি, সর্বস্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, আজও বাস্তবায়ন হয়নি।
বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক প্রবাহে যেমন জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তেমনি শিক্ষক আন্দোলনও নতুন রূপ নিচ্ছে। প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল জনতার ভালোবাসা পেতে নানামুখী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এনসিপি বলছে ধারাবাহিকভাবে জাতীয়করণ করা হবে। আসলে এটি নতুন কিছু নয়—প্রতি মাসেই কিছু প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হচ্ছে, তবে তা নির্বাচিত ও সীমিত পর্যায়ে। এতে বৃহত্তর শিক্ষকমহলের দাবি পূরণ হচ্ছে না।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয়ের একটি বড় অংশ সরকারি কোষাগারে জমা হয়। অর্থাৎ, কাঠামোগত পরিবর্তন আনলেই এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনায়াসে জাতীয়করণ করা সম্ভব। কিন্তু বর্তমান সরকারের উচিত ছিল একটি স্বচ্ছ হিসাব কমিটি গঠন করে শিক্ষকদের দাবির যথার্থতা যাচাই করা। সেই উদ্যোগ না নিয়ে বরং আবারও রাজনৈতিক বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে—যা বিগত সরকারগুলোর মতোই গতানুগতিক।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামি জাতীয়করণের দাবির পক্ষে কথা বলেছে, কিন্তু বাস্তবতা তারা ভালো করেই জানে—এই সরকার জাতীয়করণ করবে না। বিএনপিও বর্তমানে নীরব, যদিও নির্বাচনের আগে তারা বলেছিল জাতীয়করণ করবে। এককথায়, আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এই ইস্যু বারবার ব্যবহৃত হয়েছে রাজনৈতিক খেলার অংশ হিসেবে।
শিক্ষকদের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর প্রয়োজন
সাধারণ শিক্ষক-কর্মচারীরা মনে করেন, এখন আর খণ্ডিত আন্দোলনে কাজ হবে না। জাহেরি নেতৃত্বের অবসান ঘটিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করাই সময়ের দাবি। শিক্ষক নেতা মো. জসিম উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেন,
> “আমরা চাই, রাজনীতির বাইরে থেকে আমাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন। যারা শিক্ষক সমাজের নামে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করে আন্দোলনকে দুর্বল করেছে, তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। ঐক্যবদ্ধ না হলে জাতীয়করণের দাবি কখনো বাস্তবায়ন হবে না।”
কেন জাতীয়করণ জরুরি?
শিক্ষার মানোন্নয়ন: সরকারি তত্ত্বাবধানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে।
শিক্ষক মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা: শিক্ষক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার। জাতীয়করণ হলে আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত হবে।
অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য দূর হবে: বর্তমানে গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বঞ্চনার শিকার। জাতীয়করণে সেই বৈষম্য কমবে।
শিক্ষকরা আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির আশায় বসে থাকতে রাজি নন। মো. জসিম উদ্দিনের মতে,
> “জাতীয়করণের বিষয়টি রাজনৈতিক দলের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। আমরা চাই শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে পরিষ্কার বার্তা—রাজনীতির বাইরে থেকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন।”
সমাধানের পথ:
১. স্বচ্ছ জরিপ ও হিসাব কমিটি গঠন
২. ধাপে ধাপে সব এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ
৩. আইনগত সুরক্ষা প্রদান
৪. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নীতি বাস্তবায়ন
বিগত দিনে বিএনপি সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষক – কর্মচারীদের জন্য অপরাপর সরকারগুলোর তুলনায় একটু বেশি কাজ করেছে। তাছাড়া জাতীয়করণের দাবিটি প্রথম বিএনপি নেতৃত্বের শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়ার পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়েছে এবং বেগম খালেদা জিয়া ২০০৬ এর পরবর্তী সময়ে ৩ বার বলেছেন, পরবর্তীতে বিএনপি সরকার গঠন করলে এমপিওভুক্তদের চাকরি জাতীয়করণ করবেন।শিক্ষক সমাজ বিশ্বাস করে, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এই বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়। কিন্তু যদি রাজনৈতিক নেতাদের মুখের কথায় বিশ্বাস করা হয়, তবে আন্দোলন কখনো শেষ হবে না, দাবি পূরণও হবে না। তাই এখন একটাই দাবি—ঐক্যবদ্ধ শিক্ষক আন্দোলনই সময়ের প্রয়োজন।
লেখক : মহাসচিব, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৪/০৮/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
