এইমাত্র পাওয়া

ঢাকায় মানবাধিকার কার্যালয় নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপনে অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। আপাতত তিন বছরের জন্য অনুমোদিত এ কার্যালয়ের কার্যক্রম দুই বছর পর মূল্যায়নের আওতায় আসবে, তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে মেয়াদ বাড়ানো হবে কিনা। গত ২৯ জুন এ সংক্রান্ত খসড়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নীতিগতভাবে অনুমোদন দেয় উপদেষ্টা পরিষদ। তবে এ সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং নাগরিক মহলে দেখা দিয়েছে মতপার্থক্য ও বিতর্ক। কেউ এটিকে বাংলাদেশের মানবাধিকার উন্নয়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন, এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও আত্মনির্ভরতার ওপর এক ধরনের প্রশ্ন চিহ্ন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় বিশ্বের ১৮টি দেশে সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, দক্ষিণ সুদান, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো), বুরকিনা ফাসো, তিউনিসিয়া, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, ফিলিস্তিন, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, কম্বোডিয়া, গুয়াতেমালা, কেনিয়া ও উগান্ডা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ দেশগুলো রাজনৈতিক অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ, সংঘাত বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর ইতিহাস বহন করে।

এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জাতিসংঘের একটি আঞ্চলিক মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপনের অনুমোদন অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হয়েছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এ বিষয়ে বলেনÑ এটি কোনো হস্তক্ষেপ নয়, বরং উন্নয়ন সহযোগিতা। জাতিসংঘ কারিগরি সহায়তার ভিত্তিতে কাজ করবে। মানবাধিকারসংক্রান্ত জাতীয় প্রচেষ্টা আরও কার্যকর করতে এ অফিস ভূমিকা রাখবে।

তবে রাজনৈতিক মহলের অনেকেই এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। হেফাজতে ইসলামসহ ইসলামি ও বাম দলগুলো এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলছে, এটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থার সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এতে দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাদের ভাষায়, বাংলাদেশে কোনো গৃহযুদ্ধ চলছে না, ভয়াবহ সংঘাত নেই, জাতিগত নিধনের ঘটনাও নেই। তাহলে কেন হঠাৎ এমন একটি কার্যালয় প্রয়োজন হলো?

সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যেও এটা নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। গত মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় জাতিসংঘের এ ধরনের কার্যালয় স্থাপন দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিতে হস্তক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে একাধিক সংস্থা। অনেকেই জাতিসংঘের কার্যালয় স্থাপনের পরিবর্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।

আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় জাতিসংঘ মিশনের সম্ভাব্য ‘স্ট্যাটাস’ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়- যেসব দেশে জাতিসংঘের কার্যালয় রয়েছে, সেগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতা আদৌ তুলনীয় কিনা।

আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে জাতিসংঘের কার্যালয় স্থাপনের পরিবর্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সভায় জননিরাপত্তা বিভাগের প্রতিনিধি বাংলাদেশের বিদ্যমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এ কার্যালয় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মন্তব্য করেন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এ বিষয়ে একটি জাতীয় সংলাপ আয়োজনের পক্ষে মত দেন। তবে আইন ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধি সভায় উল্লেখ করেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের রেজুলেশনের মাধ্যমে মানবাধিকার হাইকমিশনারের যে ম্যান্ডেট নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত অক্টোবরের শেষ দিকে ঢাকা সফর করেন জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের ভলকার তুর্ক। বাংলাদেশ সফরে প্রধান উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব দেন ভলকার তুর্ক। ওই সময় সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের কার্যালয় স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছিলেন। আর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জানিয়েছিলেন, ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপনের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টি এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছে।

আর সংবাদ সম্মেলনে উন্নত দেশগুলোর পরিবর্তে বাংলাদেশে এ কার্যালয় স্থাপন নিয়ে ভলকার তুর্ক জানিয়েছিলেন, মানবাধিকার নিয়ে বেশ কিছু ভুল তথ্য রয়েছে। এটিকে কেউ পশ্চিমা তত্ত্ব হিসেবে দেখে, আবার কেউ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে, আবার অনেকে এটিকে চাপিয়ে দেওয়া দৃষ্টিভঙ্গিতেও দেখে। পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে বিশ্বের সব দেশে এ কার্যালয় স্থাপন করা যায়নি। এ কারণে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এ পরিবর্তন সহজ নয়। বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন। আর আমরা সেই প্রস্তাবই দিয়েছি।

অন্যদিকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বাংলাদেশে এসে কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে, যা সরকারের কাছে পৌঁছানো হয়। সেখানেই সুপারিশ করা হয়, মানবাধিকারসংক্রান্ত কার্যক্রমে জাতিসংঘের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও কারিগরি সহায়তা কাঠামো তৈরি করার। এরপর থেকেই জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে আলোচনা চলতে থাকে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এম হুমায়ুন কবির বলেন, মানবাধিকার রক্ষা কিংবা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণে আমরা যে খুবই উন্নত অবস্থানে পৌঁছেছি- এ দাবি করা কঠিন। জাতিসংঘ তো জুলাইয়ের পর ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের মাধ্যমে আমাদের বলেই দিয়েছেÑ কী কী করা দরকার। প্রশ্ন হলো, আমরা কি নিজেরা এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন তৈরি করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার সক্ষমতা বা সদিচ্ছা রাখি? সেক্ষেত্রে জাতিসংঘ ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে, এটা আমাদের স্বীকার করা উচিত। তারা কেবল সেখানেই আসে, যেখানে সংকট থাকে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি মনে করি, আমাদের মানবাধিকার পরিস্থিতিতে সংকট আছে? যদি তা মনে করি, তবে জাতিসংঘের সহায়তা ইতিবাচক হতে পারে। আর যদি মনে করি, আমাদের সংকট নেই বা ভবিষ্যতে হবে না, তাহলে বলা যেতে পারে আমরা নিজেরাই সক্ষম। অন্যদিকে সদ্য বিদায়ী জার্মান রাষ্ট্রদূত প্রকাশ্যে বলেছেন, বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপন গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি দেশকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণে আরও আগ্রহী করে তুলতে পারে।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এটা। আগে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে আসতে দেওয়া হতো না। এখন বাংলাদেশে জাতিসংঘের অফিস স্থাপন হলে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার ওপর সরাসরি নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ হবে। ফলে কোনো ইস্যু বা ঘটনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও গুরুত্ব বাড়বে। রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো আগের তুলনায় বেশি জবাবদিহিতার মধ্যে আসবে।

বাংলাদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয় স্থাপনের উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গতকাল ঢাকায় এক কর্মসূচিতে সংগঠনের আমির আল্লামা শাহ্ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে কার্যালয় স্থাপনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কা প্রকাশ করছি। অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘মানবাধিকারের’ নামে ইসলামি শরিয়াহ, পারিবারিক আইন এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে হস্তক্ষেপের অপচেষ্টা করেছে। এসব হস্তক্ষেপ একদিকে যেমন জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত, অন্যদিকে মুসলিম সমাজের ধর্মীয় অনুভূতিরও পরিপন্থি। স্পষ্ট করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় খুলতে দেওয়া হবে না।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়ে আসছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপন হলে তারা ঘটনাগুলো মনিটর করতে পারবে এবং এগুলো থেকে উত্তরণে সহায়তা দিতে পারবে।

শিক্ষাবার্তা /এ/০৬/০৭/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.