নিয়ম না মেনেই বদলি, ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা

সুনামগঞ্জঃ  প্রাথমিক শিক্ষার বদলি নিয়ে সুনামগঞ্জের শিক্ষকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে উর্ধ্বতনদের (মহাপরিচালকের কার্যালয়ের) প্রভাব খাটিয়ে সুনামগঞ্জ পৌরসভার সবকয়টি শূন্যপদে অফলাইনে বদলি করা হয়েছে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নীতিমালায় রয়েছে, কেবল জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত অনলাইনে বদলি’র আবেদন করা যাবে এবং সফটওয়ারের মাধ্যমেই বদলি কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। কিন্তু সুনামগঞ্জ শহরের বিদ্যালয়গুলোর শূন্যপদের বদলির ক্ষেত্রে এই আদেশ উপেক্ষিত হয়েছে।

জানা যায়, সুনামগঞ্জ শহর ও শহরতলির প্রায় চারশ শিক্ষক—শিক্ষিকা শহর থেকে প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে পাঠদান করান। এমনও শিক্ষক—শিক্ষিকা আছেন, যাদের চাকুরির বয়সসীমা শেষ পর্যায়ে। শেষ বয়সে শহরে বা বাড়ির পাশাপাশি এলাকায় চাকুরি করার জন্য বার বার কর্তৃপক্ষের কাছে ধরণা দিচ্ছেন এরা। কিন্তু কোন ব্যবস্থা হচ্ছে না।

সম্প্রতি সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার কালীবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি, ষোলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনটি, হোসেন বখ্ত—ফরিদা বখ্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি, বড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি শিক্ষকের পদ শূন্য হয়। এই ছয়টি শূন্যপদের পাঁচটি পদেই শিক্ষকরা আবেদনেরই সুযোগ পান নি।

ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা এই বৈষম্যের প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে মহা—পরিচালক প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে বুধবার লিখিত আবেদন করেছেন।

আবেদনে শিক্ষকরা লিখেছেন, অবিলম্বে এসব আদেশ বাতিল করতে হবে। অধিদপ্তর কর্তৃক প্রশাসনিক কারণ ব্যতিত অফলাইনে সকল প্রকার শিক্ষকদের বদলি বন্ধ করতে হবে। পৌর ও সদর এলাকায় পরিপত্র অনুযায়ী ১০ শতাংশ বাইরের শিক্ষক বদলি হবার নিয়ম রয়েছে। কোটা শূন্য না থাকলে, আন্ত:উপজেলা, আন্ত:জেলা ও আন্ত: বিভাগ বদলি করা যাবে না। এছাড়া স্বামী বা স্ত্রী’র স্থায়ী ঠিকানা ব্যতিত কোন বদলিও যাতে না হয় এই দাবিও করেছেন তারা। শিক্ষকদের আবেদনে উল্লেখ আছে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য মোতাবেক প্রায় ২৪ শতাংশ পদে বহিরাগত শিক্ষক বা শিক্ষিকা সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় কর্মরত আছেন। যা নীতিমালা বহির্ভূত। আবেদনে শিক্ষকরা লিখেছেন, তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

সুনামগঞ্জ জেলা ও প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ জানান, গেল কিছুদিনে নিয়ম বহিভূর্ত পাঁচটি বদলি হয়েছে অধিদপ্তর থেকে। এগুলো হচ্ছে, জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার ডিকে সিআর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আল্পনা তালুকদারকে অফলাইনে বদলি করা হয়েছে সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। উজান সাফেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক তৃপ্তি রায়কে একই বিদ্যালয়ে অফলাইনে বদলি করা হয়েছে। তাহিরপুর উপজেলার পুরান লাউড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক সাজরিনা আক্তার ঝুমাকে সুনামগঞ্জ শহরের কালিবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অফলাইনে বদলি করা হয়েছে। দিরাই উপজেলার হলিমপুর গোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খাদিজা বেগম চৌধুরী রুমিকে সুনামগঞ্জ শহরের হোসেন বখ্ত—ফরিদা বখ্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অফলাইনে বদলি করা হয়েছে। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার প্যায়ারিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মোছাম্মৎ কুহিনুর আখতার খাতুনকে শহরের বড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অফলাইনে বদলি করা হয়েছে।

এর আগে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হাসাউড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সন্তোষ কুমার চন্দকে শহরের ষোলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অফলাইন বদলি করা হয়। এসব নিয়ম বহির্ভূত বদলিতে ক্ষুব্ধ প্রাথমিক শিক্ষকরা।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দবির উদ্দিন বললেন, ‘অতীতে উপজেলা ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে বদলির আদেশ হতো, ঐসময়ও অনিয়ম হয়েছে, আমরা প্রতিবাদ করেছি। অনলাইন বদলিতেও অনিয়ম হচ্ছে, সফটওয়ারের ত্রুটি দূর করার দাবি জানিয়েছি। এখন নতুন বাংলাদেশে সকল প্রকার অনিয়ম দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্য দূর হবে এটাই কাক্সিক্ষত ছিল। কিন্তু গেল কয়েকদিনের অফলাইন বদলিতে হতাশ হয়েছেন সুনামগঞ্জের শত শত শিক্ষক শিক্ষিকা। এ কারণে সকল শিক্ষক শিক্ষিকাদের পক্ষ থেকে লিখিত প্রতিবাদ করেছি।’ একই মন্তব্য করেন সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি বাদল চন্দ্র তালুকদার। চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সমিতির সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সভাপতি আতাউর রহমান বললেন, ‘এমন বদলিতে আমরা ভীষণভাবে লজ্জিত।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি হারুন রশিদ বললেন, প্রশাসনিক কারণে এবং অসুস্থতার ক্ষেত্রে যে নিয়ম রয়েছে, সেটি হলো দূরারোগ্য প্রাণঘাতি রোগে আক্রান্ত হলে অপরিহার্য্যতা বিবেচনায় বছরের যে কোন সময় জনস্বার্থে বদলির আদেশ করা যেতে পারে। তবে সম্প্রতি অফলাইনে যে বদলিগুলো হয়েছে, সেগুলো এই নির্দেশনার মধ্যে মোটেই পড়ে না। আমরা বিব্রত হয়েছি। বঞ্চিত শিক্ষকদের প্রশ্নের জবাব দিতে পারছি না। বিগত সরকারের সময়েও রাজনৈতিক বিবেচনায় অনিয়মের মাধ্যমে বদলি ঠেকাতে আদালতে যেতে হয়েছে আমাদের। সুনামগঞ্জ জেলা জজ আদালতে স্বত্ব মোকদ্দমা দায়ের করেছি। ২০১৭ ইংরেজি সনে আদালত আমাদের পক্ষে আদেশও দিয়েছেন। বিগত সরকারের শাসনামলে ঠিক একইভাবে সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কালিবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়ম বহিভূর্ত শিক্ষক বদলি হয়েছে। এ কারণে কষ্ট পেয়েছিলেন সাধারণ শিক্ষকরা। অনলাইন বদলির বিষয়কে অধিকতর গ্রহণযোগ্য করতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সফটওয়ার বিশেষঞ্জ পাঠিয়ে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণও ইতোমধ্যে দিয়েছে। এখন আমরা দেখছি এ সবই ‘আইওয়াস’।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এনামুর রহিম বাবর বললেন, যে কাউকে বদলির এখতিয়ার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের রয়েছে। এই বদলিগুলো যৌক্তিক হয়েছে কী না, এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তার উত্তর ছিল, ‘আমি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশের বাইরে কথা বলার সুযোগ নেই।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস বললেন, ‘বদলি নীতিমালার মধ্যে আছে মহাপরিচালক যে কোন সময় যে কাউকে বদলি করতে পারবেন। মাঠ পর্যায়ে আমরা এটি কার্যকর করবো। যৌক্তিকতার বিষয়টির জবাব আমি দিতে পারবো না।’

সুনামগঞ্জ শহরের গেল সপ্তাহের বদলি’র পরিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক (পলিসি এণ্ড অপারেশন) তাপস কুমার আচার্য্য। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া এই কর্মকর্তার মুঠোফোন নম্বরে কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেন নি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও সাড়া পাওয়া যায় নি।

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/২০/১২/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.