এক উপজেলার এমপিওভুক্ত ৬৯ শিক্ষকের নিবন্ধন জাল

গাজীপুরঃ গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রয়েছে জাল ও ভুয়া সনদধারী শিক্ষকের ছড়াছড়ি। গত বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় একটি চক্র অর্থের বিনিময়ে ভুয়া নিয়োগপত্র, বিভিন্ন সনদ, সংশ্লিষ্টদের সই ও সিলমোহর জাল করে শত শত ভুয়া শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। এ সকল শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সনদ ও কাগজপত্র তৈরি করে দেওয়ার জন্য বহুল আলোচিত স্থানের নাম কাপাসিয়ার টোক বাজার। আশপাশের কয়েক জেলার শিক্ষকরা টোক বাজারকে দ্বিতীয় ডিজি অফিস বলে থাকেন। ঢাকা ডিজি অফিসে নিয়োগ ও বেতনভাতা সংক্রান্ত কোনো কাজ আটকে গেলে এখানে এসে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ টাকা দিলে তার সমাধান পেয়ে যান শিক্ষকরা।

এর আগে বিভিন্ন সময় কাগজপত্র যাচাই করে শিক্ষা অধিদপ্তর অনেক শিক্ষকের এমপিও বাতিল এবং বেতনভাতা বাবদ উত্তোলিত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমাদানের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে তারা বহাল তবিয়তে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে স্বপদে আসীন রয়েছেন। এছাড়া চক্রটির কোনো সদস্য এ অভিযোগে গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই কাজে জড়াচ্ছেন।

কাপাসিয়া উপজেলায় ৭২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৬৫টি মাদ্রাসা ও ১৪টি কলেজসহ মোট ১৫২টি এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ সকল প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগে কর্মরত কম্পিউটার বিষয়ের সহকারী শিক্ষক, সহকারী গ্রন্থাগারিকসহ অনেক বিষয়ের শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, বিএড, এমএড ও এনটিআরসিএ’র নিবন্ধন সনদ জাল ও ভুয়া।

টোক বাজারকেন্দ্রিক একটি চক্রের সঙ্গে কাপাসিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, স্থানীয় কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষক নেতাদের একটি চক্র মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এমন শত শত ভুয়া শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। এসব শিক্ষকদের নিয়ে ২০২৩ সালের শেষ দিকে একাধিক জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশের পর তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী বিষয়টি আমলে নিয়ে গত জানুয়ারি মাসে তৎকালীন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুস সালামকে উপজেলার সকল বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নিবন্ধন সনদ যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

সে সময় ১১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের কর্মরত শিক্ষকদের নিবন্ধন সনদ যাচাই করার আবেদন করলেও সবচেয়ে বেশি জাল সনদে কর্মরত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা তাদের শিক্ষকদের নিবন্ধন সনদ যাচাইয়ের আবেদন করেননি। পরে ইউএনও মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী বদলি হয়ে যাওয়ার পর চক্রটি ফের তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ড শুরু করে।

ওই সময়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত এনটিআরসিএ’র ওয়েবসাইটের তথ্য মতে কাপাসিয়া উপজেলায় কর্মরত ২১টি মাদ্রাসায় ৫০ জন শিক্ষক ও ১২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১৯ জন শিক্ষকসহ মোট ৬৯ জন শিক্ষকের নিবন্ধন জাল ও ভুয়া। গত ২৬ নভেম্বর মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৪১ জন ভুয়া শিক্ষকের এমপিও বন্ধ করে যার মধ্যে শুধু কাপাসিয়া উপজেলার শিক্ষক রয়েছেন ৩০ জন।

এর আগেও কয়েক দফায় শিক্ষা অধিদপ্তর কাপাসিয়ার প্রায় অর্ধশতজাল ও ভুয়া শিক্ষকের বেতন ভাতা বাবদ উত্তোলিত সমুদয় টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেও রহস্যজনক কারণে তা বাস্তবায়ন করেননি কোনো প্রতিষ্ঠান প্রধান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলার মাধ্যমিক পর্যায়ের একাধিক প্রধান শিক্ষক জানান, কাপাসিয়ায় ভুয়া শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্য ব্যাপক আকার ধারণ করে ২০০৮ সালে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুস সালামের যোগদানের পর থেকে। প্রথম দফায় তিনি ২০১১ সালের ২৭ মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। কথিত আছে, ওই সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগবাণিজ্য করে লাখ লাখ টাকা আয় করেন। ২০২০ সালে তিনি আবার এই উপজেলায় যোগদান করে নিয়োগ বাণিজ্যের এক মহাসাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।

গত ৪ জুলাই ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া জালসনদ চক্রের বিরুদ্ধে মামলায় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া এবং আব্দুস সালাম (৫৮) নামে একজন আসামির নাম উল্লেখ রয়েছে। অনেকেই ওই আসামি হিসেবে তৎকালীন মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুস সালামকে মনে করলেও তিনি তা অস্বীকার করেন। তিনি টোক বাজারের জাল সনদ চক্র ও নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেন এবং তার অফিসের কেউ জড়িত নেই বলেও জানান।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল আরিফ সরকার বলেন, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুধু উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার হাত দিয়ে হয় না। এখানে বোর্ডের লোক থাকেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি থাকেন, শিক্ষক প্রতিনিধি থাকেন ডিজি অফিসের প্রতিনিধি থাকেন। সকলের সমন্বয়ে শিক্ষক নিয়োগ হয়। ডিজি অফিসই একমাত্র পারে এদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে।

মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তি পেয়েই হাসপাতাল থেকে পালালেন আ. লীগ নেতামুক্তিপণ দিয়ে মুক্তি পেয়েই হাসপাতাল থেকে পালালেন আ. লীগ নেতা

কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না তাসনীম বলেন, উপজেলায় জাল ও ভুয়া নিবন্ধনধারী শিক্ষকদের সংখ্যা অনেক পাওয়া যাচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) তাদের যাচাই প্রতিবেদন তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। জাল ও ভুয়া নিবন্ধন দিয়ে যারা চাকরি করছেন তাদের বেতন ভাতা প্রদান বন্ধ করে রাখা হয়েছে। জাল ও ভুয়া শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানকে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.