নিউজ ডেস্ক।। সারাদেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক এবং প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরার দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ)। ৩৬ হাজার ৭০০ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ধরার এ অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ-বাণিজ্যের ‘স্বর্গরাজ্য’। জনশ্রুতি রয়েছে, এখানে এক বছর চাকরি করে কেউ যদি ঢাকায় ফ্ল্যাট ও কোটি টাকার ব্যাংক-ব্যাল্যান্স করতে না পারেন, তাহলে তো সে কোনো উপযুক্ত শিক্ষা ক্যাডারই না!
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিআইএ-তে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালক ও যুগ্ম পরিচালক ট্যুর প্রোগ্রাম ‘বিক্রি’ করতেন। শিক্ষা পরিদর্শক ও সহকারী শিক্ষা পরিদর্শকরা দেশের যেসব এলাকায় গেলে বেশি উৎকোচ মিলবে, সেসব ট্যুরগুলো বিপুল টাকার বিনিময়ে কিনে নিতেন। গত ১৫ বছরে ৭৫ কোটি টাকার ট্যুর প্রোগ্রাম বিক্রি হয়েছে। তবে এই টাকা তুলতে পরিদর্শক ও সহকারী শিক্ষা পরিদর্শকদের কোনো কষ্ট হয়নি। ডিআইএতে যারা টানা এক বছর কর্মরত ছিলেন, তাদের অধিকাংশই কোটিপতি হয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুরোনোদের সরিয়ে ঢেলে সাজানো হয় ডিআইএ। তার পরও ঘুষ-বাণিজ্য কমছে না। গত ১১ নভেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়া সরকারি কলেজ পরিদর্শন ও অডিটে গিয়ে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ তুলে ছাত্র-জনতার হাতে গণপিটুনির শিকার হন ডিআইএর সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মনিরুল আলম মাসুম। পালিয়ে বেঁচেছেন মাসুমের অন্য সহকর্মী বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা শেখ নুরুন্নাহার। ১০ বছর ধরে ডিআইএতে থাকা মাসুমকে গত সপ্তাহে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশে নরসিংদী সরকারি কলেজে বদলি করা হয়েছে।
আওয়ামী সরকারের পতনের পর শিক্ষা প্রশাসনের প্রথম পদায়ন হিসেবে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক করা হয় প্রফেসর কাজী কাইয়ুম শিশিরকে। সূত্র জানায়, ঘুষ-বাণিজ্যের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। তিন মাস না যেতেই গত ২১ নভেম্বর তাকে ময়মনসিংহের মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজে বদলি করা হয়। ইংরেজির এই অধ্যাপক দীর্ঘদিন ইডেন কলেজে ছিলেন। ১৮ দিন পর গত সোমবার পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অধ্যাপক মো. মোজাক্কার হোসেন চৌধুরীকে। তিনি বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের ফিন্যান্স ও প্রকিউরমেন্ট পরিচালক পদে রয়েছেন।
সূত্র জানায়, সোমবার সকালে সদ্য সাবেক পরিচালক কাজী কাইয়ুম শিশির অবৈধভাবে ডিআইএতে ঢুকে পড়েন। নানা হম্বিতম্বি করে তিনি অফিস ছাড়েন। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানালে সাবেক পরিচালকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দুপুরের মধ্যে অধ্যাপক মো. মোজাক্কার হোসেন চৌধুরীকে পরিচালক পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এদিকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, ডিআইএর একজন পরিদর্শক উপরির টাকা গুনতে বেকার স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে যান। আরেক জন যান শাশুড়িকে নিয়ে। এই ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। আবার একসঙ্গে তদন্তে যাওয়া দুই নারী কর্মকর্তা ঢাকায় ফিরে ঘুষের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে শিক্ষা ভবনে ডিআইএর অফিস-কক্ষে দ্বন্দ্বে জড়ান। কর্মকর্তা স্ত্রীর পক্ষ হয়ে বেকার স্বামীকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কাছে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেরপুর অঞ্চলের একজন শিক্ষক বলেন, ‘গত ২০ বছর ধরে যাকে আমরা বেকার ও প্রায় ভবঘুরে জেনে এসেছি, সে-ই এখন দেখি আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তিনি এসেছেন তার কর্মকর্তা স্ত্রীর সঙ্গী হিসেবে।’ তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সব কর্মকর্তাই।
ঘুষ দিলে নিয়োগ-সার্টিফিকেট বৈধ, না দিলে সবই জাল :ডিআইএর কর্মকর্তারা গত তিন সপ্তাহে তদন্ত ও পরিদর্শন করেছেন কুষ্টিয়া, শেরপুর ও টাঙ্গাইল জেলার ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এসব প্রতিষ্ঠানের তিন শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। ঘুষ দিয়েছেন, তবে আরো দাবি করছেন এক শ্রেণির কর্মকর্তা। ঐ তিন জেলার ১০ জন শিক্ষক ইত্তেফাককে বলেন, ‘ঘুষ দিলে নিয়োগ বৈধ, সার্টিফিকেট বৈধ, টাকা না দিলে সবই জাল, সবই ভুয়া। চাকরি নট, সরকারি টাকা ফেরত দাও। এ অনাচার আর কত দিন চলবে এই দেশে, জাতির কাছে আমার প্রশ্ন। নিরীহ শিক্ষকদের ওপর কেন এভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে? অডিট মানেই শিক্ষকদের মাথায় সাত আসমান ভেঙে পড়ার মতো।’ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অডিট করার দাবি জানান তারা।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে রাজধানীর পলওয়েল মার্কেটের সামনে থেকে ঘুষের নগদ ৪ লাখ টাকাসহ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জালে ধরা পড়েন ডিআইএর তৎকালীন সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মো. মোস্তাফিজুর রহমান। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের এই প্রভাষক পদমর্যাদাধারীকে পরে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
সার্বিক বিষয়ে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের যুগ্ম পরিচালক মো. আবু আল কায়সারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ডিআইএর একজন উপপরিচালক ইত্তেফাককে বলেন, অতীতের দুর্নাম ঘোচাতে কাজ করছে ডিআইএর বর্তমান প্রশাসন। যার বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাবে, তাকে শাস্তি পেতে হবে। সম্প্রতি কয়েক জনকে বদলি করা হয়েছে বলে তিনি জানান।ইত্তেফাক
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
