এইমাত্র পাওয়া

আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেও নতুন কারিকুলাম যেমন চলছে

 

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় গতবছর চালু হয় নতুন কারিকুলাম। এরপর বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয় বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা। এর মধ্য দিয়ে নতুন এই শিক্ষা পদ্ধতিতে ২০২৩ সালজুড়ে পাঠদান শেষে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নও করা হয়। এতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তা, কিছু শিক্ষক-শিক্ষার্থী সন্তুষ্ট হলেও দেশজুড়ে বেশিরভাগ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবক অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা এ পদ্ধতিতে শিক্ষার মান নিয়ে নানান জায়গায় প্রশ্ন তুলেছেন।

রাজধানী ঢাকার কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সঙ্গে নতুন কারিকুলাম নিয়ে কথা বলেও নানা জটিলতার কথা জানা গেছে। ঐ শিক্ষকরা তাদের নাম প্রকাশ করতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, নতুন কারিকুলামে গতবছর ষাণ্মাসিক মূল্যায়নের সময় কাজের ব্যাপ্তির সঙ্গে সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

সময় স্বল্পতার কারণে অনেক কাজই সুচারুভাবে করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া মূল্যায়নের প্রস্তুতির জন্যও পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি। মূল্যায়ন সম্পন্ন করার পর যথাযথ নির্দেশনার অভাবে শিক্ষার্থীদের হাতে রিপোর্ট কার্ড দেওয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাবও রয়ে গেছে। কাঠামোগত কিছু বিষয় নিয়ে জটিলতা থেকে গেছে। যদিও বার্ষিক সামষ্টিক মূল্যায়নে অতীতের সমস্যা তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। তবে ‘নৈপুণ্য’ আপে মূল্যায়ন ইনপুট দেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও মাস্টার ট্রেইনার ড. রুমানা আফরোজ বলেন, ২০২৩ হলে মূল্যায়ন দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়েছে। বছরের মাঝামাঝি ষান্মাসিক সামষ্টিক মূল্যায়ন এবং বছরের শেষে বার্ষিক সামষ্টিক মূল্যায়ন করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই বোর্ড নির্ধারিত নীতিমালা অনুসৃত হয়েছে। ষান্মাসিক ভাষা উৎসবে এক সপ্তাহব্যাপী প্রস্তুতি পর্বের পর সামষ্টিক মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হয়েছে।

অন্যদিকে বার্ষিক সামষ্টিক মূল্যায়নে প্রতি বিষয়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন তিনদিনে মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হয়েছে। উভয় মূল্যায়ন কার্যক্রমে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকের নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিগত কারিকুলামের নির্দেশনা অনুসৃত হয়নি।

তিনি বলেন, ২০২৩ সালে মাধ্যমিকে ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণিতে নতুন কারিকুলাম পড়ানো হয়েছিল। ২০২৪ সালে অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে নতুন কারিকুলাম চালু হয়েছে। প্রাথমিকে ২০২৩ সালে প্রথম শ্রেণিতে এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে নতুন কারিকুলাম চালু হয়েছে।

লক্ষ্মীপুরে চিন্তিত অভিভাবকরা:
নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক নানা কাজের চাপ বেড়েছে। শিক্ষার্থীরা বিরক্ত। তাদের অভিভাবকরাও চিন্তিত। ঠিকমতো না বুঝলেও বাধ্য হয়ে পাঠদানের ক্ষেত্রে নতুন শিক্ষাক্রম চালু রেখেছেন শিক্ষকরা। শিক্ষার্থীরা এখন লেখাপড়া বাদ দিয়ে অ্যাসাইনমেন্টনির্ভর হয়ে পড়েছে।

তারা বলছেন, সন্তানের লেখাপড়ার মানোন্নয়ন, জীবন গঠনসহ নানা দিকে মা-বাবাই প্রথম ভূমিকা রাখেন। শিক্ষা কার্যক্রম পরিবর্তন আগে তাদের সঙ্গে বসা উচিত ছিল। নতুন শিক্ষা কার্যক্রম সন্তানদের ক্ষতির দিকে ধাবিত করছে বলে আমরা মনে করি। ভবিষ্যতে সন্তানদের কী হবে তা নিয়ে আমরা চিন্তিত।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বলেন, নবম শ্রেণিতে সবার জন্য গণিত, বিজ্ঞান অভিন্ন পাঠ্যপুস্তক হওয়ায় টপিক আগের চেয়ে কমাতে হবে। এই কারিকুলারে মাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষা যেটুকু আছে তাও শেষ হয়ে যাবে। বিজ্ঞান ও গণিত শেখার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এর মাধ্যমে তাদের বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে সুযোগ হবে না।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বলছে, সারাক্ষণ অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে থাকতে হয়। আগে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতাম। এখন আর পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয় না। এতে করে পড়ালেখা মান বুঝতে কষ্ট হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক প্রধান শিক্ষক বলেন, এই শিক্ষা নীতির কারণে শিক্ষকরা অলস হয়ে পড়েছেন। তাদের পাঠদানের ক্ষেত্রে কোনো উদাহরণ দিয়ে পড়াতে হয় না। শিক্ষার্থীদেরই নিজেদের পড়া পড়তে হয়। শিক্ষায় আগের মতো জৌলুস নেই।

ময়মনসিংহে মিশ্র প্রতিক্রিয়া:
ময়মনসিংহের কয়েকজন শিক্ষক বলেন, নতুন শিক্ষাক্রম অনেক যুগোপযোগী। ২০২৩ সাল থেকে ময়মনসিংহে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয়। এই পদ্ধতি অনেক শিক্ষার্থীর ভালো লাগছে। তারা গ্রুপ হিসেবে অ্যাসাইনমেন্ট করছে। একজনের কাছ থেকে আরেকজন শিখতে পারছে। তবে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

জেলার একাধিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, জানুয়ারিতে নবম শ্রেণির ক্লাস শুরু করেছে তারা। আগের শিক্ষাবর্ষগুলোর মতো এবার বিজ্ঞান, মানবিক কিংবা বাণিজ্যের বিভাজনে শ্রেণিকক্ষে ঢুকতে হয়নি তাদের। বড় পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে ক্লাস করেছে তারা। শিক্ষকদের পাঠদানের মাধ্যমে পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়া হচ্ছে। অবশ্য দ্বিমত পোষণ করেছেন একাধিক অভিভাবক। তারা বলেন, এই পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ এখনো কাটেনি। নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কোনো নম্বর বা গ্রেডিং না থাকাসহ নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষার বিভাজন না থাকায় শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়তে পারে।

ভোলার লালমোহনে ক্ষোভ প্রকাশ:
অনেক অভিভাবককে নতুন কারিকুলাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। অনেকে রাস্তায়ও নেমেছেন এর বিরুদ্ধে। তারা বলছেন, নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে দুর্বল অনেক দিক রয়েছে। তা হলো- নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত পরিবেশ না থাকা। অবকাঠামোগত সমস্যা। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব। অভিভাবকদের নতুন কারিকুলাম সম্পর্কে ধারণা না দেওয়া। কর্তব্যরত শিক্ষকরা নতুন কারিকুলামকে পজেটিভ হিসেবে না নেয়া। কারিকুলাম বাস্তবায়নে তৃণমূল শিক্ষকদের মতামত না নেয়া। শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক বলেন, যেভাবে নির্দেশনা (শিক্ষক গাইড) দেওয়া হয়েছে সে অনুযায়ী ক্লাস পরিচালনা করতে হবে। দলীয়ভাবে শিক্ষার্থীদের কাজ কাজ করার জন্য উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অবকাঠামো নেই। কোনো শিক্ষার্থী একদিন ক্লাসে না আসতে পারলে সেই দিনের কাজ থেকে সে পিছিয়ে পড়বে। ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কষ্টকর।

উপজেলার কয়েকজন অভিভাবক বলেন, নতুন শিক্ষাক্রমে পরীক্ষা পদ্ধতি নেই। এজন্য শিক্ষার্থীরা এখন বাড়িতে পড়ছে না। পড়ালেখার পজেটিভ প্রতিযোগিতা নেই। পরীক্ষার রেজাল্ট হলো চতুর্ভুজ, বৃত্ত ও ত্রিভুজ। এটা কী ধরনের পদ্ধতি? মাসের পর মাস স্কুলে না এসে পড়ালেখা না করে একবার ত্রিভুজ পেলেই সে ভালো ছাত্র। নিয়মিত স্কুলে এসে এবং পড়ালেখা করে সেও পেল ত্রিভুজ। এটা কী ধরনের মূল্যায়ন?

মেহেরপুরেও অভিভাবক মহলে অসন্তোষ:
এ শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে অভিভাককদের অধিকাংশই উদ্বিগ্ন৷ তাদের অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ভাত রান্না শিখতে স্কুলে যেতে হবে কেন? স্কুল পড়াশোনার জায়গা। মেহেরপুর জেলায় মোট মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১২৬টি। এসব বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকও এ শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে রয়েছেন।

একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, আমি যেমন শিক্ষক একইসঙ্গে অভিভাবকও। আমার মেয়েও স্কুলে পড়ে। নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে আমি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছি। শিক্ষাক্রমের অনেক কিছু যেমন ভালো, তেমনি অনেক বিষয় নিয়ে শিক্ষকরাও ধোঁয়াশায় আছেন। অনেকে প্রশিক্ষণ পাননি। শিক্ষক সংকট আছে। আছে যোগ্য শিক্ষকের অভাব। বিশেষ করে শিক্ষকরা কী করে ক্লাসের প্রত্যেকটা ছেলে-মেয়ের মূল্যায়ন কী করে হবে, সেটি নিয়েও শিক্ষকরা ধোঁয়াশায় আছেন। পরীক্ষা না থাকায় ছেলে-মেয়েরা খুশি হলেও সন্ধ্যার পর তারা পড়তে বসছে না বলে অভিভাবক উদ্বিগ্ন।

জেলা শিক্ষক নেতাদের একজন বলেন, নিজে প্রধান শিক্ষক বলে অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারি না। বাস্তবতা হলো, নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছেন। আরেকটু সময় নিয়ে আরো বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এটি শুরু করলে ভালো হতো।

কিশোরগঞ্জের শিক্ষার্থীরা-অভিভাবকরা যা বলছেন:
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার সরকারি মডেল পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী অর্না রানী রাং মনা বলে, নতুন কারিকুলামে নম্বর না থাকায় পড়াশোনার উৎসাহ কমে যাচ্ছে। অন্য আরেক শিক্ষার্থী বলে, আগে স্কুলে পরীক্ষা দিতে গেলে টেনশন ও ভয় কাজ করত। এই টেনশন থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি।

এক অভিভাবক জানান, এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক নানান কাজের চাপ বেড়েছে। দুশ্চিন্তা হলো- ছেলে আগে সন্ধ্যা হলে সে পড়তে বসত। এখন তারে একেবারেই পড়তে বসানো যায় না। সারাক্ষণ অ্যাসাইন্টমেন্ট করে। ইন্টারনেট ঘাটে। বন্ধু-বান্ধবের সাথে বসে থাকে।

আখাউড়ায় অভিভাবকরা বলছেন ব্যয় ও হয়রানি বাড়ছে:
অভিভাবকরা বলছেন, নতুন এই শিক্ষা কারিকুলামে শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখতে পারবে তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। এই শিক্ষাক্ষেত্রে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। আগের মতো নেই কোনো মূল্যায়ন পরীক্ষাও। এই নতুন কারিকুলামে পড়ার চেয়ে কাজ বাড়ায় সংশ্লিষ্ট সামগ্রী তথা পোস্টার, রঙিন কাগজ, আট পেপার, ককশিট, আটা, রঙিন কলমসহ নানা জিনিস কিনতে অনেক ব্যয় ও হয়রানি বেড়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা কোন বিষয়ে ভালো করছে, কোন বিষয়ে খারাপ করছে তা জানার সুযোগ নেই। শিখন কৌশলে পিছিয়ে পড়ছে দুর্বল শিক্ষার্থীরা। নির্দিষ্ট প্রশ্নকাঠামো না থাকায় মূল্যায়ন প্রস্তুতিতেও শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় মনোযোগী হচ্ছে না। ফলে অপেক্ষাকৃত বেশি মেধাবীরা পড়াশোনায় মন বসালেও মেধায় দুর্বল শিক্ষার্থীরা আরো পিছিয়ে পড়ছে।

মাঠ পর্যায়ের মূল্যায়ন ভালো, শিক্ষা অধিদফতর:
সার্বিক বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ২০২৩ সালে ৬ষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে যে নতুন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছিল তার মাঠ পর্যায়ের মূল্যায়ন ভালো। নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে ‘নৈপুণ্য’ অ্যাপ ব্যবহার করতে হবে। এই আ্যাপের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের বিষয়টি জানা যাবে। তিনি বলেন, এরই ধারাবাহিকতায় সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে নতুন বছরে এ শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। ওইসব ক্লাসের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও চলমান রয়েছে।ডেইলি বাংলাদেশ


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.