এইমাত্র পাওয়া

মতিঝিল মডেলের অধ্যক্ষ-সভাপতির বিরুদ্ধে মাউশি ও বোর্ডে লিখিত অভিযোগ

আল আমিন হোসেন মৃধা, ঢাকাঃ রাজধানীর বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৩৫ জন শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিওভুক্তির জন্য মোটা অংকের অর্থ বাণিজ্যের কয়েকটি অডিও রেকর্ড ও বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে গত ২৫ নভেম্বর “অধ্যক্ষ ও সভাপতির অডিও ফাঁস: অনিয়মে ডুবছে মতিঝিল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ” শিরোনামে শিক্ষাবার্তা’য় সংবাদ প্রকাশের পরে উল্টো খড়গ নেমে এসেছে শিক্ষকদের উপর। বিভিন্ন হুমকি ধমকি দিয়ে এমপিওভুক্তিতে কোন টাকা নেওয়া হচ্ছে মর্মে জোরপূর্বক লিখিত আদায়ের অভিযোগ করেছেন ভুক্তোভুগি শিক্ষক-কর্মচারীরা।

শিক্ষা ক্যাডার অধ্যক্ষ ও গভর্নিং বডির সভাপতি কর্তৃক বিভিন্ন হয়রানীর শিকার হয়ে এবং অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এর মহাপরিচালক এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তোভুগী শিক্ষক-কর্মচারীরা।

সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা ক্যাডার অধ্যক্ষ মাহফুজুর রহমান খান, গভর্নিং বডির সভাপতি আবদুল মতিন ভূঁইয়া ও গভর্নিং বডির বিদ্যোৎসাহী সদস্য শাহজাহান মৃধা কচি এবং শিক্ষক প্রতিনিধি কামরুজ্জামানের কথোপকথনের অডিও রেকর্ড শিক্ষাবার্তা’র হাতে আসে। সেই অডিও রেকর্ডে এমপিওভুক্তিতে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যায়। রেকর্ডে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রণালয়’ আখ্যা দিয়ে মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য শাহজাহান মৃধা কচি বলেছেন, ‘প্রথমত এটা (এমপিওভুক্তি) ইমপার্শিয়াল করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় হচ্ছে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রণালয়, যতই আমি ইন্ফ্লুয়েন্স করি না কেন; টাকা যা দেওয়ার ছিল, নিয়েছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘মতিন ভাই (গভর্নিং বডির সভাপতি) সবসময়ই বলেছিল টাকা নিয়ে তুমি চিন্তা কইরো না। তুমি যতটুকু পার, আগায়া নিয়া (এগিয়ে নিয়ে) যাও। মতিন ভাই পুরো সার্পোটটাই (সমর্থন) দিয়েছিলেন। আমরা কিন্তু অনেক সময় নিয়েছি কাজটি করার ক্ষেত্রে।’

মাউশি এর মহাপরিচালক এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, “আমরা মতিঝিল মডেল স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক। আমাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারিদের এমপিও প্রজেক্ট হাতে নিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য অধ্যক্ষ মাহফুজুর রহমান খান, সভাপতি আব্দুল মতিন ভূঁইয়া এবং বিদ্যোৎসাহী সদস্য শাহজাহান মৃধা ৰুচি, প্রভাবিত নির্বাচনের নির্বাচিত শিক্ষক প্ৰতিনিধি  এনামুল হক, কামরুজ্জামান সহ কয়েকজন শিক্ষককে দিয়ে বিভিন্নভাবে এমপিও প্রত্যাশী শিক্ষক ও কর্মচারীদের কাছ থেকে অতি সংগোপনে টাকা সংগ্রহ করছেন কিছু ফলাও করছেন টাকা লাগলে কমিটি দিবে অথবা শিক্ষকদের কাছ থেকে তুলে ফান্ড দেয়া হবে। প্রসঙ্গত এমপিও করার জন্য কোনো টাকার প্রয়োজন হয় না। একজন সরকারি প্রেষণে আসা অধ্যক্ষ এহেন কাজের সাথে জড়িত থাকেন কি করে তা আমাদের বোধপমা নয়। বর্তমান অধ্যক্ষ মাহফুজুর রহমান খান প্রেষণে আসার পরে অভিষেক মিটিং এসেই পরিচিত না হয়েই ০৬ জন শিক্ষককে সমন্বয়ের কথা বলে সমন্বয় না করে সরাসরি বদলি করেন। এর পর ০৩ জন সিনিয়র শিক্ষককে থানায়, ডিবিতে নিয়ে হেনস্থা করার মাধ্যমে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি করেন। এসএসসি ২০২৩ এর ব্যবহারিক পরীক্ষা চলাকালে তার অনুগত শিক্ষক ও কর্মচারী দ্বারা বিশেষ বাহিনী তৈরি করে অধিকাংশ পরীক্ষার হল থেকে জন প্রতি ৫০০-৮০০ টাকা করে প্রায় ১০ লক্ষ টাকার মত হাতিয়ে নেন। এই ব্যাপারে প্রধান অভিযুক্ত কর্মচারী মো. রাজীব মিয়ার বিরুদ্ধে তিনি অদ্যাবধি কোন ব্যবস্থা নেন নি।”

লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, “অধ্যক্ষ কলেজের নতুন ভর্তিকৃত ছাত্রীদের নবীনবরণসহ একাডেমিক উন্নয়নের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেন নি, যার ফলে কলেজের ভর্তিতে চরম ভরাডুৰি হয়৷ এমনকি স্কুলের আসন্ন ভর্তির ব্যাপারেও বর্তমান অধ্যক্ষ নির্বিকার ভূমিকা পালন করছেন। ২০২৪ সালের এস.এস.সি. পরীক্ষার্থীদের মধ্যে যারা নির্বাচনি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে তাদের কাছ থেকে রি-টেস্ট এর নামে বিষয় প্রতি ২০০/- টাকা করে ম্যানুয়ালি তুলেছেন, যা সম্পূর্ণরূপে আইন ও বিধি বহির্ভূত। পাশাপাশি ফরম পূরণের সাথে তিনি হিসাবের ৰাইৱে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ২৫০০/- (দুই হাজার পাঁচশ) করে টাকা অতিরিক্ত আদায় করেছেন। এ ছাড়াও ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণির মূল্যায়ন ফি এর নাম করে ৫০০ টাকা (জন প্রতি) আদায় করেছেন যা মাউশির নির্দেশনার প্রতি সুস্পষ্ট দৃষ্টতার শামিল। গত ১৬/১১/২০২৩ তারিখ অধ্যক্ষ মহোদয়ের সামনে তার কক্ষে মহিলা সংরক্ষিত টিআর জনাব রোখসানা ইয়াসমিন কে অধ্যক্ষের অনুগত কয়েকজন শিক্ষক এমপিও করা না করা নিয়ে হুমকি প্রদাণ করেন, যার একটি অভিযোগ মতিঝিল থানায় করা হয়েছে। অধ্যক্ষ মাহফুজুর রহমান খান প্রেষণে এসেই ইংরেজি ভাসনে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেন যেখানে বয়স ৪০ রাখা হয়। এছাড়া দিবা শাখার সহকারি প্রধান শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এতটাই গোপনীয় রাখা হয় যে, নিয়োগ পরীক্ষার দিন প্রতিষ্ঠানে পছন্দনীয় ১/২ জন শিক্ষক-কর্মচারি ছাড়া অন্যদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। যা দূরভিসন্ধিমূলক। অধ্যক্ষ মাহফুজুর রহমান খান প্রতিষ্ঠানে সভাপতি, বিদ্যোৎসাহী সদস্য ও ২জন টি. আর এবং কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে ফেলেছেন।”

জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, এমপিওভুক্তিতে অর্থ আদায়ের বিষয়টি সামনে আসলে নিজেদের বাঁচাতে এমপিওভুক্তিতে টাকা নেওয়া হয়নি মর্মে লিখিত নেওয়া হয়। জোরপূর্বক এই লিখিত নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে জানতে চাইলে মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মাহফুজুর রহমান খানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে তিনি এমপিওভুক্তিতে অর্থ আদায় করা হচ্চে না বলে দাবি করেন।

বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সভাপতি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক আবদুল মতিন ভূঁইয়ার মুঠোফোনেও পাওয়া যায়নি। তবে তিনি এর আগে দাবি করেছিলেন,  শিক্ষকদের একটি পক্ষ এমপিওভুক্ত হতে না পেরে প্রোপ্যাগাণ্ডা চালাচ্ছেন।

বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পাওয়া এসব শিক্ষকরা কেন এমপিওভুক্ত হতে পারেননি সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকদের নিয়োগ বাণিজ্য ও সনদ জালিয়াতির অভিযোগে পূর্বের গভর্নিং বডি তাদের এমপিওভুক্ত করতে পারেননি।  শিক্ষকদের নিয়োগ বাণিজ্য ও জালিয়াতির অভিযোগে সনদ যাচাইয়ের উদ্যোগ  নেই এনটিআরসিএ। গত বছরের ৪ অক্টোবর (২০২২) এনটিআরসিএর সহকারী পরিচালক ফিরোজ আহমেদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে অধ্যক্ষকে চিঠি প্রদান করেন। চিঠিতে মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের নাম, বাবা-মায়ের নাম, নিয়োগের তারিখ, যোগদানের তারিখ, বিষয়. শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার রোল নম্বর, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও পরীক্ষার বছর এবং নিয়োগের ধরণ উল্লেখ করে একটি তালিকা এনটিআরসিএকে পাঠাতে বলা হয়। তবে সেই প্রতিবেদন আজও আলোর মুখ দেখেনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এর আগের গভর্নিং বডির একাধিক সদস্য বলেন, প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন সময়ে মোটা অংকের অর্থের মাধ্যমে নিয়মবহির্ভুতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কারও কাগজ ঠিক নেই, এনটিআরসিএর চাহিদা না দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ কিংবা প্যাটার্নের বাইরে গিয়েও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে পূর্বের কমিটি এই শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করতে পারেনি।

 

এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমিক শাখার পরিচালক মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন বলেন, মতিঝিল মডেলের বিষয়টি অবগত হয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক আবু তালেব মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, অভিযোগ আসছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৩/১২/২০২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.