এইমাত্র পাওয়া

নির্দেশনা মানছে না স্কুল, উদ্বেগে অভিভাবক

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

ডেঙ্গু ঠেকাতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) নির্দেশনা মানছে না বহু স্কুল। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে দেওয়া এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে তদারকির নির্দেশনাও রয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে এসব নির্দেশনা উপেক্ষিত থাকায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা।

সরেজমিনে রাজধানীর কয়েকটি স্কুল ঘুরে নির্মাণাধীন ভবন ও খেলার মাঠে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। ইতোমধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের বহু শিক্ষার্থী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। অনেকে বাসায়, কেউবা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। অভিভাবকরা বলছেন, ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে আমাদের সতর্ক থাকতে বলা হচ্ছে। কিন্তু স্কুলগুলোতে অনেক শিক্ষার্থী এডিস মশার কামড়ের শিকার হচ্ছে। তবে গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ডেঙ্গুর আবাসস্থল কিছুটা ধ্বংস হবে বলে মনে করেন রোগতত্ত্ববিদরা। বৃষ্টি শেষে জমে থাকা পানি ফেলে না দিলে বিপদ আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তারা।

রাজধানীর যেসব এলাকা ডেঙ্গুর রেড জোন হিসেবে পরিচিত বাসাবো তার একটি। এখানে মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রায় সাড়ে ৩ হাজার ছাত্রছাত্রী প্রতিষ্ঠানটিতে অধ্যয়নরত। ইতোমধ্যে ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী, বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।

আক্রান্তদের একজন প্রতিষ্ঠানটির তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়াফাস। নিয়মিত স্কুলে আসা-যাওয়ায় হঠাৎ করেই গত সপ্তাহে জ¦র, বমিসহ ডেঙ্গুর একাধিক উপসর্গ দেখা দেয়। পরে পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। ইয়াফাসের মা যোহরা বেগম বলেন, ‘গত সপ্তাহে স্কুল থেকে ফিরে হঠাৎ করে ছেলের জ¦র শুরু হয়। দুদিন পর পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। আমার ধারণা, স্কুলে এডিস মশা কামড় দিয়েছে।’ একই প্রতিষ্ঠানের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিয়ান কবির নূর ডেঙ্গু নিয়ে চিকিৎসাধীন মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। গত ৫ আগস্ট থেকে এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরিয়ান। এই শিক্ষার্থীর বাবা নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মো. আলমগীর কবির   বলেন, ‘স্কুলে আক্রান্ত হলো নাকি বাসায় বুঝে উঠতে পারছি না। বিষয়টি ভাবনায় ফেলছে। তিন সন্তানকে নিয়েই ডেঙ্গুর ভয় কাজ করছে।’

গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলের পাশে নতুন ভবন নির্মাণ হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে কিছু জায়গায় পানি জমে রয়েছে। কিন্তু যেখানে বৃষ্টি পড়ে না, সেখানেও জমে রয়েছে কয়েক দিনের পানি। স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক মো. এনামুল হক বলেন, ‘আমরা সতর্ক থাকার চেষ্টা করছি। মাউশি থেকেও নির্দেশনা পেয়েছি। সে অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদেরও পাঠদানের সময় বাসায় মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোসহ সব ধরনের সচেতনতামূলক পরামর্শ দিয়ে আসছি আমরা।’

রামপুরার একরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যাতায়াতের মধ্যেই গত মাসে জ্বর, শরীর ব্যথা ও বমি শুরু হয় প্রতিষ্ঠানটির প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইসার। টানা পাঁচদিন জ্বরে ভুগে পরে সুস্থ হয় সাড়ে ছয় বছরের শিশুটি। তার মা লাবনী আক্তার সুজলা বলেন, স্কুলে নিয়মিত যাতায়াত করত। ওর বাবাও আক্রান্ত হয়। স্কুলে কামড় দিয়েছে কিনা বোঝার ওপায় নেই। কর্তৃপক্ষ আমাদের জানিয়েছে, তারা ডেঙ্গু প্রতিরোধে সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে।

মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টিতে জমা পানি আটকে রয়েছে। তবে স্কুল ভবনের চারপাশ অনেকটা পরিষ্কার পাওয়া গেছে। স্কুলের গর্ভনিং বডির সভাপতি ও স্থানীয় কাউন্সিলরকে প্রধান করে মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতষ্ঠানটির অধ্যক্ষ হোসনে আরা।   তিনি বলেন, ‘আমরা চারপাশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি পাঠদানের সময় কীভাবে ডেঙ্গু থেকে মুক্ত থাকতে হবে শিক্ষার্থীদের তা সচেতন করছি।’

গত ৬ জুলাই মাউশির এক নির্দেশনায়, খেলার মাঠ ও ভবনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, মাঠ কিংবা ভবনে জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য রাখা ফুলের টব নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, এডিসের প্রজননস্থলে যাতে পানি জমতে না পারে তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের অবহিত করতে বলা হয়। নির্দেশনা বাস্তবায়নে গত ২৭ জুলাই মাঠ পর্যায়ে শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মনিটরিংয়ের আদেশ দেওয়া হয়।

মাউশির মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন উইংয়ের পরিচালক অধ্যাপক মো. আমির হোসেন   বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শনে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দুই থেকে আড়াই হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমরা গিয়েছি। তারপরও যদি কেউ অবহেলা করে, কোনো প্রতিষ্ঠানে তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকে তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তবে ব্যক্তি সচেতন না হলে শতভাগ সফল হওয়া যাবে না।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজার ২২৫ জন মানুষকে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এসব রোগীর মধ্যে আঠারো বছরের নিচে শিশুর আক্রান্তের হার ৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৩৪০ জন ডেঙ্গু রোগী। এর মধ্যে ২১ ভাগই শিশু।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বর্তমানের কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে কিছুটা ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। এডিস মশার আবাসস্থল ধ্বংস হবে। তবে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে বৃষ্টি থেমে গেলে। জমে থাকা পানি যদি দ্রুত না সরানো যায়, তাহলে মুহূর্তে এডিসের প্রজনন বাড়বে। এ জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যাতে বাসাবাড়িতে মশারি টাঙানো ছাড়া না ঘুমায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সবার আগে সতর্ক থাকতে হবে।’

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে আরও ২ হাজার ৭৪২ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই সময়ে মারা গেছেন আরও ১৩ জন।আমাদের সময়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.