এইমাত্র পাওয়া

জাল সনদ প্রমাণ হওয়ার পরেও যেভাবে বোনাস পেলেন ৬৭৮ শিক্ষক

ঢাকাঃ জাল সনদে দীর্ঘ বছর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চাকরি করছেন, এমন ৬৭৮ জন শিক্ষককে সম্প্রতি শনাক্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাদের বেতন-ভাতা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাঠিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) বলা হয়, এতদিন যে টাকা বেতন ভাতা হিসেবে তা গ্রহণ করেছেন, তা ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে।

এই নির্দেশনার পরও সেই শিক্ষকেরা পেলেন আসন্ন ঈদুল আজহার উৎসব ভাতা (বোনাস)। পেয়েছেন বেতনও।

এমনকি জাল সনদধারী এসব শিক্ষককে চাকরিচ্যুত ও এমপিও বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার এক মাস পর ওই শিক্ষকদের বেতন ও উৎসব ভাতা বাবদ গত মঙ্গলবার তাদের অনুকূলে কয়েক কোটি টাকা ছাড় করলো মাউশি। অথচ এসব শিক্ষক গত ৫-৭ বছর বা এর বেশি সময় ধরে সরকারের শত কোটি টাকার বেশি গ্রহণ করেছেন। ব্যাংক হিসাব থেকে এসব টাকা উত্তোলন ও ব্যবহার করেছেন।

এদিকে ওই শিক্ষকদের কাছে সরকারের পাওনা শত কোটি টাকা ফেরত আনার বদলে আরও কয়েক কোটি টাকা তাদের দিয়ে দেওয়ার পর প্রকৃত সনদ নিয়ে চাকরি পাওয়া শিক্ষকদের অনেকেই অবাক হয়েছেন। জাল সনদে এত জোর এল কোথা থেকে- সেটিই এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের ধারণা, পেছনে কেউ না হয় কেউ আছে, নইলে জাল সনদ ধরা পড়ার পরও সেই শিক্ষকেরা ঈদের উৎসব ভাতা পেলেন কি করে।

তবে এ বিষয়ে দায়সারা জবাব দিচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। তাদেরকেই ওই শিক্ষকদের কাছে পাওনা শত কোটি টাকা ফেরত আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে গত ১৮ মে চিঠি পাঠিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর জাল সনদে চাকরি পাওয়া এই ৬৭৮ শিক্ষকের অনুকুলে ছাড় করা হয়েছে ঈদুল আজহার উৎসব ভাতা ও বেতন। তবে কত টাকা ওই শিক্ষকদের হিসেবে স্থানান্তর করা হলো- সে অংক সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেনি মাউশির মাধ্যমিক ইউং। তবে বেতন-ভাতাসহ দুই কোটি টাকার বেশি ওইসব শিক্ষকের ব্যাংক হিসাবে ইতোমধ্যেই ঢুকে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ টাকা জাল সনদধারী শিক্ষকরা উত্তোলনও করেছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ পাশ কাটিয়ে ওইসব শিক্ষকদের উৎসব ভাতা ও বেতন ছাড় করার বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশির মাধ্যমিক উইংয়ের পরিচালক মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন বলেন, ‘আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছি। মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বিধি মেনে জাল সনদধারী ৬৭৮ জন শিক্ষকের বেতন ভাতা বন্ধ ও জাল সনদ দিয়ে এমপিওভুক্ত হওয়ার পর থেকে সরকারের যে টাকা তারা বেতন-ভাতা হিসেবে উত্তোলন করেছেন- তা ফেরত আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাৎক্ষণিক বেতন ভাতা বন্ধ করার কথা চিঠিতে বলা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘সে কারণে আমারা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করছি। শিক্ষকদের কারণ দর্শানোর (শোকজ) চিঠি পাঠানো শেষ। জবাবগুলো এলেই পরবর্তী প্রকিয়া শুরু হবে।’

আইন মেনেই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন মাধ্যমিক উইংয়ের পরিচালক। বলেন, তাদের আলাদাভাবে শোকজ করার পর এর জবাব আসার পর এমপিও সুবিধা- অর্থাৎ বেতন-ভাতা বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

তবে জাল সনদে চাকরি পাওয়ার বিষয়টি প্রমাণ হওয়ার পরও কি তারা বেতন পাবেন- এ প্রশ্নের উত্তর মিলেনি।

তবে মাউশি কর্মকর্তাদের একটি সূত্র বলছে, অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে থাকায় ওই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি। এ কারণে, তাদের বেতন-ভাতা তাদের ব্যাংক হিসাবে চলে গেছে।

প্রসঙ্গত, এমপিওভুক্তির সময় জাল সনদ ব্যবহার করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি নেয়া ৬৭৮ শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করার নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে বেতন-ভাতা বাবদ নেয়া অর্থ ফেরত ও ফৌজদারি মামলাসহ সাত দফা শাস্তি কার্যকরের নির্দেশ দিয়ে গত ১৮ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সহকারী সচিব (অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা শাখা) মো. সেলিম শিকদার স্বাক্ষরিত অফিস আদেশের চিঠি পাঠানো হয় মাউশির মহাপরিচালকের কাছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে সনদ জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে এ নির্দেশ দেয়া হয়।

আদেশে বলা হয়, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক যাচাই-বাছাই করে ৬৭৮ জন শিক্ষক-কর্মচারীর জাল সনদ শনাক্ত হয়েছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি সনদ প্রদানকারী দফতর প্রধান/প্রতিনিধি সমন্বয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক/কর্মচারীদের সনদের সত্যতা যাচাইপূর্বক ৬৭৮ জনের জাল সনদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

৬৭৮ জন জাল সনদধারী শিক্ষক/কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যে সাত ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়, তা হচ্ছে-

জাল সনদধারী শিক্ষক/কর্মচারীদের এমপিও বন্ধ এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে চাকরিচ্যুত করা।

অবৈধভাবে গ্রহণকৃত বেতনভাতা সরকারি কোষাগারে ফেরত প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

যারা অবসরে গেছেন তাদের অবসরের সুবিধাপ্রাপ্তি বাতিল করা।

যারা স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন তাদের আপত্তির টাকা অধ্যক্ষ/প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে আদায় করা।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জাল সনদধারী শিক্ষক/কর্মচারীদের অবসর ভাতা/কল্যাণ ট্রাস্টের ভাতা বন্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জাল সনদধারীদের তালিকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করা।

জাল সনদধারীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান কর্তৃক ফৌজদারি অপরাধের মামলা দায়ের।

জাল সনদধারীদের নিয়োগ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৪/০৬/২০২৩

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.