আমরা সাকিবের পক্ষে

 মাতুব্বর তোফায়েল হোসেন।।

জনপ্রিয় ক্রীড়া সাংবাদিক উৎপল শুভ্র সেই শুরু থেকেই বলতেন, সাকিব হলো আগামী দিনের বাংলাদেশের ক্রিকেটের বিজ্ঞাপণ। সবার থেকে আলাদা, আলাদা মেজাজ, আলাদা স্টাইল। উইকেট ধরে রাখার আশ্চর্য জাদুকর। অমন করে বাংলাদেশ দলে আর কাউকে খেলতে দেখা যায় নি ইতিপূর্বে। আমরা উৎপল শুভ্রের বিশেষণটি আত্মস্থ করে নিয়েছিলাম। গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়েছিলাম, আমাদের আরো কিছু সাকিব হবে, আমরা ক্রিকেটে পৃথিবীতে পরাশক্তি হবো, একদিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবো। কাঙালের দেশে বিশ্বপরিচিতি এনে দেয়ার মত পাবলিক খুব কমই থাকে। দিনের পর দিন আমরা সাকিবের ব্যাট ও বল হাতে দেশকে বিশ্ব-পরিসরে মর্যাদার শিখরে নিয়ে যেতে দেখেছি।

আমাদের একজন মাশরাফি হলো, মুশফিক হলো, মাহদুল্লা হলো, তামিমও হলো। দর্শকের বাহবার প্রতি নয়, সাকিব বরাবর থেকেছে নিজের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নিজের থেকে ক্রমাগত ছাড়িয়ে যাবার একান্ত চেষ্টাটি সব সময় দেখেছি তার মধ্যে। এই যে আবেগ ও সস্তা জনপ্রিয়তাকে তুচ্ছ করে নির্মোহ সাধনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় অবিচল থাকা, বাংলাদেশের মত আবেগ প্রবণ দর্শকের দেশে খুবই দুরূহ কাজ। বছরের পর বছর সাকিব সেটি করেছে এবং সফল হয়েছে।

সাকিবের ব্যাটে সারা দেশ হেসেছে, বলে ভেসেছে বিপুল আনন্দে। বহুবার, বারবার। অধিনায়ক হিসেবে তাকে সফল বলা যাবে না। কিন্তু জাতশিল্পীর মত ক্রিকেটে প্রদর্শন করে গেছে ধারাবাহিক ক্রীড়া নৈপুণ্য। সে হিসেবে হতাশ করার গল্প খুবই কম। জিম্বাবুয়ের চার্লস কভেন্ট্রি বাংলাদেশের বিপক্ষে একশত চুরানব্বই রানের অপরাজিত ইনিংস খেললো যে ম্যাচে, সেই ম্যাচে ব্যাট করতে নেমে সাকিব আশ্চর্য দৃঢ়তার প্রকাশ ঘটিয়েছিলো। উইকেট রক্ষক তখন কভেন্ট্রি। বিরাট ইনিংস খেলার আত্মতৃপ্তি তার শরীরী ভাষায়। ক্যামেরার কল্যাণে আমরা তখন সাকিবকে বিরক্ত হতে দেখেছি। বড় কিছু করে সাকিব কখনো আত্মতুষ্টিতে ভাসে নি। কভেন্ট্রির আচরণও তাকে বিরক্ত করবে স্বাভাবিক।

সাকিব এক চির-ক্ষুধার্ত শিল্পী যার কোনো পরিতৃপ্তি নাই। যার প্রতিযোগিতাটি কেবল নিজের সাথে। এশিয়া কাপের ফাইনালে হেরে যাবার পর মুশফিককে জড়িয়ে অশ্রুসজল হয়ে ওঠা সম্ভবত সাকিবের আবেগের শ্রেষ্ট প্রকাশ। পরের ম্যাচে আরো বড় কিছু করার অনমনীয় পণ করেই সাকিবের মত খেলোয়াড়রা আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিশ্ব আসরে বাংলাদেশকে জিততে দেখে কাঙাল দর্শক, আমরা আবেগে চোখ ভিজিয়েছি, আশাহত হবার বেদনায় বুক ভেঙেছি। সাকিবকে দেখেছি নির্মোহ জাদুকরের মত একটার পর একটা রেকর্ড ভাঙতে। দুনিয়া সেরা অলরাউন্ডারের জায়গাটি প্রায় নিজের করে ফেলা সাকিব আমাদের অহংকার। ক্রিকেট আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়। সকল ক্ষোভ ও না পাওয়ার যন্ত্রণার উপশম খুঁজেছি ক্রিকেটের ভেতর।

সাকিবের বিয়ের পর তার বউ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলো এক সাংবাদিক যে, তার বউ ক্রিকেট বোঝে কিনা। উত্তরে সাকিব বলেছিলো, ও আসলে ক্রিকেটের কিছুই বোঝে না। সাংবাদিক বিস্মিত হয়ে জানতে চেয়েছিলো, তারপরও তাকে বউ হিসেবে নির্বাচনের কারন কী? সাকিবের নির্বিকার উত্তর, বেশি বোঝা মানুষ আমার পছন্দ না, কম বোঝে বলেই ওকে আমার পছন্দ হয়েছে। ভাবুন তো, কোনো ভড়ং ও কপটতা কি আছে মানুষটার মধ্যে? ব্যক্তি জীবনে যার এমন দৃষ্টিভঙ্গী, তার কাছে তো কোনো কৃত্রিমতারই ঠাই থাকার কথা নয়। খেলোয়াড় হিসেবেও তাকে দেখেছি ভড়ংহীন সাদাসিধে এক দুর্দান্ত পারফর্মার।

দর্শকরা প্রায়শই মন্তব্য করেছে, সাকিব অহংকারী, বেয়াদব, অশালীন আচরণ করে ইত্যাদি। ক্রিকেট খেলতে যেই সাকিবকে দেখা যায়, সেই সাকিবের পক্ষে তেমনটি না হয়ে উপায়ও তো নেই। দর্শক মাঠে এসে তার পারফর্ম করে দেবে না কিন্তু দিনশেষে খারাপ খেলার জন্য আবেগী দর্শক তাকে ঠিকই তুলোধুনো করবে। একজন সুদূরপ্রসারী চিন্তার ক্রিকেটারের কাছে এটাই শেষ কথা। সাকিব সব সময় থেকে গেছে নিজের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাকে কখনো জনপ্রিয়তার জোয়ারে ভেসে যেতে দেখা যায় নি। প্রতিটি সেক্টরে আমাদের এই রকম প্রতিশ্রতিশীল মানুষ দরকার এখন। যে দর্শকের বাহবা নিতে হণ্য হবে না, চেষ্টা করবে ক্রমাগত নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার।

ম্যাচ ফিক্সিং এর প্রস্তাব পেয়ে ফিরিয়ে দেয়ার প্রমাণ আছে কিন্তু আকসুকে জানানোর প্রমাণ নেই। সাকিব তো এমন ঘটনা পূর্বে জানিয়েছে। এবার জানায় নি কেন? নাকি জানানোর প্রয়োজন মনে করে নি? হতে পারে এটি উদাসীনতা। কিংবা দেশের কর্তাদের জানিয়েই সে নির্ভার থেকেছিলো। এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানার অপেক্ষায় রইলাম। তবে এটুকু আমরা ইতিমধ্যেই জেনে গেছি, সাকিব কোনো অন্যায় করে নি, বড় জোর সে ভুল করে থাকতে পারে।

আমরা দেশকে বিশ্ব মঞ্চে বারবার গৌরবদীপ্ত করার কৃতজ্ঞ আবেগে সাকিবের এই ভুলকে বড় করে দেখবো না ঠিক। কিন্তু তার সাথে অখেলোয়াড়দের প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণে অবশ্যই মর্মাহত হই। সব বাধা ডিঙিয়ে সাকিব তার লক্ষ্যে অবিচল থাকুক। অল্পে খুশি জাতি বারবার ক্রিকেটের বিজয়ে আনন্দের জোয়ারে ভাসতে থাকুক। সাকিবের হাত ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সোনালী দিন বজায় থাকুক। আমরা সাকিবের অন্ধ ভক্ত। যা কিছু হোক, সাকিবকে আমরা খেলতে দেখতে চাই। তার মত আত্মপ্রতিশ্রুতিশীল মানুষে ভরে উঠুক আমার সোনার বাংলা।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.