এইমাত্র পাওয়া

চলে গেলেন সুরকার আলম খান

‘ওরে নীল দরিয়া’, ‘হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস’, ‘আমি একদিন তোমায় না দেখিলে’, ‘চাঁদের সাথে দেব না’, সহ অসংখ্যা জনপ্রিয় গানের সুরকার আলম খান ১৯৪৪ সালে সিরাজগঞ্জের বানিয়াগাতি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আফতাব উদ্দিন খান ছিলেন সেক্রেটারিয়েট হোম ডিপার্টমেন্টের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার ও মা জোবেদা খানম ছিলেন গৃহিণী। আলম খান ১৯৬৩ সালে রবিন ঘোষের সহকারী হিসেবে ‘তালাশ’ চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন।

চলচ্চিত্রের গানে এন্ড্রু কিশোরের অভিষেক সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলম খানের হাত ধরে। আজ তাঁরা দুজনই স্মৃতি। ছবি: সংগৃহীত

চলচ্চিত্রের গানে এন্ড্রু কিশোরের অভিষেক সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলম খানের হাত ধরে। আজ তাঁরা দুজনই স্মৃতি। ছবি: সংগৃহীত

১৯৭০ সালে প্রথম চলচ্চিত্রকার আব্দুল জব্বার খান পরিচালিত ‘কাচ কাটা হীরে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এককভাবে সংগীত পরিচালনা শুরু করেন। তাঁর সুর করা প্রথম জনপ্রিয় গান ‘স্লোগান’ ছায়াছবির ‘তবলার তেড়ে কেটে তাক’। এরপর ১৯৭৭ সালে আবদুল্লাহ আল মামুন তাঁর পরিচালিত ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রের গান নিয়ে কথা বলার সময় তাঁর ১৯৬৯ সালের সুর করা একটি মুখরা শোনালে ছবির পরিচালক তা নিতে আগ্রহী হন। ১৯৭৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সেই ছবির আবদুল জব্বারের কণ্ঠে ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানটি তাঁর এক অনন্য সৃষ্টি। ১৯৮২ সালে ‘রজনীগন্ধা’ চলচ্চিত্রে সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া ‘আমি রজনীগন্ধা ফুলের মত’ ও ‘বড় ভালো লোক ছিল’ চলচ্চিত্রের সৈয়দ শামসুল হকের লেখা এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’ দর্শকদের মনোযোগ কাড়ে। ‘বড় ভালো লোক ছিল’ চলচ্চিত্রের জন্য আলম খান অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ১৯৮৫ সালে তাঁর সুর করা ‘তিন কন্যা’ চলচ্চিত্রের ‘তিন কন্যা এক ছবি’ গান দিয়ে প্লেব্যাক শুরু করেন বলিউডের সংগীতশিল্পী কুমার শানু।

টেলিভিশনের নাটকেও দারুণ সফল ছিলেন আলম খান। আবদুল্লাহ আল মামুনের মঞ্চনাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘ইডিয়ট’সহ বেশ কিছু নাটকের সংগীত পরিচালনা করেন তিনি।

তিনি সর্বশেষ এ টি এম শামসুজ্জামান পরিচালিত ‘এবাদত’ চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ লাভ করেন। মোট সাতবার এ পুরস্কার পান তিনি।

আলম খানের সুর ও সংগীত পরিচালনায় সৃষ্ট অসংখ্য গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো—‘চুমকি চলেছে একা পথে’, ‘হীরামতি হীরামতি ও হীরামতি’, ‘আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো গন্ধ বিলিয়ে যাই’, ‘বুকে আছে মন’, ‘ সবাই তো ভালোবাসা চায়’, ‘ভালোবেসে গেলাম শুধু’, ‘আজকে না হয় ভালোবাসো আর কোনোদিন নয়’, ‘তেল গেলে ফুরাইয়া’, ‘আমি তোমার বধূ তুমি আমার স্বামী’, ‘মনে বড় আশা ছিল’, ‘দুনিয়াটা মস্ত বড়’, ‘ও সাথীরে যেও না কখনো দূরে’, ‘কাল তো ছিলাম

আমি মনের মতো কোনো দৃশ্য পাইনি বলে কোনো ছবিতে সুরটি ব্যবহার করতে পারিনি। ১৯৭৬-৭৭ সালের দিকে যখন আবদুল্লাহ আল মামুন তাঁর ‘সারেং বউ’ ছবির গান নিয়ে বসলেন, তখন গল্প শুনে মনে হলো, এই ছবির সারেংয়ের বাড়ি ফেরার দৃশ্যে সুরটি ব্যবহার করা যায়। গীতিকার মুকুল চৌধুরী ও আমি দুজনই এই ছবির পুরো গল্প পড়ে নিই। এরপর মুকুল চৌধুরীকে এই সুরটা দিয়ে বললাম গান লিখতে। তিনি দুই দিন পর অন্তরাসহ লিখে নিয়ে এলেন। আমি মামুন ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম সারেং কীভাবে বাড়ি ফিরছে। তখন তিনি বললেন, প্রথম অন্তরায় ট্রেনে, দ্বিতীয় অন্তরায় সাম্পানে, এরপর মেঠোপথ ধরে ফিরবে। দৃশ্য অনুযায়ী ট্রেনের ইফেক্ট, সাম্পান, বইঠা, পানির ছপছপ শব্দ এবং শেষে একতারার ইফেক্ট তৈরি করলাম। এই গানে ১২ জন রিদম প্লেয়ারসহ ২৪ জন বাদ্যযন্ত্রশিল্পী বাজিয়েছিল।

‘রজনীগন্ধা’ ছবির ‘আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো গন্ধ বিলিয়ে যাই’ সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া এই গানটির কথাও এসে যায়। পরিচালক কামাল আহমেদের সঙ্গে এটাই প্রথম কাজ। দৃশ্য শুনে প্রথমে সুর করলাম। সুরের ওপর গীতিকার মাসুদ করিম কথা লেখার পর পরিচালককে গেয়ে শোনালাম। তিনি সুর শুনে বাইরে গিয়ে অন্যদের বললেন, তাঁর গানটি পছন্দ হয়নি। এই সুর তিনি নেবেন না। শুনে বললাম, এই সুর না নিলে আমিও গান করব না। পরে তিনি রাজি হলেন। কিন্তু গান রেকর্ডিংয়ের দিন এলেন না। গানটি রেকর্ডের পর তিনি শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।

‘নাগ পূর্ণিমা’ ছবির ‘তুমি যেখানে আমি সেখানে, সে কি জানো না’ গানটির কথাও মনে পড়ে। নাগ পূর্ণিমা ফোক ফ্যান্টাসি ছবি। কিন্তু পরিচালক ও প্রযোজক মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা বললেন, ‘আমি একটা রক গান করতে চাই এ ছবিতে।’ সিকোয়েন্স শুনে বললাম, রক গান ছবির সঙ্গে ম্যাচ করবে না। তিনি বললেন, ‘আপনি ম্যাচ করাতে পারবেন বলেই তো গানটা করতে চেয়েছি।’ গীতিকার মনিরুজ্জামান মনির সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তিনি বললেন, ‘ছবির পেক্ষাপট অনুযায়ী একটা লাইন পেয়েছি; “তুমি যেখানে আমি সেখানে সে কি জানো না”।’ মুখটা তখনই সুর করি। অন্তরার সুর পরে করা। গানটি গাওয়ার পর শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের গলা বসে যায়। সাত দিন সে আর কোনো গান গাইতে পারেনি।

চলচ্চিত্রের গানে এন্ড্রু কিশোরের অভিষেক সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলম খানের হাত ধরে । ছবি: সংগৃহীত

চলচ্চিত্রের গানে এন্ড্রু কিশোরের অভিষেক সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলম খানের হাত ধরে । ছবি: সংগৃহীত

‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস’ এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া গানটি বড় ভালো লোক ছিল ছবির। এই ছবির সবগুলো গানই লিখেছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। মনে আছে, গানের প্রথম চারটি লাইন একটা ছোট কাগজে লিখে হক ভাই আমাকে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ছবির স্ক্রিপ্ট লিখছি। আপনি মুখটা সুর করতে থাকেন।

স্ক্রিপ্ট শেষ হলে বসে গানটা শেষ করব।’ আমি কাগজটা মানিব্যাগে রেখে দিলাম। সময় পেলে মাঝেমধ্যে সুর করতাম। প্রায় ১৫টা সুর করেছিলাম। এখন সে সুরটা পরে এটাই মনে ধরল। তিন মাস পর হক ভাই একসকালে তাঁর বাড়িতে ডাকলেন। মুখের সুর শোনার পর তিনি অন্তরা লিখে দিলেন। কিন্তু তিন ঘণ্টা চেষ্টা করেও মনমতো অন্তরার সুর করতে পারলাম না। মন খারাপ করে আমার সহকারী গোপীসহ বাড়ি ফিরলাম। বাসায় ফিরে গোসল করতে তোয়ালে কাঁধে যখন বাথরুমে ঢুকব, তখনই সুরটা মাথায় এল। দ্রুত বেরিয়ে সুরটা রেকর্ড করলাম। পরদিন গিয়ে শোনালাম। হক ভাই শুনেই বললেন, ‘আপনি “পূর্ণিমাতে ভাইস্যা গেছে” বলে যে টান দিয়েছেন, তাতেই মন ভরে গেছে।’ এরপর আমরা গানটির রেকর্ডিংয়ে যাই।

শ্রোতাপ্রিয় কিছু গান
১. এক চোর যায় চলে
২. তুমি আছ সবি আছে
৩. চাঁদের সাথে আমি দেব না
৪. ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে
৫. সবার জীবনে প্রেম আসে
৬. তেল গেলে ফুরাইয়া
৭. ভালোবেসে গেলাম শুধু
৮. কী জাদু করিলা
৯. তোমরা কাউকে বোলো না
১০. আমি একদিন তোমায় না দেখিলে
১১. বুকে আছে মন
১২. কারে বলে ভালোবাসা
১৩. তোরা দেখ দেখ রে চাহিয়া
১৪. জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প
১৫. চক্ষু দিয়া দেখতাছিলাম
১৬. তুমি ছিলে মেঘে ঢাকা চাঁদ
১৭. এখানে দুজনে নিরজনে
১৮. মনে বড় আশা ছিল
১৯. কাল তো ছিলাম ভালো
২০. আমি তোমার বধূ


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.