এইমাত্র পাওয়া

কী হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেই চলেছে। ছাত্রের হাতে শিক্ষকের মার খাওয়া, শিক্ষার্থীর স্টাম্পের আঘাতে শিক্ষকের মৃত্যু, শিক্ষককে গলায় জুতার মালা পরানো, কান ধরে উঠবস করানোসহ একের পর এক ঘটনা তৈরি হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়। মানুষ গড়ার কারিগররা ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষিত করতে এসে নিজেরাই বিদ্যাপীঠগুলোয় লাঞ্ছিত হচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাণও দিতে হচ্ছে তাঁদের। কিন্তু এসব ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর বা সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা দায়সারা তদন্ত কমিটি করেই দায়িত্ব শেষ করছেন বলে অভিযোগ। আর বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ছাত্র-ছাত্রীদের মূল্যবোধ, মানবিকতার শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু জিপিএ-৫ পেতেই ছাত্র-ছাত্রীদের তৈরি করা হচ্ছে, তাদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কোনো উদ্যোগই লক্ষণীয় নয়। উচ্চশিক্ষিত হয়ে তরুণ-তরুণীরা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত মানুষ হচ্ছে কতটুকু সে প্রশ্নও রেখেছেন শিক্ষাবিদরা।

সম্প্রতি সাভারের আশুলিয়ায় চিত্রশাইল এলাকায় হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থীর ক্রিকেট স্টাম্পের আঘাতে উৎপল কুমার সরকার নামে এক কলেজশিক্ষক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইডেট ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে জুতার মালা পরানো হয়েছে। শিক্ষক লাঞ্ছিতের ঘটনার নয় দিন পর সোমবার মামলা করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত তিনজনকে সোমবার রাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। গতকাল এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবীর।

পিটিয়ে শিক্ষক হত্যা ও শিক্ষক লাঞ্ছনার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এসব ঘটনার বিচার দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন সারা দেশের শিক্ষকরা। গতকাল দেশের বিভিন্ন জেলায় শিক্ষকরা এসব ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবিতে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরাও এ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারের হত্যাকারীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারসহ ছয় দফা দাবিতে গতকাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা। গতকাল বেলা ১১টার দিকে এ কর্মসূচি পালন করেন তারা। নিহত উৎপল কুমার সরকার প্রায় ১০ বছর ধরে এ কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক এবং শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের আশ্বাস না পাব, প্রতিদিনই আমরা আন্দোলন করে যাব।’ শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে- ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীকে গ্রেফতার, হত্যাকারীর সঙ্গে থাকা অজ্ঞাতনামা আসামিদের আইনের আওতায় আনা, নিহতের পরিবারকে সর্বোচ্চ আর্থিক ক্ষতিপূরণ দান, পুরো এলাকা থেকে কিশোর গ্যাং নির্মূল।

কলেজশিক্ষক উৎপল কুমার সরকার হত্যা ও নড়াইলে শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদে গতকাল মানববন্ধন ও সমাবেশের আয়োজন করে স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ (স্বাশিপ)। সাভার উপজেলা পরিষদ চত্বরে শহীদ মিনারের সামনে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষক হত্যাকারীকে গ্রেফতারে আলটিমেটাম দেওয়া হয়। এ ছাড়া দেশব্যাপী কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। স্বাশিপের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান আলম সাজু এ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সাভারে কলেজশিক্ষক উৎপল কুমার সরকার হত্যা, নড়াইলে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কলেজ অধ্যক্ষ স্বপন সাহাকে নাজেহাল করার ঘটনা বর্বরতার নিকৃষ্ট উদাহরণ। এ বর্বরতা মেনে নেওয়া যায় না।

নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইডেট ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে লাঞ্ছিত ও অপমান করায় নিন্দা জানিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. মশিউর রহমানের নির্দেশে ঘটনাটি সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান করার জন্য তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আমাদের নড়াইল প্রতিনিধি জানান, মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনার পর নড়াইল সদর থানায় পুলিশের উপপরিদর্শক ও মির্জাপুর ফাঁড়ির ইনচার্জ শেখ মোহাম্মদ মোরছালিন বাদী হয়ে তিনটি মোটরসাইকেল পোড়ানো এবং পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ১৭০ থেকে ১৮০ জনের নামে মামলা করেছেন। সোমবার রাতেই এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন কলেজের পাশের মির্জাপুর বাজারে মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী সদরের বিছালী ইউনিয়নের আড়পাড়া গ্রামের মালেক মুন্সীর ছেলে বখাটে শাওন মুন্সী (৩০)। এ মামলায় গ্রেফতার অন্যরা হলেন মির্জাপুর মধ্যপাড়ার মো. মনিরুল ইসলাম ও মির্জাপুর গ্রামের সৈয়দ মিলনের ছেলে সৈয়দ রিমন আলী।

এরই মধ্যে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে কলেজ পরিচালনা কমিটি। এ বিষয়ে জানতে মৌখিকভাবে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি করার নির্দেশনা দিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) কর্তৃপক্ষ। নড়াইল জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ছায়েদুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনায় রিট আবেদন নিয়ে আসতে বলেছেন হাই কোর্ট। এ বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন গতকাল বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাই কোর্ট বেঞ্চের নজরে আনলে আদালত এ পরামর্শ দেন। আদালতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন নজরে আনেন আইনজীবী পূর্ণিমা জাহান। তখন হাই কোর্ট বলেন, ‘আপনারা রিট আবেদন নিয়ে আসুন। আমরা শুনব।’ বৃহস্পতিবার এ ঘটনায় রিট আবেদন দায়ের করা হবে বলে জানা গেছে।

শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদে গতকাল টিএসসিতে সমাবেশ -বাংলাদেশ প্রতিদিন

শাস্তি দাবিতে ঢাবি শিক্ষক সমিতির বিবৃতি : সাভারে শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা ও নড়াইলে অধ্যক্ষকে লাঞ্ছনার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল বলা হয়- সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ম নিয়ে একশ্রেণির মানুষের অপতৎপরতা দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মূল্যবোধকে চরমভাবে আঘাত করছে, যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ ছাড়া সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার অভাবে কোথাও কোথাও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের চরম অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে বলা হয়- এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সব স্তরের শিক্ষার্থীকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার বিকল্প নেই।

নড়াইলে শিক্ষক লাঞ্ছনা ও সাভারে শিক্ষক হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের দাবিতে সমাবেশের আয়োজন করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সকালে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে অংশ নিয়ে জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ মিহির লাল সাহা বলেন, ‘এমন সমাজ আমরা চাইনি। বিচারহীনতার সমাজে কখন বিচার হবে? এ ঘটনায় জড়িতদের আগে ধরে প্রকাশ্যে জুতার মালা পরাতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করব, শিক্ষক লাঞ্ছনার দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’ জগন্নাথ হল শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি কাজল দাস, সাধারণ সম্পাদক অতনু বর্মণসহ অন্যরা এতে বক্তব্য দেন।

প্রসঙ্গত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নড়াইল সদরের এক কলেজছাত্রের পোস্টকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ১৮ জুন মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও উপস্থিত ছিল। আর শনিবার দুপুরে সাভারের আশুলিয়ার হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির এক ছাত্রের ক্রিকেট স্টাম্পের আঘাতে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার গুরুতর আহত হন। সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সোমবার ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়।

শিক্ষককে অপদস্থের ঘটনায় রিট করার পরামর্শ হাই কোর্টের : নড়াইলে পুলিশের সামনে শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা দিয়ে অপদস্থ করার ঘটনায় অভিযুক্তদের বিষয়ে রিট করার পরামর্শ দিয়েছেন হাই কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী পূর্ণিমা জাহান বিষয়টি নজরে আনার পর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ এমন পরামর্শ দেন। আদালত বলেন, ‘আপনারা রিট আবেদন নিয়ে আসুন। আমরা শুনব।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী পূর্ণিমা জাহান সাংবাদিকদের বলেন, ‘নড়াইলে এক শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরানো নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। বিষয়টি দেখে ব্যক্তিগতভাবে আমি খুব আহত হয়েছি। এটা মেনে নেওয়া যায় না। এ কারণে এ বিষয়ে ব্যবস্থা চেয়ে আদালতের নজরে এনেছিলাম। আদালত রিট দায়ের করতে বলেছেন। আমরা বৃহস্পতিবার রিট দায়ের করব।’


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.