সজল চৌধুরী।।
বর্তমানে আমাদের দেশে যে বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে—সেটি হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিন্ন শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা। কোথা থেকে এলো এবং কীভাবে এলো এই নীতিমালা, সে প্রসঙ্গে আসার আগে একটু ঘুরে আসা যাক বিশ্বের নামকরা কিছু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কী কী ধরনের নীতিমালা কিংবা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় তা দেখা যেতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম সারির মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় টাইম হায়ার এডুকেশন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকাতে অবস্থান ৩২তম এবং অস্ট্রেলিয়াতে প্রথম স্থানে রয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। সম্প্রতি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের লেকচারার কিংবা সিনিয়র লেকচারার পদের জন্য যে যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে—প্রার্থীকে অবশ্যই উক্ত বিষয়ের ওপর ডিগ্রিধারী হতে হবে, ডক্টরেট থাকতে হবে, নামকরা জার্নালে পাবলিকেশন থাকতে হবে, নামকরা উচ্চমার্গের বৃত্তিপ্রাপ্ত হতে হবে, গবেষণা কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, সেমিনার ওয়ার্কশপ পরিচালনা করার সক্ষমতা থাকতে হবে, সঠিক পন্থায় ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো এবং মোটিভেশনের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, গবেষণাপত্র লেখা এবং কমিউনিকেশন দক্ষ হতে হবে, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গবেষণা পরিচালনা এবং নেটওয়ার্ক তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা থাকতে হবে ও কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, বিভিন্ন পরিবেশে কাজ করতে পারবে এমন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রার্থীকেই আবেদন করতে বলা হয়েছে। তাছাড়া আরো তিনটি বিষয়ে বলা হয়েছে—যেসব অভিজ্ঞতা থাকলে সেই সব প্রার্থী অগ্রাধিকার পাবে, যেমন সে যদি পূর্বে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে থাকে, কোনো ধরনের গবেষণার অর্থায়নের জন্য পূর্বে আবেদনের দক্ষতা আছে, নিজস্ব কমিউনিটি বা মিডিয়াতে কাজ করতে পারার সক্ষমতা রয়েছে তার নিজস্ব গবেষণার ওপর।
এশিয়ার দুইটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুর এবং টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান তালিকায় রয়েছে ২৩তম এবং ৪২ তম। সেখানেও দেখতে পেলাম একই অবস্থা। প্রার্থী নির্বাচনে জোর দেওয়া হয়েছে তার পূর্বের একাডেমিক গবেষণার ওপর, গবেষণা কাজে অর্থায়নের অভিজ্ঞতার ওপর, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ নেটওয়ার্কিং তৈরিতে তার দক্ষতার ওপর, তাকে অবশ্যই পিএইচডি ডিগ্রিধারী হতে হবে নির্দিষ্ট বিষয়ে, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা কতটুকু সেটিকেও প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়—ওয়ার্ল্ড র্যাংকিংয়ে যাদের অবস্থান একেবারে প্রথম সারিতে। তারা কী বলছে প্রভাষক কিংবা অধ্যাপক নিয়োগের ক্ষেত্রে? তারা আরো কম কথা বলছে! শুধু জানতে চাইছে প্রার্থীর পিএইচডি ডিগ্রি আছে কি না, আগে যদি কখনো শিক্ষকতার পূর্ব-অভিজ্ঞতা থাকে তাহলে তার স্বরূপ কেমন। তাদের গবেষণার ধরন—আধুনিকায়ন এবং মোটের ওপরে সমাজের প্রতি তার লিডারশিপের ধরন এবং তার ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা কী—এই ধরনের মোটিভেশনাল বিষয়গুলোর ওপর বেশি জোর দিচ্ছে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে।
২০১৯ এবং তার পূর্ববর্তী বছরগুলোতে ভালোমানের গবেষণা করেছে—এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো (হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, এম আই টিসহ অন্যগুলো) যেখানে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য শুধু হুমড়ি খেয়ে না পড়ে তারা তাদের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখে নিজ নিজ অবস্থানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের সামনে। সেখানে আমরা কোথায়? বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ১ হাজার তালিকার মধ্যেও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নাম দেখা যায় না! এত নিয়মনীতি আর বস্তাপচা বেড়াজাল থেকে আমরা দিন দিন নিজেদের ফেলে দিচ্ছি গভীর অন্ধকারে—হাত ধরে টেনে তোলার যেন কেউ নেই। বরং কেউ একবার সুযোগ পেয়ে গেছে তাই অন্যের সুযোগগুলো কীভাবে কমানো যায় সেই চিন্তাতেই ব্যস্ত! সেখানে নিজেদের উন্নতি দিয়ে কী আসে যায়? যারা ভালো করছে তারা কীভাবে ভালো করছে, কী ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষাগত উন্নয়নের মাধ্যমে ভালো করছে, কোন নিয়মনীতির মাধ্যমে ভালো করছে, সেগুলো না দেখে আমরা সব সময় নিজেরাই নিজেদের পায়ে শিকল পড়াচ্ছি।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এর অভিন্ন শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা চূড়ান্ত হবার আগেই এ নিয়ে চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের মধ্যে। শুধু তাই নয়, এই ধরনের নীতিমালা এবং চিন্তা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মনে রাখতে হবে, দেশের সবকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বরূপ যেমন এক নয়, তাই অভিন্ন নীতিমালা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সুস্থ জ্ঞানচর্চার জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে প্রতীয়মান। অনেকের মতে এ ধরনের চিন্তাভাবনা শিক্ষকদের সঙ্গে অযথা সরকারবিরোধী মনোভাব এর ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারে। কারণ পৃথিবীর আর কোনো দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে সামগ্রিকভাবে এমন অভিন্ন নীতিমালা নেই যেখানে উচ্চশিক্ষা অর্জনকে গুরুত্বহীন করা হয়েছে এবং যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থি।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
