
ভ্লাদিমির পুতিন কে?

পুতিনের দুরন্ত শৈশবঃ
কিশোর বয়সেই জুডো প্রশিক্ষণে ব্লাকবেল্ট পেয়েছিলেন পুতিন। পুতিনের মা প্রথমদিকে ছেলের জুডো অনুশীলন একদম পছন্দ করতেন না। পুতিন একবার বলেছিলেন, ‘যখনই আমি জুডো প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে বের হতাম, মা গালিগালাজ করতেন। অবশ্য আমার জুডো কোচ যেদিন আমার বাসায় এসে মা-বাবাকে বুঝান এরপরেই সব বদলে যায়। আমার এই খেলার প্রতি পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়’।
পুতিনের বাবা প্রথম জীবনে একজন যোদ্ধা ছিলেন। ১৯৫০ এর দশকে যখন পুতিন জন্ম নেন হয় তখন তার বাবা একজন সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ফোরম্যান হিসেবে কাজ শুরু করেন। পুতিন জানান, ‘বাবা ১৯১১ সালে সেইন্ট পিটার্সবার্গে জন্মগ্রহণ করেন। ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেইন্ট পিটার্সবার্গে খাদ্যের অভাব শুরু হলে সেখানে বসবাস করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই পুরো পরিবার রাশিয়ার টিভের এর পোমিনোভো গ্রামে চলে আসি, যা ছিল আমার দাদীর পৈতৃক গ্রাম’।

শিক্ষাজীবন
পরে অষ্টম শ্রেণী পাশ করে তিনি প্রাইমারি ছেড়ে হাইস্কুলে ভর্তি হন। এটি ছিল রসায়ন বিদ্যায় বিশেষ প্রাধান্য দেয়া একটি প্রযুক্তি শিক্ষাকেন্দ্র। ১৯৭০ সালে পুতিন এখান থেকে পাশ করে বের হন। সেই সময়ে তার মনোভাবের বিষয়ে পুতিন বলেন, ‘আমার কাছে এই ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে সাধারণ ভালো ছাত্র হওয়াটা যথেষ্ঠ নয়, কাজেই আমি খেলাধুলায় অংশ নিতে শুরু করলাম। কিন্তু সেটাও আমার মর্যাদাকে ধরে রাখার জন্য যথেষ্ঠ মনে হলো না, আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার পড়াশুনাতেও ভাল করতে হবে’।
স্কুল শেষ করার আগেই পুতিন ঠিক করে ফেলেন তিনি ইন্টেলিজেন্সের হয়ে কাজ করবেন। হাইস্কুলে পড়ার সময়ে তিনি কেজিবি’র একটি শাখার পাবলিক রিসিপশনে গিয়ে শোনেন কিভাবে একজন স্পাই বা গুপ্তচর হওয়া যায়। সেখানে তিনি জানতে পারেন, হয় তাকে সেনাবাহিনীতে কাজ করতে হবে, অথবা তার একটি কলেজ ডিগ্রি থাকতে হবে। আর সবথেকে ভালো হয়, যদি সেই ডিগ্রিটি আইনের ওপর হয়। তারপরেই পুতিন লেলিনগ্রাদ স্টেট ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। ১৯৭০ সালে পুতিন লেলিনগ্রাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। তার শ্রেণীতে ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পুতিনসহ মাত্র ১০জন ছিল হাইস্কুল পাশ করা ছাত্র। বাকি সবাই মিলিটারি জীবন শেষে এখানে এসেছিল। এই ১০টি আসনের জন্য পরীক্ষা দিয়েছিল ৪০০ জন শিক্ষার্থী।

বৈবাহিক জীবন ও সন্তান


যেভাবে শুরু করেন কর্মজীবন:

জার্মানিতে পুতিনঃ
মস্কো ও প্রধানমন্ত্রিত্বঃ
সেই বছরেই আগস্ট মাসে তিনি রাশিয়া সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। রাশিয়ার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বরিস ইয়েলৎসীন নিজে থেকে পুতিনকে এই পদে আসীন হওয়ার জন্য প্রস্তাব দেন। পুতিন এই ব্যাপারে বলেন, ‘ইয়েলৎসীন আমাকে তার সাথে দেখা করার জন্য ডেকে পাঠান এবং আমাকে প্রধানমন্ত্রীর পদটি নেয়ার জন্য প্রস্তাব দেন। আমার সেই সময়ের চিন্তা ছিল, আমি যদি এর মধ্য দিয়ে এক বছর ভালোভাবে টিকে যেতে পারি সেটাই হবে একটা ভালো শুরু’।

প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন: রাশিয়ার সুপারহিরো

প্রথম মেয়াদে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দারুন সফলতা ও সাধারন রাশিয়ানদের মাঝে দারুন জনপ্রিয়তা অর্জন করার পর ২০০৪ সালের ৪ মার্চ পুতিন আবারও রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের ৮ মে পুতিন দ্বিতীয়বারের মত রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। পুতিনের মতে জনগনই একজন প্রধানমন্ত্রীর মনযোগের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিৎ। প্রশাসনকে অবশ্যই জনগনের সমর্থন অর্জন করতে হবে। যদি সেই সমর্থন তারা না পান, তাহলে ক্ষমতায় থাকার কোনও অধিকারই তাদের নেই। পুতিনের এই মনোভাব ধারন করা এবং সেই মনোভাবকে কাজে পরিনত করার কারনেই রাশিয়ার সাধারন মানুষের মাঝে তার এতটা জনপ্রিয়তা।

গ্রীষ্মে লাগা দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবার যারা গৃহ হারা হয়েছিল, সবাইকে শীত আসার পূর্বেই নতুন বাড়ি বা এ্যাপার্টমেন্ট হস্তান্তর করা হয়। যারা অনুরোধ করেছিল, বাড়ির বদলে তাদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। সর্বমোট ২২০০টি পরিবার এই ক্ষতিপূরণ প্রকল্পের আওতায় নতুন বাড়ি লাভ করেছিল।
রাশিয়ার কৃষিক্ষেত্র উন্নয়নে পুতিন সবসময়েই সরাসরি সমর্থন দিয়ে এসেছেন। তার মতে, ধাপে ধাপে রাশিয়া নিজেদের খাদ্য এবং কৃষির স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করছে। তিনি কৃষিক্ষেত্রে জড়িতদের সবসময়েই অন্যরকম উৎসাহ দিয়ে থাকেন। ২০১১ সালে পুতিন ঘোষণা দেন, ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের মধ্যে শিক্ষকদের বেতন অন্তত প্রতিটি এলাকার অর্থনীতি অনুযায়ী সর্বোচ্চ বেতন গড়ের সমান হতে হবে। এই ব্যাপারটি তিনি ব্যক্তিগতভাবে তদারকি করেন। ২০১১ সালের নভেম্বরে পুতিন আবারও রাশিয়ার টুয়েলভথ্ পার্টি কনগ্রেস থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণের মনোনয়ন পান। ২০১২ সালের মার্চে তিনি আবারও রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এছাড়াও তিনি ২০১৩ সালের মধ্যে সেনাসদস্যদের পেনশনের হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি এবং তাদের বেতন ভাতার পরিমাণ বাড়ানোরও নির্দেশ দেন প্রশাসনকে।
পুতিনের সম্পদ

পুতিন যেভাবে অপরিহার্য হয়ে উঠলেন

সমাপ্তি
অনেকের মতেই সাম্প্রতিক কালে পুতিনের মত করে রাশিয়াকে আর কেউ বোঝেনি বা সেই অনুযায়ী চালাতেও পারেনি। তেল, গ্যাস, তামা এবং এ্যালুমিনিয়ামের মত প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর সঠিক ব্যবহার পুতিন নিজ দায়িত্বে নিশ্চিত করেছেন। স্পাই হিসেবে নিজের সাবেক কাজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্সকে ঢেলে সাজিয়েছেন। একজন কেজিবি গুপ্তচর, যাকে একটা সময়ে কেউই চিনত না, আজ তিনি রাশিয়ার শুধু প্রেসিডেন্টই না, পুরো জাতির সুপারহিরো।

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
