“জ্ঞানেই মুক্তি, আগামীর ভিত্তি” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে অদ্য ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস। এই প্রতিপাদ্যটি একটি চিরন্তন সত্যকে নতুন মাত্রায় তুলে ধরেছে। তথ্যের ব্যাপকতা, ডিজিটাল বিপ্লব এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির এই যুগে গ্রন্থাগার আর কেবল একটি বই সংরক্ষণের নিরব ভাণ্ডার নয়। এগুলো এখন গতিশীল প্রতিষ্ঠান যা একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
রূপান্তরের এই প্রক্রিয়ায় এআই একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফলে, বাংলাদেশের গ্রন্থাগার ও গ্রন্থাগারিকদের সংজ্ঞায়িত করার অভূতপূর্ব এক নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। উন্নত বিশ্বের গ্রন্থাগারে এআই প্রযুক্তি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। চীনের হাংঝৌ পাবলিক লাইব্রেরিতে এআই-ভিত্তিক রোবট ব্যবহারকারীদের সহজে তথ্য খুঁজে পেতে সহায়তা করছে। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির জেমস বি. হান্ট জুনিয়র লাইব্রেরিতে স্বয়ংক্রিয় তথ্য ব্যবস্থাপনা ও রোবটিক বই সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে সেখানে চমৎকার একটি তথ্যনির্ভর শিক্ষার পরিবেশ গড়ে উঠেছে।
ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি সেন্ট্রাল লাইব্রেরি ‘ওডি’-তে এআই-চালিত স্মার্ট সার্চ সিস্টেম ও ব্যবহারকারী আচরণ বিশ্লেষণ প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। এটি পাঠককে তার আগ্রহ ও প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজিটাল রিসোর্স জোগান দিয়ে থাকে। এর ফলে পাঠকরা চাহিদানুযায়ী কার্যকর তথ্যসেবা পাচ্ছেন। সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল লাইব্রেরি বোর্ড (এনএলবি) এআই ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় ক্যাটালগিং, কনটেন্ট বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল সংগ্রহ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। একইভাবে, যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ লাইব্রেরি এআই ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল আর্কাইভ থেকে গবেষণাসামগ্রী শনাক্ত, ভাষাগত বিশ্লেষণ এবং ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষণের কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রন্থাগারকে কেবল আধুনিক করছে না; বরং জ্ঞান আহরণ, গবেষণা এবং আজীবন শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গ্রন্থাগারের ভূমিকা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই উদাহরনগুলো তাই প্রমান করে।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি গ্রন্থাগারে এআই সংযোজনের জন্য প্রস্তুত? উত্তর হলো ‘না’। যদিও বাংলাদেশে জাতীয়, গণগ্রন্থাগার, একাডেমিক ও বিশেষ এই চার ধরনের গ্রন্থাগারের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। গত দুই দশকে ডিজিটাইজেশন কার্যক্রম, স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার এবং অনলাইন সম্পদ ধীরে ধীরে গ্রন্থাগার ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে। তবে সামগ্রিক চিত্রটি এখনও সন্তোসজনক নয়। অনেক গ্রন্থাগার প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত ডিজিটাল সংগ্রহ, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল ও স্বল্প বাজেট সমস্যায় জর্জরিত।
অথচ বাংলাদেশের গ্রন্থাগারিকগন বরাবরই তাদের পেশাগত নিষ্ঠা, অভিযোজন ক্ষমতা ও সেবামুখী মানসিকতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। এদের অধিকাংশই আধুনিক গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিষয়ে প্রশিক্ষিত। ডিজিটাল লাইব্রেরি, ওপেন অ্যাক্সেস ও তথ্যনির্ভর সেবার মতো বৈশ্বিক প্রবণতা সম্পর্কে সচেতন। এখন প্রয়োজন একটি কৌশলগত অগ্রযাত্রা। এআই সেই অগ্রযাত্রায় পথ দেখাতে পারে।
সময় এসেছে গ্রন্থাগারিকদের দক্ষতা মূল্যায়নের। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে গ্রন্থাগারিকতার মান যথেষ্ট ভালো। গ্রন্থাগারিকরা ক্যাটালগিং, শ্রেণিবিন্যাস, রেফারেন্স সেবা ও ব্যবহারকারী সহায়তায় দক্ষ। বিশেষ করে একাডেমিক ও জাতীয় গ্রন্থাগারগুলোতে মুদ্রিত বই, সরকারি প্রকাশনা ও স্থানীয় গবেষণা সামগ্রীর সমৃদ্ধ সংগ্রহ রয়েছে। তবে উচ্চমানের ডিজিটাল সম্পদে প্রবেশাধিকার, স্মার্ট অনুসন্ধান ব্যবস্থা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবা এখনও অত্যন্ত সীমিত।
এআই প্রযুক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে (ক) স্বয়ংক্রিয় মেটাডাটা তৈরি ও কনটেন্ট বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংগ্রহ, সংগঠন, বিতরণ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম উন্নত করতে পারে। এটি বুদ্ধিমান অনুসন্ধান ব্যবস্থা, সুপারিশমূলক সিস্টেম ও ভার্চুয়াল রেফারেন্স সেবার মাধ্যমে ব্যবহারকারী সেবা বাড়াতে পারে। এআই গ্রন্থাগারিকদের প্রতিস্থাপন করার বদলে তাদের দক্ষতাকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের গ্রন্থাগারিকদের মধ্যে এআই বিষয়ে সচেতনতা এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। কর্মশালা, সম্মেলন ও পেশাগত আলোচনায় এআই, মেশিন লার্নিং ও ডেটা অ্যানালিটিক্স স্থান পাচ্ছে। কিন্তু নীতিগত দিকনির্দেশনা, অর্থায়ন ও কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণের অভাবে বাস্তব প্রয়োগ হচ্ছে না। গ্রন্থাগারিকগন এআই এর কার্যকারিতা, প্রাসঙ্গিকতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রত্যয়ী। একই সঙ্গে তারা এর নৈতিক ব্যবহার, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা ও তথ্যের গোপনীয়তা নিয়েও সচেতন।
এআই-চালিত গ্রন্থাগার কীভাবে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে সহায়তা করতে পারে? একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্ভর করে নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তি, সমালোচনামূলক চিন্তা, উদ্ভাবন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর। প্রাকৃতিক ভাষাভিত্তিক অনুসন্ধান, বহুভাষিক ইন্টারফেস ও কণ্ঠনির্ভর সেবার মাধ্যমে এটি ভাষা, সাক্ষরতা ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারে যা গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এআই বিশ্বাসযোগ্য উৎস চিহ্নিত করতে ও ভুয়া তথ্য শনাক্ত করতে পারে। যার ফলে নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। এটি নিখুঁত তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্যবহারকারীর শেখার গতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। গ্রন্থাগার বরাবরই বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার রক্ষক। ডিজিটাল যুগে এই ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এআই এর নৈতিক ব্যবহার অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার মাধ্যমে সকলের জন্য উন্মুক্ত তথ্য ও গবেষণায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে।
তাহলে বাংলাদেশের করণীয় কী? দরকার একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ। এর মধ্যে রয়েছে গ্রন্থাগারের জন্য জাতীয় এআই নীতিমালা প্রণয়ন; গ্রন্থাগারিকদের সক্ষমতা উন্নয়নে বিনিয়োগ; অবকাঠামো ও ডিজিটাল সংগ্রহ আধুনিকীকরণ; পাইলট প্রকল্প ও উদ্ভাবনী ল্যাব চালু করা এবং গোপনীয়তা, স্বচ্ছতা ও মানবিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করে এআই এর নৈতিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ যখন একটি স্মার্ট, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জ্ঞাননির্ভর রাষ্ট্রে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখছে, তখন এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে গ্রন্থাগারকে। এআই এখন আর গ্রন্থাগারের জন্য কোনো বিলাসিতা নয়; বরং অপরিহার্য। পরিকল্পিত ও দায়িত্বশীল এআই এর ব্যবহার বাংলাদেশের গ্রন্থাগারগুলোকে জীবন্ত উপকরণ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস-২০২৬ এর এই চেতনাকে ধারণ করে প্রমান করতে হবে “জ্ঞানই মুক্তি, আগামীর ভিত্তি”।
লেখক
অধ্যাপক ড. মো. নাসিরউদ্দিন মিতুল
সাবেক ডিন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ
ইমেইল: mitulnasiruddin@gmail.com
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
