এইমাত্র পাওয়া

পারিবারিক শিক্ষা: দাম বনাম মূল্য

।। শময়িতা জাহিদ মিতিন।।
প্রচলিত আইনে যা সাজা হবে আমি মেনে নেবো। আমি চাই আমার ছেলের বিচার হোক। একজন বাবার এই কথাটা বলতে কতো কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক, আসুন ভাবি কিছুক্ষণ। ভাবা হলে এবার সামনে যাই চলুন। পৃথিবীর প্রায় সব বাবাই চান যে তার সন্তানকে সেরা টা তিনি দেবেন, সব থেকে ভালো টা করবেন।

নিজের পেছনে বছরের পর বছর একটা এক্সট্রা টাকা না খরচ করে, তিলে তিলে সন্তান বা সন্তানদের জন্য খেটে যান। বাবাদের নিয়ে এমন অনেক গল্প লেখা হয়ে গেছে, সেসব নিয়ে আর না বলি। ওপারেরটা না বলে এপার এরটা বলি আজ। দাম এবং মূল্য, আপাত দৃষ্টিতে এক মনে হলেও আসলে দুইটার তফাৎ অনেক। আমার সহজ বুদ্ধিতে আমি যা বুঝি তা হলো একশ টাকা দিয়ে কিছু কেনা যায়, এটা দাম, আর এইযে একশ টাকা টা, এটার জন্য যে শ্রম টা দিতে হয় সেটা হলো মূল্য।

আপনার সন্তানকে যদি টাকার মূল্য না বোঝাতে পারেন, তাহলে সমূহ সম্ভাবনা থেকে যাবে যে আপনার সন্তান শুধু দামটা জেনে বড় হবে, মূল্য না। আর এজন্য আপনি যাই করেন না কেন তার জন্য, সে সেটা বিবেচনা করবে দাম দিয়ে। ধরুন, আপনি একটা দশ টাকার পেন কিনে আনলেন, যদি দাম কেন্দ্রিক চিন্তা ভাবনা হয়, তাহলে আপনার সন্তান ভাববে, এর থেকে ভালো কিছুও কেনা যেত! যদি মূল্য বোঝে, তাহলে বুঝবে বাবা যাই করছে, সেটা করার জন্যে ও বাবাকে কষ্ট করতে হয়েছে, টাকাটা হাওয়া থেকে আসেনি।

যারা শুধু দাম বোঝে, তাদের চাহিদা আপনি কোনদিন পূরণ করে সন্তুষ্ট করতে পারবেন না, যারা ভ্যালু বা মূল্য টা বোঝে তারা অল্পে তুষ্ট। এখন আসি মোদ্দা কথা তে, আপনি যতো টাকাই ইনকাম করুন না কেন, সবসময় মনে রাখবেন যে আপনার সন্তান যেন এটা জানে বা বোঝে যে টাকা টা ঘরে আনতে আপনার কষ্ট করতে হয়। আমি বলছিনা আপনি সন্তানের চাহিদা পূরণ করবেন না, বা ভালো কিছু কিনে দেবেন না সামর্থ্য থাকার পরও, আমি শুধু বলছি এই যে আপনি কিনে দিচ্ছেন এটার জন্য আপনার একটা সামর্থ্য অর্জন করতে হয়েছে , এবং সেটা বজায় রাখার জন্য আপনাকে নিয়মিত পরিশ্রম করতে হয়।

আপনার সন্তান যদি এতো টুকু বোঝে, নিজেকে স্বার্থক বাবা মনে করতে পারেন। নয়তো আপনি রক্ত পানি করে করেই যাবেন, সেই টাকা হাতে পেয়ে সেটার ভ্যালু না বুঝে বেপরোয়া হয়ে এভাবে আপনার সন্তান আরো সমূহ
চাহিদা পূরণ এর জন্য এরকম ভুল পথে যাবে।

সন্তান জন্ম দান একটা শারীরিক প্রক্রিয়া হলেও এবং সেটা শুধু আপনার বা আপনার সঙ্গীর পার্সোনাল ইচ্ছা বা দায়িত্ব হলেও আপনাকে মাথায় রাখতে হবে যে ভবিষ্যতে এই সন্তান সমাজ এবং দেশের মতো যে কোন প্ল্যাটফর্ম এ একজন একটিভ এজেন্ট হিসেবে থাকবে। তাই আপনার ইচ্ছা তে আপনি জন্ম দিলেন, কোন দায়বদ্ধতা ছাড়া যাচ্ছে তাই ভাবে বড় করে জাস্ট ছেড়ে দিলেন  যা বাবা এবার করে খাঁ বলে তাহলে হবে না। আপনার সন্তান কারো বন্ধু হবে, কারো সহপাঠী হবে, কারো সিনিয়র হবে, কারো জুনিয়র হবে এবং এরকম বহু সম্পর্ক যে পুরো লাইফ জুড়ে তাকে মেইন্টেইন করতে হবে।

আপনি পরিবারে কি শিক্ষা দিয়েছেন, সেটা পুঁজি করে বাকি সবার লাইফে সে এফেক্ট করবে। ছোট একটা উদাহরণ দেই, ধরুন আপনি আপনার বাচ্চাকে শেখালেন না যে কারো গায়ে থুথু ফেলতে হয় না, (যদি ও সবাই শুধু পরিবার থেকে না, বরং পরিবেশ, স্কুল এবং আরো এরকম অনেক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে জ্ঞান নেয়, কিন্তু যেহেতু পরিবার প্রাথমিক এজন্য আমি পরিবার টেনে বলছি), তো এখন সে স্কুলে গিয়ে অন্য একজনের গায়ে থুথু ফেলে দিলো, আপনার না দেয়া শিক্ষা বা তার না পাওয়া শিক্ষার জন্য সমাজের অন্য একজন এজেন্ট কে এফেক্টেড হতে হলো। ব্যাপারটা এরকম। আপনি তাকে মূল্য বোঝালেন না, সে বুঝলো না।

ভুল পথে গিয়ে তার ভুল কিছু করতে একবারও মনে হবে না যে আমি যে জায়গায় আছি, সে জায়গায় আমাকে আনতে আমার বাবার অনেক শ্রম আছে, আমার মায়ের অনেক শ্রম আছে, একজন সোশাল এজেন্ট হিসেবে আমার কিছু দায়িত্ব বোধ আছে। এই যে ছেলেটাকে মারছি, চাইলেই একে মেরে ফেলতে পারি না, বা যদি মেরে ফেলি আমার বাবা এবং মাকে কিসের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।

পুরো লেখার মূল বক্তব্য এটাই। আপনার বাচ্চার যদি একটা খারাপ কাজ করতে যাবার আগে আপনার মুখটা না ভাসে, তাহলে আপনি বাবা বা মা হিসেবে ব্যর্থ হবেন। এবং আপনার ব্যর্থতার ফল শুধু আপনার একার না, অন্য কোন পরিবার বা গোটা সমাজ বা দেশ কে পরিশোধ করতে হবে। যেমন বাকি সব খুনীর দায় এর জন্য সব থেকে কঠিন মূল্য আবরার ফাহাদের পরিবারকে দিতে হচ্ছে।

তাই, সন্তান কে দাম না, মূল্য শেখান। আপনি কত কষ্ট করেন, সেটা জানান। আশা করি নেক্সট টাইম কোন অপরাধ করার আগে একবার হলেও তার মনে হবে আপনার বা আপনাদের কথা।আপনাদের ও বুকে পাথর রেখে সন্তানের বিচার চাইতে হবে না। পৃথিবীর সব বাবা মা তার সন্তান কে নিয়ে সুখী হোক।

লেখক-লেকচারার, ডিপার্টমেন্ট অব কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.