নিউজ ডেস্ক।।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার রাজবাড়ী কলেজটিতে জাল সনদ-কাগজপত্র, সই জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৩ শিক্ষককে। এটি হয়েছে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, বোর্ডে কর্মরত কলেজ পরিদর্শক, কলেজটির পরিচালনা পর্ষদ, প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ও অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন শিক্ষকের যোগসাজশে। এ তথ্য উঠে এসেছে গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদনে। এর সঙ্গে জড়িত সংঘবদ্ধ চক্রের সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের ক্ষমতা ও ভূমিকার কারণেই দিনের পর দিন প্রতিষ্ঠানটিতে ‘লুটপাট’ চলছে। এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘শুধু এই প্রতিষ্ঠানে নয়, দেশের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিত্র এমনই।’ পর্ষদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা না হলে এ অবস্থা চলতেই থাকবে বলেও মন্তব্য তাদের। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদকে শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ক্ষমতা অর্পণ করায় পর্ষদের সদস্যরা সংঘবদ্ধ হয়ে নিয়োগ বাণিজ্য করে থাকে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান রসাতলে যাচ্ছে বলেও বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিনের এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর মাঝামাঝি সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদের জন্য ২০০৯ সালে প্রণয়ন করা প্রবিধানমালা সংশোধনের প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায় শিক্ষা বোর্ডগুলো।
সেখানে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের ক্ষমতা কমিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়। তাতে বলা হয়, ইচ্ছে করলেই ঠুনকো অজুহাতে অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষকসহ কোনো শিক্ষককে শাস্তি দেওয়া যাবে না। কাউকে ৬০ দিনের বেশি সাময়িক বরখাস্ত করে রাখলে পুরো বেতন-ভাতা দিতে হবে। আর অস্থায়ী পর্ষদে কোনো ব্যক্তি একবারের বেশি থাকতে পারবেন না। পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করতে পারবে শিক্ষা বোর্ড। লুকোচুরি করে পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন করা যাবে না। নির্বাচনের বিষয়ে নোটিস ছাড়াও জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে হবে। প্রবিধানমালা সংশোধন করে এমন নতুন কিছু নিয়মকানুন যুক্ত করার বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হলেও এখনো তা মন্ত্রণালয়েই আটকে আছে।
জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, ‘আমরা প্রস্তাব করেছি মন্ত্রণালয়কে। বিষয়টি এখনো সেখানেই আছে। মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। খসড়া চূড়ান্ত হলে প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হবে।’ প্রবিধানমালা সংশোধন প্রয়োজন কেনÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রবিধানমালা ২০০৯ সালে করা। সেটি চর্চা করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন সমস্যা হচ্ছে। আবার আদালতেরও কিছু নির্দেশনা রয়েছে। এ জন্য নতুন কিছু বিষয় যুক্ত করে সেটি পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।’ গত বছরের আগস্টে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালককে চিঠি দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার রাজবাড়ী কলেজটিতে ৩ জন শিক্ষক জাল সনদে নিয়োগের অভিযোগটি তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে তদন্তভার দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর একটি প্রতিবেদন জমা দেয় সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলেজটিতে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ একটি চক্র বিভিন্ন অনিয়ম করে আসছে। এই চক্রে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের মদদ রয়েছে। জাল সনদ ও সই জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক খলিলুর রহমান, আসাদুজ্জামান আল ফারুক ও ইসহাক আলী স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী। এই অবৈধ নিয়োগকে বৈধকরণে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মো. মকবুল হোসেন নতুন গভর্নিং বডি গঠনে সহযোগিতা করেন। চেয়ারম্যান নিজেও পারিবারিকভাবে বিএনপির মতাদর্শে বিশ্বাসী। তিনি তার আপন ফুফাতো ভাই মেসবাউল হককে কলেজটির সভাপতি পদে অনুমোদন দিয়ে ১০ সদস্যের ওই কমিটি গঠনে সহযোগিতা করেন। উপজেলা বিএনপির সক্রিয় কর্মী চেয়ারম্যানের অন্য এক ভাই মনিরুল ইসলাম ৫ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করে সব ঠিক করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহ-সম্পাদক রফিকুল আলম জোয়ার্দার সৈকত ৫ লাখ টাকা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তের বিষয়টি ম্যানেজ করার দায়িত্ব নেন।
এরপর থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলেও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। কলেজটিতে অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া তিন শিক্ষক, তাদের নিয়োগ দেওয়া পর্ষদের সদস্যরা, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, পরিদর্শকসহ এ অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। আর ইতিপূর্বে ব্যবস্থা না নিতে পারার ব্যর্থতার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাউশি ও রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড কর্র্তৃপক্ষের কাছে জবাব চাওয়ার ব্যাপারেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এমন অবৈধ কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করার বিষয়ে রাজশাহী বোর্ডের চেয়ারম্যান মকবুল হোসেনকে ফোন করা হলে তিনি গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ‘কত শত অভিযোগই মানুষের বিরুদ্ধে ওঠে। সব তো আর সত্য হয় না।’ গোয়েন্দারা তদন্ত করে যে প্রতিবেদন দিয়েছেন সেটাও সত্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘কলেজে অবৈধ নিয়োগ নাকি বৈধ, কারা এর সঙ্গে জড়িত তা শিক্ষা বোর্ডের দেখার বিষয় নয়। এসব দেখার এখতিয়ার মাউশি মহাপরিচালকের।’সুত্র রূপান্তর
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
