আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি :
ভ্রমণ পিপাসু মানুষেরা যারা নেত্রকোনার বিরিশিরি গিয়েছেন তারা দেখেছেন চীনা মাটির পাহাড়ের দিকে যাওয়ার পথে বহেরাতলী গ্রামে একটু স্মৃতিফলক রয়েছে। তীর-ধনুকের আদলে তৈরি সেই স্মৃতি ফলকে লেখা আছে- ‘আমি নারী, আমি জানি নারীর সম্ভ্রমের মান। নারীর মান আমি রক্ষা করবো, নয় মরবো। তোরা থাক তোদের নীতি নিয়ে বসে।’
এই বাণী হাজং মাতা রাসমনি হাজংয়ের। টঙ্ক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক রাসমনি হাজং বৃটিশ সেনাদের হাত থেকে আন্দোলনের কর্মী কুমুদিনী হাজংকে রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন। সেই লড়াই শুরুর আগে হাতে খোলা দা’নিয়ে কুমুদিনী হাজংকে বাঁচাতে গিয়ে এই কথা বলেছিলেন। ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি এমনই এক দিনে ইতিহাসে রচিত রাসমনি হাজংদের সেই লড়াই সংগ্রাম আর ত্যাগের রক্তিম অধ্যায়।
সেই সময়টি বৃটিশ শাসন আমলের একদম শেষ অধ্যায়। তখন যে কয়টি আন্দোলন তীব্র নাড়া দিয়েছিলো সমগ্র ভারতবর্ষকে তার ভেতর বৃহত্তর ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা অঞ্চলে গড়ে ওঠা টঙ্ক আন্দোলন অন্যতম। ১৯৪৫ সালের শেষ দিকে এবং টঙ্ক আন্দোলন জোড়দার হতে শুরু করে। খাজনার নামে কৃষকদের সর্বস্ব লুটে নেয়া বৃটিশ সরকার ও তাদের তাবেদার জমিদারদের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছিলো টঙ্ক আন্দোলন। তখন টঙ্ক প্রথার মাধ্যমে ধান হোক না হোক জমির মাপ অনুযায়ী খাজনা দিতে কৃষকদের বাধ্য করা হতো। কৃষকরা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলো। তারা ধান দেয়া বন্ধ করে দিলো, এতে শুরু হয় বৃটিশ সেনাদের তান্ডব।
তখন আন্দোলনকারীদের ধরতে গ্রামে গ্রামে হানা দিতো বৃটিশ পুলিশরা। এমনই এক অভিযানে ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি দেশের সীমান্তবর্তী জেলা নেত্রকোনার সুসং দূর্গাপুরের হানা দেয় ব্রিটিশ পুলিশ। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হাজির হয় স্নিগ্ধ সবুজ গ্রাম বহেরাতলীতে। গ্রামটি মূলত হাজং ও গারো অধ্যুষিত।
এই ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে হাজং মাতা রাসমনি কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ও লেখক মতিলাল হাজং বাংলা’কে জানায়, পুলিশের ভয়ে তখন পুরুষরা গ্রাম শূন্য। দিনের বেলা সবাই গা ঢাকা দিয়ে থাকেন। সেদিন অনেক নারীও ছিলেন এলাকা ছাড়া। আন্দোলনের সংগঠক লঙ্কেশ্বর হাজংয়ের স্ত্রী কুমুদিনী হাজং তার বাড়িতে বসে কাজ সেরে মিটিংয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখন সময় সকাল ১০টা। সে সময় কুমুদিনী হাজংয়ের স্বামী আন্দোলনের সংগঠক লঙ্কেশ্বর হাজংকে ধরতে তার বাড়ি যায় পুলিশ। তাকে না পেয়ে তার স্ত্রী কিষানী কুমুদিনী হাজংকে টেনে হিঁচরে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে থাকে। তারা কুমুদিনী হাজংয়ের কাছে জানতে চেয়েছিলো আন্দোলনকারীদের খোঁজ। কিন্তু কুমুদিনী হাজং তাদের কাছে আন্দোলনকারীদের খবর না দেয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছিলো। সেই সময় তাদের অত্যাচার নির্যাতনে কুমুদিনী হাজং চিৎকার করতে থাকে। এই আর্তনাদ পৌঁছে যায় আশে পাশের মানুষের কানে। কুমুদিনী হাজংকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ এমন খবর পৌঁছায় আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী রাসমনি হাজংয়ের কাছে।
পরিবারের সদস্যদের সাথে কুমুদিনী হাজং। ছবি : বাংলা
রাসমনি তখন তার সহযোদ্ধাদের নিয়ে সভা করছিলেন। কুমুদিনী হাজংকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এ কথা জানতে পেরে রাসমনি হাজং সবাইকে বললেন তাহলে আজকের মতো সভা বাতিল। চলেন আমরা কুমুদিনী হাজংকে উদ্ধার করি। তখন পুরুষরা একটু থেমে গেলেন।
মতি লাল হাজং বলেন, ‘তখন একজন বললো এই দিবালোকে রাইফেলের সামনে আমরা চেওয়া, বল্লম লাঠি-সোটা নিয়ে আমরা যুদ্ধ করতে যাবো, আমরা আটকাইতে পারবো? সমানে গুলি কইরা ফালাইয়া দিবে। তখন রাসমনি হাজং বললেন তোমরা কি বলতেছো, আমার একটা নারীর মান সন্মান ইজ্জত চইল্যা যাইতেছে গা। আর তাকে রক্ষা করার জন্য আমি অনুরোধ করতেছি আর আপনারা বলেন এখন যাওয়া সম্ভব না? ঠিকাছে আপনারা থাকেন আমি যাই। বলে তিনি ১২ জন সঙ্গীকে নিয়ে রওনা দেন।’
রাসমনি হাজং যখন রওনা দিলেন তখন সুরেন্দ্র হাজং দলের অন্যদের বললেন সে যখন এগিয়ে গেছে তখন আর বসে থাকা চলে না। সবাই চলো। তখন অন্যরাও লাঠি-বল্লম-দা তীর ধনুক নিয়ে রওনা হয়।
বহেরাতলী গ্রামে এসে দেখেন বৃটিশ পুলিশরা অত্যাচার করতে করতে যাচ্ছে কুমুদিনী হাজংকে। তখন রাসমনি হাজং চিৎকার করে বলেন, কুমুদিনী হাজংকে ছেড়ে দিতে। কিন্তু পুলিশ বন্দুক তাক করে বলেন পিছিয়ে যেতে। কিন্তু রাসমনি হাজং দা নিয়েই আগাতে থাকে।
বাংলা’র কাছে দেয়া এক স্বাক্ষাতকারে সেই মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করেন টঙ্ক আন্দোলনের একমাত্র জীবন্ত স্বাক্ষী সেই কিংবদন্তী মুখ কুমুদিনী হাজং। বয়সের ভারে সেই সব দিনের স্মৃতি ম্লান হয়ে গেলেও মাঝে মাঝে তিনি একটু একটু করে বলতে শুরু করেন সেই ঘটনা। দীর্ঘ স্বাক্ষাতের এক পর্যায়ে হঠাৎ করেই নিজ মুখে সেই স্মৃতি তুলে ধরে কুমুদিনী হাজং বলেন, ‘তখন ওরা আউগ্যাইতাছে (রাসমনিহাজংরা) আর তারা পিছাইতাছে (বৃটিশ পুলিশ)। এক পর্যায়ে গুলি চলে… আমি তখন জ্ঞান হারাইছি। আর কিচ্ছু মনে নাই।’
মতিলাল হাজং ইতিহাস থেকে সেই ঘটনা তুলে ধরে বলেন, ‘যখন বৃটিশ পুলিশ ছাড়লো না কুমুদিনীকে তখন রাসমনি দা দিয়ে এক পুলিশকে কুপিয়ে হত্যা করে। এসময় রাসমনিকে গুলি করে। তিনি সাথে সাথে মারা যান। তখন সুরেন্দ্র হাজং সেই পুলিশকে লক্ষ্য করে বল্লম ছুড়ে হত্যা করে। এরপর সুরেন্দ্র হাজংকে গুলি করে মারে পুলিশ।’
শুরু হয় হাজংদের সাথে পুলিশের লড়াই। আড়াই ঘণ্টা ব্যাপী সংঘর্ষে পুলিশ পিছু হটে নদীর তীর ধরে পালিয়ে যায়। এসময় কুমুদিনী হাজংকে উদ্ধার করে সহযোদ্ধারা গভীর জঙ্গলে আশ্রয় নেয়।
এই আন্দোলনের প্রথম শহীদ হাজং মাতা রাসমনি হাজং। হাজংরা আজো গভীর শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে বিপ্লবী রাসমনি হাজংকে। বিধবা নিঃসন্তান রাসমনি হাজং ছিলেন মানুষের সেবায় নিবেদিত। যে কোনো প্রয়োজনে তিনি ছুটে যেতেন। একদিকে নারীদের বিপ্লবী দীক্ষায় দীক্ষিত করতে বিভিন্ন কৌশল সেখাতেন, অধিকারের প্রশ্নে সরব থেকে সংগঠিত করতেন অন্যদিকে গ্রামের দরিদ্র মানুষের জন্য শিক্ষা চিকিৎসারও ব্যবস্থা করতেন নিজের উদ্যেগেই। আর এসব কারণেই তাকে হাজংরা মা বলে ডাকতো। তিনি হাজং মাতার সন্মানে ভূষিত হয়েছেন।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
