এইমাত্র পাওয়া

কোন পথে বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা?

বিন-ই-আমিন।।

কারিগরি শিক্ষা ও বিদেশে অদক্ষ শ্রমিকের অবস্থান :কারিগরি শিক্ষা যেকোনো দেশের উন্নতির প্রধান হাতিয়ার । পৃথিবীর শিল্পোন্নত দেশগুলো কারিগরি শিক্ষায় এগিয়ে। যে দেশ যতো উন্নত,তাদের কারিগরি শিক্ষার হারও অনেক বেশি। কারিগরিতে দক্ষ জনশক্তি ও যে কোন দেশের সম্পদ। জনবহুল বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি লোক কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে কাজ করছে। যাদের অধিকাংশই শ্রমিক। তাদের কষ্টার্জিত রেমিটেন্স দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছে ঠিকই তাদের বেতন অনেক কম। তাদের পাঠানো রেমিটেন্স আরো বেশি হতো যদি তারা কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ হয়ে বিদেশ যেতে পারত। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কারিগরি দক্ষ জনবলের চাহিদা বেশি। কিন্তু বিদেশে আমাদের জনশক্তি দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞান সমৃদ্ধ নয়। এমন বাস্তবতা চিন্তা করে বাংলাদেশ অনেক পরে হলেও কারিগরি শিক্ষার দিকে নজর দিয়েছে। কিন্তু কারিগরি শিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছাতে পারেনি। সরকারের আন্তরিকতা ও অংশীজনের সমন্বয়হীনতার অভাবে কারিগরি শিক্ষার প্রসারে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না।

কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আসন বিন্যাস:-১৯৬০ সনে বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে ১১৯ টি সরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সারাদেশে ৬৪ টি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ, ৪৯ টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, চারটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, একটি সরকারি টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং কলেজ(TTTC) ও একটি ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট(VTTI)। ১৯৬৭ সালে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড(BTEB)যাত্রা হয়। শর্ট কোর্স, সার্টিফিকেট, ডিপ্লোমা এবং ডিগ্রী পর্যায়ে এই চারটি ধাপে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ১১০ টি বিষয়ে তিন থেকে ছয় মাসের শর্ট কোর্স দেশের ৩২২৩ টি প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন সার্টিফিকেট পর্যায়ের এসএসসি ভোকেশনাল, দাখিল ভোকেশনাল, এইচএসসি (ভোকেশনাল) ও এইচএসসি (ব্যবসায় ব্যবস্থাপনায়) পরিচালিত হয়ে আসছে। ৬৪ টি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজসহ ১৫১ টি সরকারি ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান, ১০৪৫টি বেসরকারি এমপিও ভুক্ত প্রতিষ্ঠান, ৩০৫টি দাখিল ভোকেশনাল শিক্ষাক্রমে ৩১টি ট্রেড বিষয়ের উপর পরিচালিত হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষার প্রসারে সরকার ৪২৯ টি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপনের কাজ চলমান। ২০২১ সাল থেকে ৩৫টি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত জেএসসি ভোকেশনাল কোর্স চালিয়ে আসছে। ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতি উপজেলায় একটি করে সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ চালু হওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার।

কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী ভর্তির বর্তমান পরিস্থিতি :-২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় শতকরা ৩০ ভাগ এনরোলমেন্ট লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তব ক্ষেত্রে ২০% পুরন করাই কষ্টসাধ্য। ২০২৬ সনেও বাস্তবে ২০% লক্ষমাত্রা পুরণ হয়নি। বিদ্যমান কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাঙ্খিত শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাচ্ছে না। এসএসসি ভোকেশনাল কারিকুলামে প্রতি উপজেলায় জাতীয়করণ হওয়া প্রতিষ্ঠানে নবম ও দশম শ্রেণিতে ভোকেশনাল কোর্স চলমান। পাশাপাশি উপজেলা সদরের গার্লস স্কুলেও ভোকেশনাল শাখার কার্যক্রম চলে আসছে। এমতাবস্থায় একটি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ চালু হলে আগের প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার্থী ভর্তিতে সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। নবম শ্রেণির সর্বনিম্ন আসন পুরণ করতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

এসএসসি ভোকেশনাল শিক্ষাক্রমের চেয়ে ডিপ্লোমা পর্যায়ে ভর্তি আরো বেশি হতাশাজনক। সরকারি ও বেসরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অবকাঠামো, ব্যবহারিক ক্লাস,শিক্ষক প্রশিক্ষণ সহ সব বিষয়ে বিরাট তফাৎ লক্ষ্য করা যায়। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানও কাঙ্খিত আউটপুট দিতে পারছেনা। ভর্তিতেও সকল আসন পুরন হচ্ছে না। ২০২৫ সনের বিভিন্ন পর্ব সমাপনী পরীক্ষায় বিভিন্ন টেকনোলজিতে আশানুরূপ ফলাফল অর্জিত হয়নি। নামকরা পলিটেকনিকগুলোয় পাসের হার ২০-৩০% এর বেশি নয়। এসএসসি পাসের পর ভালো মানের শিক্ষার্থী ভর্তি হলে এ সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ভালো শিক্ষার্থী ভর্তি করতে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আন্তরিকতা জরুরি।

ব্যবহারিক ক্লাসের প্রতি অবহেলা:-সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটেও দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল এবং শিক্ষকের অভাব আছে। শিক্ষক সংকটও আছে। সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটেও ব্যবহারিক ক্লাস ঠিকমতো হয়না। শ্রেণি কার্যক্রমেও আছে অনিয়ম ও অবহেলা। অনেক শিক্ষক ব্যবহারিক ক্লাস নেয়না। শিক্ষার্থিদের অভিযোগ স্যারেরা প্রাকটিক্যাল জানেনা। নতুন শিক্ষকদের অনেকেই প্রাইভেট পড়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন শিক্ষার্থীদের। শিক্ষকদের হাতের নম্বর পেতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে শিক্ষার্থীরা। যারা শিক্ষকদের মন জোগাতে ব্যর্থ তাদের ফলাফল আশানুরূপ হয়না। বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কথা বাদই দিলাম । সেখানেও ভর্তিতে আসন খালি থাকে অনেক। বয়সের সীমাবদ্ধতা না থাকায় সচেতন অভিভাবকদের সন্তানরা কারিগরি শাখার ডিপ্লোমা কোর্সে পড়তে চায়না। কারণ একজন শিক্ষার্থীর সহপাঠী বা বন্ধু সম বয়সী না হলে তার প্রভাব পড়ে সব জায়গায়। তাছাড়া ডিপ্লোমা পাসের পর উচ্চ শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেকে ইচ্ছে থাকার পরও কারিগরি শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চাকরির বাজারেও প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেনা। সেখানে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের দৌরাত্ম। ফলে ডিপ্লোমা পাসের সনদও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দেশ স্বাধীনের পর থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারগণ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি / বেসরকারি / স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় উচ্চ মাধ্যমিক পাসের বিপরীতে ডিপ্লোমা পাস চাওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে কোনো নীতিমালার প্রয়োগ না থাকায় ডিপ্লোমাদের সম্মান হানী হচ্ছে। ডিপ্লোমা ও বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে চলে আসা দীর্ঘদিনের সমস্যার সঠিক সমাধান না হওয়ায় সুযোগ বুঝে বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অবমাননাকর কাজে জড়িয়ে পড়ছে।

তাদের টেকনিশিয়ান বানানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে একটি মহল। তাছাড়া বিগত সময়ে বিভিন্ন সরকারের টালমাটাল অবস্থায় বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারগণ ডিপ্লোমাদের গ্রেড এবং অবস্থান নিয়ে নানামুখী ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছে। এসবের সুষ্ঠু সমাধান ও ডিপ্লোমাদের যথাযথ মর্যাদায় সরকার আন্তরিক না হলে সচেতন অভিভাবকদের সন্তানরা এখানে পড়তে আগ্রহী হবেনা।

কারিগরি শিক্ষার প্রসারে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে:-১) সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে কারিগরি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা( বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং) কোর্স চালু করতে হবে।
২) কারিগরি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোতে আসন সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং পলিটেকনিক ডিপ্লোমাদের ভর্তিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৩) জরুরি ভিত্তিতে ভোকেশনাল ও পলিটেকনিক সহ ডিপ্লোমা পর্যায়ের সকল প্রতিষ্ঠানে যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।
৪) কারিগরি শাখার সকল শিক্ষকদের বিশেষত (টেকনিক্যাল) যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
৫) শিল্পকারখানার সাথে তাল মিলিয়ে যুগের চাহিদানুযায়ী সিলেবাস প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
৬) কারিগরি শিক্ষার প্রসারে মাধ্যমিক পর্যায়ের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাহিদা সম্পন্ন কমপক্ষে ২ টি কারিগরি বিষয় চালু করতে হবে। একজন কারিগরি শিক্ষক বা ট্রেড ইন্সট্রাক্টরকে কারিগরি শাখার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।
৭) বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত ব্যবহারিক ক্লাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
৮) সরকারি ও বেসরকারি সকল গণমাধ্যমে কারিগরি শিক্ষার প্রচারণা চালাতে হবে।
৯) বিদেশের চাহিদানুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন কোর্স / বিষয় চালু করতে হবে।
১০) কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও অধিদপ্তরে সকল কর্মকর্তা- কর্মচারী কারিগরি বান্ধব ও কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন লোকদের দায়িত্ব দিতে হবে। কোনো নন টেকনিক্যাল লোক কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও অধিদপ্তরে নীতিনির্ধারণীতে রাখা যাবেনা।
১১) মানসম্মত, প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। তদারকি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তদারকি বাড়াতে হবে।

পরিশেষে, কারিগরি শিক্ষায় উন্নত দেশগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে ও তাদের শিক্ষা কারিকুলাম অনুসরণ করে আমরা একটি উন্নত দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই কারিগরি শিক্ষার প্রতি আন্তরিকতা দেখিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও কারিগরি শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে তিনি যথেষ্ট আন্তরিক। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীরও কারিগরি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জণ করেছেন। সব কিছুর সমন্বয়ে ও সরকারের আন্তরিকতায় বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষায় কাংখিত লক্ষ্য অর্জণ করে দেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত ও স্নার্ট বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে এ প্রত্যাশা সকলের।

বিন-ই-আমিন
শিক্ষক, নলছিটি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ
সভাপতি মন্ডলির সদস্য
শিক্ষাবার্তা ও সভাপতি, মাধ্যমিক শিক্ষক ফোরাম নলছিটি, ঝালকাঠি।
মোবাইল :০১৭১২৬৩৭৭২২
মেইল:bene.amin@yahoo.com

শিক্ষাবার্তা /এ/১৫ /০৫/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.