এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষকদের হাতে থেকে বেত কেড়ে নেওয়ার মূল্য দিচ্ছে সমাজ

। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।

একসময় গ্রামের একটি স্কুলে পড়ত রফিক নামের এক ছাত্র। একদিন সে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলতে চলে যায়। বিষয়টি জানতে পেরে শিক্ষক তাকে ডেকে পাঠান। শিক্ষক রাগ করেননি, কিন্তু হাতে থাকা বেতটি টেবিলে ঠুকঠুক করতে করতে বললেন—“পড়াশোনা না করলে জীবনে কিছুই হবে না।” রফিক লজ্জা পেল, ভয়ও পেল। কয়েকটি বেতের আঘাতের চেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছিল শিক্ষকের চোখের কঠোরতায়। সেই ঘটনার পর সে আর কখনো ক্লাস ফাঁকি দেয়নি। বরং পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে একদিন ভালো ফলাফল করে শিক্ষক-অভিভাবকের মুখ উজ্জ্বল করেছিল।

এই গল্পটি শুধু রফিকের নয়; আশির দশক কিংবা নব্বইয়ের দশকের অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনের গল্প। সেই সময় শিক্ষকরা শুধু পাঠদান করতেন না, তারা ছিলেন শাসক, পথপ্রদর্শক এবং নৈতিকতার শিক্ষক। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের দেখলে ভয় পেত—তবে সেই ভয় ছিল সম্মানের, শ্রদ্ধার। শিক্ষককে দেখে পথ ছেড়ে দাঁড়ানো, সালাম দেওয়া, বিনয়ী আচরণ করা—এসব ছিল শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক অভ্যাস।

কিন্তু সময় বদলেছে। আজকের অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষকদের সেইভাবে সম্মান করে না। অনেক জায়গায় শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর দূরত্ব কমে গিয়ে শৃঙ্খলার জায়গায় এসেছে এক ধরনের বেপরোয়া আচরণ। অনেক শিক্ষার্থী প্রকাশ্যে ধূমপান করছে, শিক্ষকের কথা অমান্য করছে, এমনকি কখনো কখনো শিক্ষকদের সঙ্গেই দুর্ব্যবহার করছে। প্রশ্ন উঠেছে—কেন এই পরিবর্তন?

অনেকে মনে করেন, এর অন্যতম কারণ হলো শিক্ষকদের হাত থেকে শাসনের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া। একসময় শিক্ষকরা প্রয়োজনে বেত ব্যবহার করতেন। এটি সবসময় নিষ্ঠুরতার জন্য নয়; বরং শৃঙ্খলা রক্ষার একটি প্রতীক ছিল। বেত দেখলেই শিক্ষার্থীরা বুঝত—ভুল করলে শাস্তি পেতে হবে। ফলে তারা অনেক ক্ষেত্রে ভুল কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখত।

বর্তমানে শিক্ষকদের সেই ক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে। শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ হওয়ায় অনেক শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে ভয় পান। কারণ সামান্য শাসনের অভিযোগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা, অভিভাবকদের ক্ষোভ কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হয়। ফলে অনেক শিক্ষকই এখন শাসনের বদলে নীরবতা বেছে নিচ্ছেন।

এর সুযোগ নিচ্ছে কিছু বেপরোয়া শিক্ষার্থী। তারা বুঝে গেছে—শিক্ষকরা কঠোর শাস্তি দিতে পারবেন না। তাই অনেক ক্ষেত্রে তারা শিক্ষকের কথাকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজের ইচ্ছামতো চলতে শুরু করেছে। এতে করে শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলার সংকট তৈরি হচ্ছে।

তবে এই সমস্যার জন্য শুধু শিক্ষকদের হাতে বেত না থাকার বিষয়টিকে দায়ী করলেই পুরো সত্য বলা হবে না। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে পরিবার ও সমাজের পরিবর্তনও। আগে পরিবারে বাবা-মা সন্তানদের কঠোরভাবে শাসন করতেন। সন্তানরা বাবা-মায়ের সামনে অশ্রদ্ধা করার কথা চিন্তাও করত না। এখন অনেক পরিবারে সেই শাসনও কমে গেছে। অনেক অভিভাবক সন্তানকে বেশি স্বাধীনতা দিতে গিয়ে শাসনের জায়গাটি দুর্বল করে ফেলছেন।

ফলে শিক্ষার্থী যখন পরিবারে শাসন পায় না এবং বিদ্যালয়েও কঠোরতা দেখে না, তখন সে সহজেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা অনেক সময় অসহায় বোধ করেন। তারা জানেন, শৃঙ্খলা ছাড়া শিক্ষা সম্ভব নয়; কিন্তু শাসনের সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, আধুনিক শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন—শারীরিক শাস্তি শিক্ষার আদর্শ পদ্ধতি নয়। তারা বলেন, বেত দিয়ে ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে শৃঙ্খলা আনা গেলেও এতে শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই অনেক দেশে শারীরিক শাস্তি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা শেখানো হয় কাউন্সেলিং, নৈতিক শিক্ষা এবং ইতিবাচক অনুপ্রেরণার মাধ্যমে।

এখানেই প্রশ্ন আসে—তাহলে কি শিক্ষকদের হাতে বেত ফিরিয়ে দেওয়া উচিত? নাকি অন্য কোনো পথ খুঁজতে হবে?

বাস্তবতা হলো, বেত নিজেই সমস্যার সমাধান নয়; বরং এটি ছিল শৃঙ্খলার একটি প্রতীক। অতীতে শিক্ষকের প্রতি সমাজের সম্মান ছিল, অভিভাবকের সমর্থন ছিল, আর শিক্ষার্থীদের মনে ছিল ভয় ও শ্রদ্ধার মিশ্র অনুভূতি। সেই পরিবেশের কারণে শাসন কার্যকর হতো।

আজকের দিনে যদি শুধু বেত ফিরিয়ে দেওয়া হয় কিন্তু শিক্ষকের মর্যাদা না বাড়ে, পরিবারে শাসন না থাকে এবং সমাজে নৈতিকতা দুর্বল থাকে—তাহলে তাতে খুব বেশি পরিবর্তন আসবে না। বরং প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা।

প্রথমত, শিক্ষকদের মর্যাদা ও কর্তৃত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে। শিক্ষকের সিদ্ধান্তকে সম্মান করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কোনো অভিযোগ থাকলে তা যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে, কিন্তু শিক্ষকদের অযথা অপমান বা হেনস্তা করা যাবে না।

দ্বিতীয়ত, পরিবারকে আবারও সন্তান লালন-পালনের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। সন্তানকে শুধু স্বাধীনতা দিলেই চলবে না; তাকে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার শিক্ষা দিতে হবে। বাবা-মা যদি শিক্ষকের পাশে দাঁড়ান, তাহলে শিক্ষার্থীরাও শিক্ষককে সম্মান করতে শিখবে।

তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়, চরিত্র গঠনও শিক্ষার বড় উদ্দেশ্য। স্কুলে নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং আচরণগত শিক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

চতুর্থত, শিক্ষকদের জন্যও প্রয়োজন প্রশিক্ষণ ও আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার। কীভাবে কঠোরতা ছাড়াই শৃঙ্খলা বজায় রাখা যায়, কীভাবে শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বুঝে তাদের পরিচালনা করা যায়—এসব বিষয়ে দক্ষতা বাড়াতে হবে।

সত্য কথা হলো, একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষার্থীদের ওপর। আর সেই শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার প্রধান দায়িত্ব শিক্ষকদের। তাই শিক্ষকদের যদি দুর্বল করে দেওয়া হয়, তাহলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে।

আমাদের মনে রাখতে হবে—শিক্ষা শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়; এটি আচরণ, মূল্যবোধ ও মানবিকতার শিক্ষা। শিক্ষকের শাসন, অভিভাবকের দিকনির্দেশনা এবং সমাজের নৈতিক পরিবেশ—এই তিনটির সমন্বয়েই একজন ভালো মানুষ তৈরি হয়।

সুতরাং প্রশ্নটি শুধু বেত ফিরিয়ে দেওয়ার নয়; বরং শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ও সম্মানের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার। যদি শিক্ষককে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়, পরিবার দায়িত্বশীল হয় এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হয়—তাহলে হয়তো একদিন আবার সেই আদবকায়দা ফিরে আসবে, যেখানে শিক্ষার্থী শিক্ষককে দেখে মাথা নত করবে, আর শিক্ষা হবে সত্যিকারের মানুষ গড়ার।

লেখক : শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/১০/০৩/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.