।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
ঈদের চাঁদ উঠেছে। গ্রামের আকাশে সাদা আলো, মসজিদের মাইকে তাকবির। স্কুলের সহকারী শিক্ষক আব্দুল মালেক সাহেব বাজারের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে ছোট্ট একটা কাগজ—তালিকা। ছেলের জন্য এক জোড়া পাঞ্জাবি, মেয়ের জন্য ফ্রক, স্ত্রীর জন্য শাড়ি। দোকানদার দাম বলতেই তিনি থমকে যান। পকেটে থাকা টাকাগুলো গুনে দেখেন—মেলে না।
তার পাশেই একই এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বন্ধু হেসে বললেন, “ভাই, এইবার তো বোনাসটা পুরো পেলাম, আলহামদুলিল্লাহ। একটু স্বস্তি হলো।”
মালেক সাহেব মুচকি হাসলেন। কিন্তু মনে মনে একটা প্রশ্ন দগদগে হয়ে উঠল—“আমি কি শিক্ষক নই? আমি কি কম পড়াই?”
এই গল্প কাল্পনিক, কিন্তু বাস্তবের প্রতিচ্ছবি। দেশের হাজারো এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীর জীবনে ঈদের আগে এমন দৃশ্য নতুন নয়। সরকারি শিক্ষকরা শতভাগ উৎসব ভাতা বা বোনাস পান, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
তাই প্রশ্ন উঠেছে—এই ঈদ থেকেই যদি শতভাগ উৎসব ভাতা কার্যকর হয়, তবে সেটি কি হবে না একটি ন্যায়সংগত ও মানবিক সিদ্ধান্ত?
বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে দুই ধারার শিক্ষকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈষম্য স্পষ্ট। সরকারি শিক্ষকরা বেতন, ভাতা, পদোন্নতি ও অন্যান্য সুবিধায় তুলনামূলক এগিয়ে। অন্যদিকে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকরা সরকারের নির্ধারিত স্কেলে বেতন পেলেও উৎসব ভাতার ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পান না।
সব শিক্ষক যদি শতভাগ উৎসব বোনাস পান, শুধু বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা বাদ থাকেন—এটি নিঃসন্দেহে অমানবিক ও বৈষম্যমূলক। কারণ, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ, ফলাফল তৈরি, শিক্ষার্থীদের নৈতিক গঠন—সবক্ষেত্রেই তারা সমান দায়িত্ব পালন করেন।
ঈদ কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক আনন্দের সময়। শিক্ষক যদি এই সময়টায় আর্থিক সংকটে থাকেন, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত কষ্ট নয়; পেশাগত মর্যাদাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে একটি এমপিওভুক্ত কলেজের অধ্যাপক ড. সৈয়দুজ্জামান বলেন, “আমরা একই পাঠ্যক্রমে পড়াই, একই বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা নেই। শিক্ষার্থীরা আমাদের ‘স্যার’ বলেই ডাকে। কিন্তু উৎসব এলে বুঝি, আমরা যেন অর্ধেক শিক্ষক। শতভাগ বোনাস পেলে অন্তত ঈদের সময় পরিবারকে একটু স্বস্তি দিতে পারতাম।”তার বক্তব্যে ক্ষোভের চেয়ে বেশি ছিল কষ্ট। তিনি আরও বলেন,“শিক্ষকতার পেশায় আমরা এসেছি আদর্শ নিয়ে। কিন্তু বারবার আর্থিক বৈষম্য আমাদের মনোবল কমিয়ে দেয়।”
বাংলাদেশ মাদ্রাসা জেনারেল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মো: হারুন অর রশীদ বলেন, “ঈদের সময় সন্তানরা চায় নতুন জামা, আত্মীয়রা আশা করে আমরা কিছু উপহার দেব। তখন হিসাব মেলাতে গিয়ে খুব অস্বস্তি লাগে। সরকারি সহকর্মীরা যখন পুরো বোনাস পান, তখন মনে হয় আমরা যেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।”এই অভিজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের প্রতিফ মনে করেন, উৎসব ভাতার প্রশ্নটি কেবল আর্থিক বিষয় নয়; এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। তার ভাষায়,
“শিক্ষা ব্যবস্থায় দ্বৈত কাঠামো থাকলেও শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা এক হওয়া উচিত। একই জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের জন্য যারা কাজ করছেন, তাদের মধ্যে সুবিধা-বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করবে।”
তিনি যুক্তি দেন, শিক্ষক যদি আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে তার মনোযোগ পুরোপুরি পাঠদানে নিবিষ্ট থাকে না। এতে শিক্ষার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আরেকজন শিক্ষা বিশ্লেষক বলেন, “শতভাগ উৎসব ভাতা দেওয়া মানে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; এটি এক ধরনের স্বীকৃতি। রাষ্ট্র বলছে—তোমার অবদান আমরা মূল্যায়ন করি।”
শিক্ষাবিদদের মতে, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের এই দাবি পূরণ হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক বার্তা যাবে।
বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণ উৎসব ভাতার দাবি জানিয়ে আসছেন। বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির মহাসচিব মো: জসিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা বারবার বলেছি—একই কাজ, কিন্তু ভিন্ন সুবিধা—এটি সংবিধানের সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই ঈদ থেকেই যদি শতভাগ উৎসব ভাতা কার্যকর হয়, তবে সেটি হবে শিক্ষকদের জন্য ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত।”
আরেক নেতা মোঃ এনামুল ইসলাম মাসুদ মন্তব্য করেন, “সরকার যখন বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করছে, তখন শিক্ষকদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে কৃপণতা মানায় না। শিক্ষক সন্তুষ্ট থাকলে শিক্ষা ব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে।”
তাদের মতে, পূর্ণ উৎসব ভাতা শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, এটি শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার প্রতিকার।
প্রশ্ন উঠতে পারে—কেন এটিকে অমানবিক বলা হচ্ছে?
কারণ, একই রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েও একদল শিক্ষক পূর্ণ সুবিধা পাবেন, আর অন্যদল পাবেন না—এটি ন্যায়বোধের পরিপন্থী। বিশেষ করে যখন তারা একই পাঠ্যক্রম, একই দায়িত্ব ও একই কর্মঘণ্টা পালন করেন।
ঈদে সন্তানদের মুখের হাসি দেখার অধিকার কি কেবল সরকারি শিক্ষকদের? বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের পরিবার কি কম গুরুত্বপূর্ণ? এই বৈষম্য শুধু অর্থের অঙ্ক নয়; এটি আত্মসম্মান ও মর্যাদার প্রশ্ন।
যদি এই ঈদ থেকেই শতভাগ উৎসব ভাতা কার্যকর হয়, তবে তার বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে— মনোবল বৃদ্ধি: শিক্ষকরা নিজেকে মূল্যায়িত মনে করবেন।
ঈদ মানে আনন্দ, মিলন, উদারতা। রাষ্ট্র যদি এই সময়টিকে উপলক্ষ করে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য শতভাগ উৎসব ভাতা ঘোষণা করে, তবে সেটি হবে একটি মানবিক ও ন্যায়সংগত পদক্ষেপ।
আব্দুল মালেক সাহেবের মতো হাজারো শিক্ষক তখন হয়তো বাজারে দাঁড়িয়ে দ্বিধায় পড়বেন না। সন্তানের হাত ধরে হাসিমুখে বলবেন, “চলো, তোমার পছন্দেরটা নাও।”
শিক্ষক সমাজের প্রতি এই ন্যায্য সম্মানই পারে শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে। কারণ, যে জাতি তার শিক্ষককে সম্মান দেয়, সেই জাতিই টেকসই অগ্রগতির পথে এগিয়ে যায়।
এই ঈদেই কি সেই শুভ সূচনা হবে? সময়ই তার উত্তর দেবে।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
