মোঃ হেদায়েত উল্যাহ সবুজ।।
গত ৫ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহ-প্রধান নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করে পরবর্তী সময়ে একটি উচ্চ পর্যায়েয় কমিটি গঠনের মাধ্যমে এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। একই সাথে একশত নম্বরের মূল্যায়ন পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য ও মেধাবীদের নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করে। এই ধারাবাহিকতায় বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৫ সালে এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ২০১৫ সাল থেকে এন্টি লেভেলে কেন্দ্রীয় নিয়োগ শুরু হয় যার ফলশ্রুতিতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা হ্রাস পেয়ে যোগ্য ও মেধাবীদের নিয়োগ নিশ্চিত হয়।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান ও সহ-প্রধান নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ছিল এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, শিক্ষা পরিবেশ ও প্রতিষ্ঠানের গুণগত মানোন্নয়নে কেন্দ্রিয়ভাবে এ ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবী ছিল। বিগত ফ্যাসিবাদী সময়ে অন্যান্য নিয়োগের ন্যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিবেচনায় মেধা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে পাশ কাটিয়ে দলীয় লোক বসানো হয়েছে। এতে যোগ্য ও মেধাবীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও শিক্ষার মান নিম্নগামী হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানে অযোগ্য ও সুবিধাবাজদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব বিবেচনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ্য ও মেধাবীদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে প্রধান ও সহ-প্রধান নিয়োগ পরিচালনা পরিষদের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় মূল্যায়নের ভিত্তিতে করার দাবী হয়ে উঠে সার্বজনীন।
সেই লক্ষে শিক্ষায় সংস্কারের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রক্রিয়া চালু করেছে যা এখনো বাস্তবায়ন হয়ে উঠেনি। এই প্রক্রিয়ায় অধিকতর যোগ্য ও মেধাবীরা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিবে বলে আশা করা যায় যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সঠিক পরিবেশ নিশ্চিতে সহায়ক হবে। তবে বর্তমান জনগণের সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক সমাজে খানিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন এর ফলে বিগত ফ্যাসিবাদী সময়ের যারা সুবিধা পেয়েছে তারা আবারও সুবিধা পাবে। আগে যারা বঞ্চিত হয়েছে তারা আবারও বঞ্চিত হবে। এক্ষেত্রে কথাটি একেবারে অবাস্তব নয়। আমি বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করছি।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে বারবার নীতিমালা পরিবর্তনের কারণে মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে ভাগ্যের জোরে কম মেধাবী অনেকে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ বনে গেছেন। তথ্য মতে চলমান এনটিআরসিরএ’র মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ডিগ্রী কলেজে অধ্যক্ষের ৫৮৪ টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে ৫৫০ টি। অন্য্যন্য পদেও তুলনামূলক কম আবেদন পড়েছে। অধ্যক্ষ পদের সমান আবেদনও পড়েনি।
আসলে আবেদন পড়েনি নয়; আবেদন করার যোগ্য লোক নেই। অধ্যক্ষ পদে যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ার একমাত্র কারণ বারবার নীতিমালা পরিবর্তন। ২০১০ সাল তৎপূর্বের এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী এমপিওভুক্তির পর থেকে ডিগ্রী কলেজে ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকলে উপাধ্যক্ষ পদে এবং ১৫ বছরের শিক্ষকতা অভিজ্ঞতা থাকলে অধ্যক্ষ পদে আবেদনের জন্য যোগ্য বিবেচিত হতো। ২০১৮ সালের এমপিও নীতিমালায় এই কাম্য যোগ্যতা পরিবর্তন করে উপাধ্যক্ষ পদে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে তিন বছরের অভিজ্ঞতা যুক্ত করা হয় আবার বয়স ৫৫ হলে তারা আবেদনের অযোগ্য। সেই সময় অনুপাত প্রথার কারণে সহকারী অধ্যাপক হতে হতে ৫৫ বছর গড়িয়ে অবসরের সময় হয়ে যেত। তৎকালীন সময়ে নীতিমালা পরিবর্তনের সুযোগে ভাগ্যের জোরে কাকতালীয়ভাবে অনেকে অধ্যক্ষ এবং উপাধ্যক্ষ হয়ে গেছেন। বিশেষ করে নতুন এমপিও হওয়া কলেজে অনুপাত প্রথার সুযোগে তাড়াতাড়ি সহকারী অধ্যাপক হয়ে পদগুলোতে বসে গেছেন। বড় ও পুরাতন কলেজের যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষকরা বঞ্চিতই শুধু হননি বরং অনেকক্ষেত্রে অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ হয়ে তাদের মাথার উপর এসে বসেছেন ছোট ও নতুন কলেজের জুনিয়র শিক্ষকরা। নতুন এমপিও হওয়া কলেজে আট বছরে সহকারী অধ্যাপক হয়ে গেছেন আবার বড় কলেজে পঁচিশ বছরেও অনেকে সহকারী অধ্যাপক হতে পারেননি।
নীতিমালা ও অনুপাত প্রথার ম্যারপ্যাচে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকরা আটকে গেছেন। এমনকি অনেক কলেজে একাধিকবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২০১৮ সালের নীতিমালায় অধ্যক্ষ পদে আবেদনের ক্ষেত্রে উপাধ্যক্ষ পদে তিন বছরের অভিজ্ঞতা যুক্ত করা হয। ফলে অধ্যক্ষের পদ ফাঁকা থেকে যায় যোগ্য প্রার্থীর অভাবে। এনটিআরসিএ’র মাধ্যমেও এখন নিয়োগ হলেও একই ম্যারপ্যাচের কারণে ঘুরেফিরে একই প্রক্রিয়াই অব্যাহত থাকবে। পূর্বের রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্তরাই ঘুরেফিরে পদে থাকবে। এক্ষেত্রে এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু রেখে ২০১৮ সালের পূর্বের কাম্য যোগ্যতা বহাল করে পূর্ণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যোগ্য ও মেধাবীদের প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহ-প্রধান হওয়ার পথ উন্মুক্ত করা যেতে পারে। অধ্যক্ষ হতে হলে কেন উপাধ্যক্ষের অভিজ্ঞতা লাগবে? উপাধ্যক্ষ হতে গেলে কেন সহকারী অধ্যাপকের অভিজ্ঞতা লাগবে? সরকারী কলেজ অধ্যক্ষ হতে গেলে উপাধ্যক্ষের ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হতে প্রো-ভিসির অভিজ্ঞতা না লাগলে বেসরকারি কলেজেও এমন বিধান অযৌক্তিক। বেসরকারি কলেজে এমনিতে সহকারী অধ্যাপক হতে হতে চাকুরী শেষ প্রান্তে চলে আসে যদিও এই অনুপাত প্রথার জট নতুন নীতিমালার সুবাধে কিছুটা ছেড়েছে।
২০২০ সালে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশ মোতাবেক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সংসদ সদস্যদের সরিয়ে দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে যা অদ্যাবধি বহাল রয়েছে। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক বলয়ের বাহিরে রাখারই উত্তম। রাজনৈতিক নেতাদের পরিবর্তে শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যুক্ত করা গেলে তা সরকারী দলের জন্য, দেশের জন্য তথা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে দিনশেষে যার সুফল সরকারী দলের ঘরেই উঠবে। কেননা শহীদ রাষ্টপতি জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম বেসরকারি শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভূক্ত করে সমাজে সম্মানজনক অবস্থান দিয়েছেন। তিনি জাতি গঠনের কারিগর তথা শিক্ষকদের জীবন যাত্রার মানোন্নয়নে ১৯৮০ সালে শিক্ষকদের জন্য অভিন্ন চাকুরী বিধি এবং জাতীয় বেতন-স্কেলের প্রারম্ভিকের ৫০% দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন দক্ষ শিক্ষকদের শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করতে হলে তাদের যথাযোগ্য আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরই সহধর্মিনী বেগম খালেদা জিয়া শিক্ষকদের এ বেতন ১৯৯১ সালে ১০% এবং ২০০১ সালে সরকার গঠনের পর আরও ১০% বৃদ্ধি করেছেন। অবসর কল্যাণসহ বেসরকারি শিক্ষকদের বিভিন্ন সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। একই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম জিয়ার উত্তরসূরি দেশনায়ক তারেক রহমানও শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষকদের কল্যাণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে আশা করা যায়। শিক্ষকতার মহান পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে আর্থিক নিরাপত্তার সাথে পদোন্নতি ও পদায়নের ন্যায্য সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এ ধরণের সুযোগ, নিরাপত্তা ও সমতা না থাকলে মেধাবীরা ক্রমান্বয়ে মুখ ফিরিয়ে নিবে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা।
আগামী প্রজম্মকে যথাযথ শিক্ষা, নৈতিকতা আর যোগ্যতার সমন্বয়ে দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সৎ, মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। এনটিআরসিএ এর পরিবর্তে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী সরকারি কর্ম-কমিশনের আদলে একটি ‘বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ কমিশন’ গঠন করে তার মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠান প্রধান, শিক্ষক, কর্মচারীসহ সকল নিয়োগ, পদোন্নতি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে একটি টেকসই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কেননা এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা সমস্যায় জর্জরিত। প্রতিষ্ঠানটির নানা পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিগত ২০ বছরে যে হারে বঞ্চিতরা সংক্ষুব্ধ হয়ে আদালতে গিয়েছে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরও বোধয় কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এতো মানুষ আদলত পর্যন্ত যায়নি।
যথাযথ শিক্ষা ও দক্ষতার সমন্বয়ে একটি উন্নত জাতি গঠনে শিক্ষকদের অবদান অসামান্য। তাই ন্যায্যতা এবং সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের বঞ্চিত ও বৈষম্যের যাঁতাকলে আটকে রেখে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ও উন্নত জাতি গঠন সম্ভব নয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদ্যমান বৈষম্য, অন্যায্যতা ও অব্যবস্থাপনা দূর হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকদের পেশাগত নিরাপত্তা, আর্থিক সমতা, পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য দূরীভূত হওয়া প্রয়োজন। তাহলেই বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্রীয় আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে। শিক্ষা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী বান্ধব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করে নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিতকরণে সময়োপযোগী টেকশই আইন ও নীতিমালা প্রয়োজন।
দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে বলে আমরা আশাবাদী। ইতোমধ্যে শিক্ষার দায়িত্ব পেয়েছেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি দেশের শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে সত্যিকার অর্থে ভাবেন। আশা করি তিনি বেসরকারি শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনুপাত প্রথা উঠিয়ে পর্যায়ক্রমে সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপকের পদ সৃষ্টি করবেন। নিয়োগ, পদোন্নতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী বান্ধব কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের নব্বই ভাগেরও বেশি শিক্ষার্থীর নেতৃত্ব দেওয়া বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন দিগন্তের সূচনা করবেন। একটি টেকসই ও সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাবেন।
লেখকঃ বেসরকারি কলেজ শিক্ষক ও গবেষক।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল