।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
সকালের সমাবেশে প্রধান শিক্ষক ঘোষণা দিলেন, “প্রিয় শিক্ষার্থীরা, তোমাদের মঙ্গল চিন্তা করেই আমরা নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ বছর থেকে বোর্ড বই শুধু ‘দেখার’ জন্য, আর গাইড বই ‘পড়ার’ জন্য!”
শিক্ষার্থীরা হাততালি দিল। কারণ তারা বুঝেছে—এটাই উন্নত শিক্ষা।
রাহাত নামে এক ছাত্র বাড়ি গিয়ে বাবাকে বলল, “আব্বু, বোর্ড বই তো ফ্রি পেয়েছি, কিন্তু স্যার বলেছেন আসল জ্ঞান নাকি অমুক গাইডে লুকানো আছে। না কিনলে পরীক্ষায় প্রশ্ন চিনতে পারব না।”
বাবা অবাক হয়ে বললেন, “তাহলে বোর্ড বই কেন?”
রাহাত গম্ভীর মুখে উত্তর দিল, “ওটা নাকি সরকারি সাজসজ্জা। আসল কাজ করে গাইড।”
পরদিন বইয়ের দোকানে দেখা গেল অদ্ভুত দৃশ্য। বোর্ড বইগুলো কোণায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে, যেন তারা লজ্জায় মাথা নিচু করেছে। আর গাইড বইগুলো সামনে সাজানো—মলাটে বড় করে লেখা: ‘১০০% কমন ইনশাআল্লাহ!’
একটি গাইড বই আরেকটিকে বলছে, “ভাই, আমাদের ছাড়া এরা নাকি পাশই করতে পারে না!”
বোর্ড বই কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল, “কিন্তু আমাকেই তো সরকার পাঠিয়েছে শেখানোর জন্য।
গাইড বই হেসে উত্তর দিল, “তুমি আদর্শ, আমি বাস্তবতা।”
এদিকে শিক্ষক কক্ষে এক প্রতিনিধি ডায়েরি কলম ও কিছু গিফট নিয়ে হাজির। বললেন, “স্যার, শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা ভেবে আমাদের বইটা একটু ‘সুপারিশ’ করলে ভালো হয়।”
শিক্ষক মৃদু হেসে বললেন, “আমরা তো শিক্ষার মানুষ, ব্যবসা বুঝি না।”
প্রতিনিধি চোখ টিপে বললেন, “স্যার, এটাকে ব্যবসা বলবেন কেন? একে বলুন—পারস্পরিক সহযোগিতা!”
এভাবেই ‘গাইডপুর’ নামের এক অদ্ভুত শিক্ষারাজ্যে বোর্ড বই থাকে আইনের পাতায়, আর গাইড বই থাকে ক্ষমতার আসনে। সেখানে জ্ঞান নয়, কমন প্রশ্নই সর্বোচ্চ সত্য। সেখানে সৃজনশীলতা নয়, মুখস্থ উত্তরই সফলতার চাবিকাঠি।
আর আমরা বিস্মিত হয়ে দেখি—আইন বলছে নিষিদ্ধ, কিন্তু বাস্তব বলছে অপরিহার্য।
এই ব্যঙ্গচিত্র কোনো কল্পকাহিনি নয়; বরং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আয়নায় ভেসে ওঠা এক পরিচিত মুখ।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা বিদ্যমান। একদিকে সরকার বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করে শিক্ষার সমতা নিশ্চিত করতে চায়, অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষের অদৃশ্য চাপ শিক্ষার্থীদের ঠেলে দেয় নির্দিষ্ট গাইড, নোট ও ব্যাকরণ বই কেনার দিকে। আইনে নিষিদ্ধ—কিন্তু বাস্তবে বহুল প্রচলিত। এই বৈপরীত্যই আজকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
দেশে প্রায় ৩৯ হাজার সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যদি গড়ে প্রতি প্রতিষ্ঠানে বছরে ২০০ জন শিক্ষার্থী ১,৫০০ টাকা ব্যয়ে গাইড ও সহায়ক বই কিনতে বাধ্য হয়, তবে এই বাজারের আকার দাঁড়ায় প্রায় ১,১৭০ কোটি টাকা। বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে ৩০০–৫০০ শিক্ষার্থী ২,০০০–৩,০০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করে। ফলে এই বাণিজ্য সহজেই ২,০০০–৩,০০০ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করে।
প্রশ্ন হলো—এই অর্থের কত অংশ শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্যয় হয়, আর কত অংশ কমিশনের অদৃশ্য চক্রে হারিয়ে যায়?
১৯৮০ সালে প্রণীত The Note-Books (Prohibition) Act, 1980 অনুযায়ী অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নোট ও গাইড বই মুদ্রণ, প্রকাশ, আমদানি ও বিক্রয় আইনত নিষিদ্ধ। ২০০৮ সালে হাইকোর্টও নোটের পাশাপাশি গাইড বই নিষিদ্ধে নির্দেশনা দেয়। আইন ভঙ্গের শাস্তি সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।
তবুও বাস্তবতা ভিন্ন। বইয়ের দোকানগুলোতে সারি সারি গাইড, টেস্ট পেপার, সাজেশন বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যেই। প্রশ্ন ওঠে—আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা কেন? নজরদারির অভাব, প্রভাবশালী চক্রের চাপ, নাকি প্রশাসনিক উদাসীনতা?
একজন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাশেদ জানায়, “স্যার ক্লাসে বলেন, এই গাইড না আনলে পরীক্ষার প্রশ্ন ধরতে পারবে না। বোর্ড বই পড়লে পুরো নম্বর পাওয়া কঠিন।”
আরেক কলেজ শিক্ষার্থী নাজমা বলে, “আমরা বুঝে পড়তে চাই, কিন্তু গাইডের নির্দিষ্ট ভাষা না লিখলে নম্বর কম দেওয়া হয়—এমন ধারণা তৈরি হয়েছে।”
এই বক্তব্যগুলো কেবল অভিযোগ নয়; এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপে থাকার প্রমাণ। তারা জ্ঞানার্জনের জন্য নয়, নম্বর বাঁচানোর জন্য বই কিনছে। শিক্ষার লক্ষ্য যেখানে চিন্তাশক্তি বিকাশ, সেখানে গাইডনির্ভরতা তৈরি করছে মুখস্থ সংস্কৃতি।
সিনহা নামের একজন শিক্ষক স্বীকার করেন, “সব শিক্ষক এই সিন্ডিকেটের অংশ নন। কিন্তু অনেক সময় প্রকাশনীর প্রতিনিধি এসে বিভিন্ন প্রলোভন দেয়—সেমিনার স্পনসর, উপহার, এমনকি নগদ সুবিধাও।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতিষ্ঠানের প্রধান যদি নির্দিষ্ট প্রকাশনীর বই তালিকাভুক্ত করেন, তখন সাধারণ শিক্ষক ভিন্নমত দিতে পারেন না।” অর্থাৎ, এটি কেবল ব্যক্তিগত দুর্নীতি নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির সমস্যাও। কেউ হয়তো স্বেচ্ছায় যুক্ত, কেউ বা নীরব চাপে।
আবদুল হাই নামের একজন অভিভাবক বলেন, “বছরের শুরুতেই বইয়ের তালিকা হাতে পেলেই আতঙ্ক লাগে। বোর্ড বই তো ফ্রি, কিন্তু গাইড-গ্রামার-টেস্ট পেপার মিলিয়ে কয়েক হাজার টাকা চলে যায়।”
মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি বাড়তি চাপ। নিম্নআয়ের পরিবারে তো আরও কঠিন। অনেকে মনে করেন, ‘বাধ্যতামূলক নয়’ বলা হলেও বাস্তবে এক ধরনের নীরব বাধ্যবাধকতা কাজ করে। সন্তান যেন পিছিয়ে না পড়ে—এই ভয়ই তাদের কিনতে বাধ্য করে।
একজন শিক্ষক নেতা মো: জসিম উদদীন আহমেদ বলেন, “গাইড বই আইনে নিষিদ্ধ তবে নতুন সরকার আসার পর কয়েকদিন হৈ হিল্লা দেখা যায় তারপর যা তাই। তার মতে, “কিছু অসাধু ব্যক্তির কারণে পুরো শিক্ষক সমাজকে দায়ী করা ঠিক নয়, তবে দায় এড়ানোও যাবে না।”
একজন শিক্ষাবিদ বলেন, “গাইডনির্ভর শিক্ষা সৃজনশীলতা নষ্ট করে। শিক্ষার্থী প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে, কিন্তু ধারণা বোঝে না। পরীক্ষাকেন্দ্রিক এই সংস্কৃতি চিন্তার পরিসর সংকুচিত করছে।”
তিনি আরও বলেন, “যদি বোর্ড বই যথেষ্ট না হয়, তবে তার মান উন্নত করতে হবে। সহায়ক বই থাকতে পারে, কিন্তু তা কখনোই চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।”
তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
গাইড ও নোট বইয়ের বাজার কয়েক হাজার কোটি টাকার। এর সঙ্গে যুক্ত কোচিং নোট, সাজেশন, মডেল টেস্ট ইত্যাদি। প্রশ্ন হলো—এই অর্থ যদি মানসম্মত গবেষণাধর্মী প্রকাশনায় ব্যয় হতো, তাহলে আপত্তি কম থাকত। কিন্তু অভিযোগ হলো, অনেক ক্ষেত্রে মানহীন বই উচ্চ দামে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এবং তার একটি অংশ কমিশন হিসেবে ফিরে আসছে সংশ্লিষ্টদের কাছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত মুক্তচিন্তার ক্ষেত্র, বাণিজ্যের নয়। আইন আছে, নীতিমালা আছে—কিন্তু প্রয়োগ নেই। ফলে গাইড সিন্ডিকেটের অদৃশ্য শিকল শিক্ষার্থীদের বেঁধে ফেলছে।
আমরা যদি সত্যিই আগামী প্রজন্মকে দক্ষ, সৃজনশীল ও নৈতিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তবে এই অস্বচ্ছ চক্র ভাঙতেই হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিকতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা না হলে শিক্ষার মন্দিরে বাণিজ্যের আসরই চলতে থাকবে।
প্রশ্ন এখন একটাই—আমরা কি সাহস করে বলব, শিক্ষা পণ্য নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ?
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
