এইমাত্র পাওয়া

স্বাধীনতার ৫৫ বছরে শহীদ মিনারের প্রতি এত অবহেলা কেন?

।৷ এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।

সকাল সাড়ে আটটা। গ্রামের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট রাফি। হাতে কাগজের লাল-সবুজ ফুল। আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি। শিক্ষক বলেছে, শহীদ মিনারে ফুল দিতে হবে। কিন্তু মিনারের সামনে গিয়ে সে থমকে যায়। বেদীর পাশে শুকানো খড়, এক কোণে প্লাস্টিকের ময়লা, লাল বৃত্তটি ফ্যাকাসে হয়ে প্রায় সাদা। রাফি চুপচাপ ফুলটা রেখে ফিরে আসে। তার মনে প্রশ্ন—“এটাই কি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা?”

এই প্রশ্ন আজ শুধু রাফির নয়; সারাদেশের বহু সচেতন নাগরিকের। বাংলাদেশের অধিকাংশ শহীদ মিনার বছরজুড়ে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মিনারগুলো ২১শে ফেব্রুয়ারির আগে ধোয়া-মোছা হলেও বাকি সময় সেগুলো হয়ে ওঠে ময়লার ভাগাড় কিংবা মাদকসেবীদের আড্ডাস্থল। অনেক জায়গায় সংস্কারের অভাবে রঙ চটে গেছে, ভেঙে পড়েছে কাঠামো, বেদীতে জমেছে ধুলো-ময়লা—নষ্ট হচ্ছে পবিত্রতা।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার শুধু একটি স্থাপত্য নয়; এটি ভাষা আন্দোলনের অমর স্মারক। ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতীক। এখানেই প্রতিবছর রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও সাধারণ মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। কিন্তু রাজধানীর বাইরের হাজার হাজার শহীদ মিনারের অবস্থা কি একই রকম সম্মান পায়?

সারা বছর দেখভালের কেউ নেই। কোনো বাজেট বরাদ্দ নেই বা থাকলেও কার্যকর নয়। ফলে অনেক মিনার পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও বেদী ভেঙে গেছে, কোথাও পিলার হেলে পড়েছে।

অনেক এলাকায় দেখা যায়—বেদীতে জুতো পায়ে ওঠানামা। মিনারের সামনে খড় শুকানো
রাতের বেলায় আড্ডা বা মাদকসেবন।রাজনৈতিক পোস্টার সাঁটা। এগুলো শুধু অবহেলা নয়; এটি শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি অবমাননা।

স্থাপত্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক জায়গায় শহীদ মিনারের নকশা বিকৃতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও লাল বৃত্তের অনুপাত ঠিক নেই, কোথাও মূল স্তম্ভের সংখ্যা বদলে গেছে। ফলে ঐতিহাসিক প্রতীকের অর্থ হারিয়ে যাচ্ছে।

অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার আছে, কিন্তু তা শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারির আনুষ্ঠানিকতার জন্য। বাকি সময় সেটি অচল, নীরব, অযত্নে পড়ে থাকে। স্থানীয় প্রশাসনও নিয়মিত তদারকি করে না।

অভিযোগ রয়েছে—শুধু সারা বছর নয়, শহীদ দিবসেও অবহেলা চোখে পড়ে। রাত ১২টার পর ফুল দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা হয়; কিন্তু পরদিন সকালেই দেখা যায় ফুলের স্তূপ এলোমেলো, পরিচ্ছন্নতার অভাব, কোনো শৃঙ্খলা নেই। লাল বৃত্তটি ফ্যাকাসে, সাদা রঙ চটে গেছে। দায়সারা রং করে, সামান্য পরিষ্কার করে অনুষ্ঠান শেষ—তারপর আবার আগের অবস্থা।
প্রশ্ন উঠছে—এইভাবে স্মরণ করা আর না করা কি একই কথা নয়?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্থাপত্য বিশেষজ্ঞ (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “শহীদ মিনার একটি প্রতীকী স্থাপনা। এর নকশা, রঙ, অনুপাত—সবকিছুর মধ্যে ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। ভুল নকশা বা অযত্ন মানে ইতিহাসের বিকৃতি।”
তিনি প্রস্তাব করেন—প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় শহীদ মিনার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পৃথক বাজেট ও তদারকি কমিটি গঠন করা উচিত।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির মহাসচিব মো: জসিম উদদীন আহমেদ   বলেন,- “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকলেও তা রক্ষার দায়িত্ব কেউ স্পষ্টভাবে নেয় না। প্রয়োজন নীতিমালাভিত্তিক বাধ্যবাধকতা।” তার মতে, প্রতিমাসে অন্তত একদিন শিক্ষার্থীদের নিয়ে শহীদ মিনার পরিষ্কার ও আলোচনা সভা আয়োজন করলে সচেতনতা বাড়বে।

বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপিকা রোকেয়া চৌধুরী বেবী বলেন-“শহীদ মিনারের প্রতি সারা বছরের অবহেলা লজ্জার বিষয়। আমরা চাই শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারিতে নয়, সারাবছরই মিনারের পরিচর্যা হোক, যেন ভাষা শহীদদের স্মৃতিকে সঠিকভাবে সম্মান জানানো যায়।”

রাজশাহীর এক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন,- “আমরা নিজের উদ্যোগে বছরে দুইবার রং করি। কিন্তু সরকারি বরাদ্দ নেই। স্থানীয়দের সহযোগিতা ছাড়া কিছু করা কঠিন।” তিনি মনে করেন, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পাঠ্যবইয়ে থাকলেও তার চর্চা বাস্তবে কম।

কলেজছাত্রী তানিয়া আক্তার জানায়,-“২১শে ফেব্রুয়ারি ছাড়া শহীদ মিনারে কেউ যায় না। আমরা যদি সারা বছর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতাম, তাহলে হয়তো জায়গাটা জীবন্ত থাকত।” তার মতে, শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে বইপড়া, কবিতা আবৃত্তি, ভাষা আন্দোলন বিষয়ক আলোচনা হতে পারে।

বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির সহকারী মহাসচিব প্রফেসর বদরুল ইসলাম বলেন:
“শহীদ মিনার শুধু প্রতীক নয়, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ও ইতিহাসের অঙ্গ। কিন্তু সারাবছর এর অবহেলা আমাদের চেতনারও অবহেলা প্রতিফলিত করছে। স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে year-round রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্ব নিতে হবে।”

একজন অভিভাবক বলেন, “আমরা সন্তানদের ভাষা শহীদদের গল্প শোনাই। কিন্তু যখন তারা দেখে মিনার নোংরা, তখন তারা প্রশ্ন করে—এটাই কি শ্রদ্ধা?” তার মতে, পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতাও জরুরি।

স্থানীয় প্রশাসনের অনেকেই বলেন—বাজেট সংকট, জনবল সংকট ইত্যাদি কারণে নিয়মিত তদারকি সম্ভব হয় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও কি আমরা এই অজুহাতে থাকব?

শহীদ মিনার শুধু একটি ইট-সিমেন্টের কাঠামো নয়; এটি আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ। এখানে অবহেলা মানে নিজের ইতিহাসকে অবহেলা।

চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর—প্রায় সব বিভাগেই গ্রামীণ শহীদ মিনারগুলোর একই অবস্থা। কোথাও ভাঙা বেদী, কোথাও আগাছায় ঢেকে গেছে পুরো এলাকা। কিছু জায়গায় স্থানীয় উদ্যোগে ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ হলেও তা ব্যতিক্রম।

অনেক উপজেলা শহীদ মিনারেই দেখা যায়—রাতের অন্ধকারে অবাঞ্ছিত কার্যকলাপ। পর্যাপ্ত আলো নেই, সিসিটিভি নেই। ফলে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
এই অবস্থার কারণ-
© প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার অভাব
© বাজেটের স্বল্পতা বা সঠিক ব্যবহারের অভাব
© সাংস্কৃতিক চর্চার দুর্বলতা
© সচেতনতার ঘাটতি

স্বাধীনতার পর প্রজন্ম বদলেছে। ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী নেই। ফলে আবেগের জায়গাটি অনেকের কাছে ম্লান হয়ে গেছে।
এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায়-
© বছরব্যাপী রক্ষণাবেক্ষণ কমিটি গঠন
© নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ
© শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাসিক পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি
© শহীদ মিনারকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আয়োজন
© সিসিটিভি ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা
© ভুল নকশা সংশোধন ও মানসম্মত পুনর্নির্মাণ

শহীদ মিনারের লাল বৃত্তটি শুধু একটি রঙিন বৃত্ত নয়; এটি রক্তের প্রতীক। যখন সেই লাল ফ্যাকাসে হয়ে যায়, তখন আমাদের চেতনার রঙও কি ফিকে হয়ে যায় না?

রাফির মতো হাজারো শিশুর চোখে যেন আর প্রশ্ন না জাগে। শ্রদ্ধা যেন দায়সারা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। শহীদদের স্মরণ মানে শুধু ফুল দেওয়া নয়; তাদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেকেই জিজ্ঞেস করতে হবে—আমরা কি সত্যিই শহীদদের সম্মান করছি, নাকি শুধু আনুষ্ঠানিকতা পালন করছি? শহীদ মিনারগুলোর পবিত্রতা রক্ষা করা মানে আমাদের ইতিহাস, ভাষা ও আত্মপরিচয়কে রক্ষা করা। এখনই সময়—অবহেলা নয়, দায়িত্বের পথে হাঁটার।

লেখক: শিক্ষক ও  গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/২০/০২/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.