এইমাত্র পাওয়া

অষ্টম শ্রেণি পাস হলেই বিয়ে, ক্লাসরুমে শিক্ষকের বসবাস

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের পাঁচ টাকা ফি আর হাটের চাঁদায় মাজারদিয়াড় নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হয় বেতন। ৫ হাজার টাকার মাসিক বেতনে কাজ করেন তিনজন শিক্ষক। ভঙ্গুরদশায় বিদ্যালয়টির ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করে প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুরুল ইসলাম (৫৩)। বিদ্যালয়টি ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ২৪ বছরেও বিনা বেতনে শ্রম দিচ্ছেন তিনি। শুধু তিনি একা নন, তার সঙ্গে আছেন আরও দুই শিক্ষক। বিদ্যালয়টি এমপিও হবে, নিজের স্থায়ী চাকরি হবে, এমন আশায় ২০০২ সালের শুরুর দিকে নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার গ্রামের বাড়িতে সংসার, সন্তানাদি রেখে পাড়ি জমান রাজশাহীর প্রত্যন্ত চরে।

যেখানে এখনো পৌঁছায়নি বিদ্যুৎ, ছোঁয়া লাগেনি আধুনিক জীবনযাত্রার। শিক্ষকতা পেশাকে ভালোবেসে ও নিজের স্থায়ী কর্মের সন্ধানে এসে পড়েছেন অথই পদ্মায়। ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকার পদ্মা নদীর চরমাজারদিয়াড়। এটি রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার একটি ইউনিয়ন। এই চরে সাড়ে আট হাজার লোকের বসবাস। ৩ হাজার ৪৪৪ জন ভোটার। একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে। চরের ছেলে-মেয়েরা প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোলে ঠাঁই হয় নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয় পাড়ি দিলে বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে।

তাই এসএসসি পর্যন্ত একটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দাবি চরবাসীর দীর্ঘদিনের। কিন্তু সেই দাবি পূরণ হয়নি। তাই এসএসসি পরীক্ষায় বসতে হলে চরের ছেলেমেয়েদের পদ্মা পাড়ি দিয়ে থাকতে হয় রাজশাহী শহরে। খরচের কারণে শহরে ১২-১৩ বছরের শিশু সন্তানকে চরের ৯০ শতাংশ নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো রাখতে পারেন না। তাই প্রতিবছর ঝরে পড়ে শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি চরমাজারদিয়াড়ে গিয়ে দেখা গেছে, চার কক্ষের বিদ্যালয়টি চালা টিনের। তার মধ্যে এক কক্ষ নবনির্মিত। জরাজীর্ণ তিন কক্ষে চলে ক্লাস। দক্ষিণ দুয়ারির পূর্ব থেকে সপ্তম শ্রেণি। তার পাশে ষষ্ঠ শ্রেণি। এই শ্রেণির শিক্ষার্থী ৫০ জন। তার কিছু কম সপ্তম শ্রেণিতে। তুলনামূলক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ জনের ঘরে অষ্টম শ্রেণিতে।

পূর্ব দুয়ারির অষ্টম শ্রেণিতে ভিতরে ঢুকতে চোখে পড়ে টেবিল ও কয়েকটি ব্রেঞ্চ দিয়ে করা শোবার জায়গা। তার ওপর গোছানো আছে বিছানা। পাশেই ক্লাস রুমের বাঁশের আড়ায় দড়ির সঙ্গে ঝুলছে শিক্ষকের পোশাক। দক্ষিণ কোনে চেয়ার-টেবিল পাতা। সেখানে আছে বেশ কিছু বই-পুস্তক।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা স্বীকার করলেন, ক্লাস রুমেই থাকেন শিক্ষক নুরুল ইসলাম। বেতন নেই। থাকার জায়গা নেই। তাই তিনি ক্লাসরুমেই থাকেন। চরে তার থাকার মতো জায়গা নেই। আর রাজশাহী শহরে যেতে নদী পাড়ি দিতে হবে। একে তো বেতন নেই, তা ছাড়া শহরে ভাড়া থাকা সম্ভব নয় যে কারণে তিনি ক্লাসরুমেই থাকেন। এ ছাড়া সকাল, দুপুর ও রাতের খাবার খান স্থানীয় বাসিন্দা সালাউদ্দিন টুকুর বাসায়।

সহকারী শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘২০০২ সাল থেকে এখানে আছি। স্কুল কমিটি মাসে ৫ হাজার টাকা বেতন দেয়। এই টাকা স্থানীয় হাট থেকে তুলে। আশায় পড়ে আছি এমপিওভুক্ত হবে স্থানীয়ভাবে বেতন পাব। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে গেছে। তবুও হয়নি।’ ক্লাসরুমে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা লজ্জাজনক বিষয়। উপায় নেই, কী করার। পাশে একটা ক্লাসরুম হচ্ছে। কিছুদিন পরে সেখানে চলে যাব।’ ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রিদিকা তাবাসসুম বলল, ‘আমরা পড়তে চাই, কিন্তু এখানে স্কুল নাই। কয়দিন আগে এক আপুর বিয়ে হয়ে গেল-তিনি পড়তে চায়ছিলেন, পারে নাই।’ চরের গৃহবধূ ময়না বেগমের দুই ছেলে। চরের স্কুলে এসএসসির সুযোগ নেই। তাই লেখাপড়া করাচ্ছেন শহরে। তিনি বলেন, ‘পড়াতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিন তাদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে হাঁস-মুরগি বিক্রি করতে হয়। এখানে এইট পাস করলেই শেষ। মেয়েদের বাল্যবিয়ে হইতেছে। এটি ঠেকানো যায় না। ভোটের সময় দেখা যায়, ভোটের পর কেউ দেখে না। আমাদের কিচ্ছু দেয় নাই।’

চরমাজারদিয়াড় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হুমায়ুন কবির বলেন, ‘চরে সাড়ে আট হাজার মানুষের বসবাস। চরে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার মতো স্কুল নাই। অনেকেই বলে চরে শিক্ষার্থী নেই। তাহলে একটা প্রাথমিক, একটা নিম্ন মাধ্যমিক ও তিনটা ব্র্যাক স্কুল কীভাবে চলে। আমরা জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনওসহ অনেককেই বলেছি। কাজ হয়নি।’

পবা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোতাহার হোসেন বলেন, ‘চরমাজারদিয়াড়ে একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে, যদিও সেটির এমপিও নেই। কিছু শিক্ষার্থী আছে, কয়েকজন শিক্ষক তাদের ক্লাস করান। মূলত এমপিও এবং শিক্ষকদের বিষয়ের চর থেকে উঠে আসা দরকার ছিল। কিন্তু সেভাবে রেসপন্স পাওয়া যায় না। সবমিলে আমরাও চাই সেখানে একটা ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক এবং বাচ্চারা সেখানে শিক্ষা নেয়।’বাংলাদেশ প্রতিদিন

শিক্ষাবার্তা /এ/২০/০২/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.