।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
ভোর সাড়ে ছয়টা। গাবতলীর বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছেন কুষ্টিয়ার স্কুলশিক্ষক হাফিজুর রহমান। হাতে ছোট ব্যাগ, কাঁধে দায়দায়িত্বের ভার। সামনে একটি আন্তঃজেলা বাস। বাস ছাড়ার আগে হেলপার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কিছু টাকা দিল পাশের টেবিলে বসা এক ব্যক্তিকে। লোকটি খাতায় নাম লিখে নিলেন, সিল মারলেন। হাফিজুর দেখলেন—এই দৃশ্যটি যেন খুব স্বাভাবিক। কেউ প্রতিবাদ করল না, কেউ প্রশ্ন তুলল না। বাসটি একটু এগিয়ে আরেক জায়গায় থামল—আবারও কিছু টাকা আদান–প্রদান।
হাফিজুর রহমান পাশের যাত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, “এগুলো কী?”
উত্তর এল, “ভাই, সমিতির টাকা। না দিলে বাস চলবে না।”
এই ‘না দিলে চলবে না’ কথাটাই কি চাঁদা? নাকি এটি সমঝোতা? প্রশ্নটা আজ শুধু হাফিজুরের নয়, গোটা দেশের। কারণ সম্প্রতি সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন—পরিবহন খাতে যে অর্থ তোলা হয়, সেটিকে তিনি চাঁদা হিসেবে দেখেন না; বরং মালিক–শ্রমিক সমিতির কল্যাণে সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা অর্থ হিসেবে দেখেন।
মন্ত্রী আরও বলেন, চাঁদা তখনই চাঁদা, যখন কেউ দিতে চায় না বা জোর করে আদায় করা হয়। এখানে নাকি তা হচ্ছে না; এটি অলিখিত বিধির মতো একটি প্রথা।
মন্ত্রী যখন বলেন এটি চাঁদা নয়, সমঝোতা—তখন তিনি মূলত একটি ভাষাগত অবস্থান নিচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শব্দ বদলালে কি বাস্তব বদলায়?
বাসমালিক বা শ্রমিকরা যদি নির্দিষ্ট হারে অর্থ দিতে বাধ্য হন, আর না দিলে তাদের গাড়ি রাস্তায় চলতে না পারে—তাহলে সেটি কাগজে-কলমে স্বেচ্ছাসেবী হলেও বাস্তবে কতটা স্বতঃস্ফূর্ত?
সমঝোতার পূর্বশর্ত হলো সমান ক্ষমতা ও স্বাধীনতা। কিন্তু পরিবহন খাতে বাস্তবতা হলো—যার রাজনৈতিক প্রভাব বেশি, যার সংগঠন শক্তিশালী, তার আধিপত্যই কার্যত নিয়ম নির্ধারণ করে। মন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন—ক্ষমতায় যে দল থাকে, সেই দলের শ্রমিক সংগঠনের প্রাধান্য থাকে।
এই স্বীকারোক্তিই ইঙ্গিত দেয়—এখানে সমতার ভিত্তিতে সমঝোতা নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার মধ্যেই অর্থ আদায় হয়।
মন্ত্রী বলেছেন, এটি অলিখিত বিধির মতো। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘অলিখিত বিধি’ কতটা গ্রহণযোগ্য?
যে রাষ্ট্রে সংবিধান, আইন, বিধিমালা—সবকিছু লিখিত কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে, সেখানে অলিখিত প্রথার মাধ্যমে অর্থ আদায় কি স্বচ্ছতার মানদণ্ডে পড়ে?
ধরা যাক, মালিক সমিতি কল্যাণের জন্য তহবিল গঠন করল। সেটি যদি নিবন্ধিত হয়, হিসাব নিরীক্ষা হয়, সদস্যদের সম্মতিতে নির্ধারিত হয়—তাহলে তা বৈধ হতে পারে। কিন্তু যখন রাস্তায় রাস্তায় নগদ অর্থ আদান–প্রদান হয়, রসিদের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, আর সাধারণ মানুষ জানে না এই অর্থের কতটা প্রকৃত কল্যাণে ব্যয় হয়—তখন সন্দেহ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল অর্থ তোলা নয়; সমস্যাটি জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার।
বাস মালিক যদি প্রতিদিন নির্দিষ্ট অঙ্ক দেন, শ্রমিক যদি বাধ্যতামূলক ফি দেন—তাহলে সেই খরচ কি ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয় হয় না? বাজারে পণ্য পরিবহনের খরচ কি বাড়ে না?
শেষ পর্যন্ত সাধারণ যাত্রী ও ভোক্তাই সেই ব্যয় বহন করেন।
অর্থাৎ এটি শুধু মালিক–শ্রমিকের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি জনস্বার্থের বিষয়। জনগণের পকেট থেকে পরোক্ষভাবে অর্থ বেরিয়ে গেলে জনগণের প্রশ্ন তোলার অধিকারও জন্ম নেয়।
মন্ত্রী স্বীকার করেছেন—ক্ষমতাসীন দলের শ্রমিক সংগঠনের আধিপত্য থাকে। এ স্বীকারোক্তি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায়, অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়।
রাজনৈতিক প্রভাব যখন অর্থ প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন স্বচ্ছতা আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সংগঠনগুলো যদি সত্যিই কল্যাণে অর্থ ব্যয় করে, তবে সেই হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশে বাধা কোথায়?
যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়, তবে খোলামেলা নিরীক্ষা ও প্রকাশই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর জবাব।
মন্ত্রী বলেছেন—যেটা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য করা হয়, সেটাই চাঁদা। কিন্তু ‘দিতে চাওয়া’ বিষয়টি আপেক্ষিক। যদি না দিলে ব্যবসা বন্ধ হয়, রুট পারমিট আটকে যায়, শ্রমিক হয়রানির শিকার হয়—তাহলে সম্মতি কতটা স্বাধীন?
এখানে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ কাজ করে। আইনগত জোর না থাকলেও বাস্তব জোর থাকে। অতএব চাঁদার সংজ্ঞা কেবল আইনি নয়; সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত।
সরকার বলছে, বাড়তি কিছু হচ্ছে কি না—তা খতিয়ে দেখা হবে। এই ঘোষণায় একটি ইতিবাচক দিক আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি কেবল পর্যবেক্ষক থাকবে, নাকি নীতিনির্ধারক হিসেবে স্পষ্ট অবস্থান নেবে?
পরিবহন খাত দেশের অর্থনীতির প্রাণ। এখানে অনিয়ম বা অস্বচ্ছতা থাকলে তার প্রভাব বহুমাত্রিক। রাষ্ট্র যদি মনে করে এটি বৈধ কল্যাণ তহবিল, তবে সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া উচিত—স্বচ্ছ হিসাব, নিরীক্ষা, অনলাইন প্রকাশ, সদস্যদের সম্মতি—সব নিশ্চিত করে।
আর যদি বাস্তবে এটি চাপের মাধ্যমে আদায় হয়, তবে তা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
জনগণ বিষয়টিকে চাঁদা বলে কেন? কারণ তারা দেখেন—রাস্তায় রাস্তায় নগদ অর্থ আদান–প্রদান, রাজনৈতিক ব্যানার, প্রভাবশালী নেতাদের উপস্থিতি, আর প্রতিরোধহীন স্বীকৃতি।
তারা দেখেন—না দিলে ঝামেলা।
জনমতকে অবজ্ঞা করলে সমস্যা বাড়ে। কারণ গণতন্ত্রে জনগণের উপলব্ধিই শেষ কথা।
সমঝোতা মানে পারস্পরিক চুক্তি। চুক্তি মানে লিখিত কাঠামো, শর্ত, স্বচ্ছতা। তাহলে প্রশ্ন—কোথায় সেই চুক্তির দলিল? কোথায় নিরীক্ষিত হিসাব? কোথায় সদস্যদের স্বাধীন মতামত? যদি এগুলো প্রকাশ পায়, তাহলে বিতর্ক অনেকটাই কমে যাবে। অন্যথায় ‘সমঝোতা’ শব্দটি কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
বাসটি কুষ্টিয়ার পথে এগিয়ে যায়। হাফিজুর রহমান ভাবেন—এই অতিরিক্ত খরচ কি শেষ পর্যন্ত তাঁরই পকেট থেকে যাচ্ছে না? তিনি জানেন না, সেই টাকার কতটা প্রকৃত কল্যাণে যায়। তিনি শুধু জানেন—প্রতিবার বাসে উঠলেই ভাড়া একটু একটু করে বাড়ছে। তার চোখে এটি চাঁদা। মন্ত্রীর ভাষায় এটি সমঝোতা।
পরিবহন খাতে যদি সত্যিই কল্যাণ তহবিল প্রয়োজন হয়, তবে সেটিকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় আনতে হবে। নয়তো জনগণের চোখে এটি চাঁদাই থেকে যাবে—নাম বদলালেও চরিত্র বদলাবে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ভাষাগত ব্যাখ্যা দেওয়া নয়, বাস্তবতার সংস্কার করা। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস শব্দ নয়, কার্যক্রমের বিচার করে।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
