এইমাত্র পাওয়া

আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার আহ্বান: ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের প্রেরণা

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

মানুষের জীবনের লক্ষ্য শুধু বেঁচে থাকা নয়—বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে পরম সফলতা লাভ করা। এই উদ্দেশ্যেই যুগে যুগে পৃথিবীতে আগমন করেছেন আল্লাহপ্রদত্ত ওলী, সুফি ও আলোকিত আত্মারা। তাঁদের জীবন ও কর্ম মানবজাতিকে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার প্রকৃত পথ দেখিয়েছে। তেমনি একজন অনন্য সাধক হলেন গাউসুল আযম হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)। তাঁর ওফাত দিবস, ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম, শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি এক আধ্যাত্মিক জাগরণের দিন, আত্মশুদ্ধির আহ্বান, এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অনুপ্রেরণা।

গাউসুল আযম হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন ৪৭০ হিজরিতে ইরাকের জিলান (বর্তমান ইরান) প্রদেশে। তাঁর পিতা হজরত আবু সালেহ মূসা জঙ্গি দোস্ত (রহ.) এবং মাতা হজরত ফাতেমা (রহ.)—দুজনেই নবীজির (সা.) বংশধর। ছোটবেলা থেকেই তিনি আল্লাহভীরু, বিনয়ী ও বিদ্যানুরাগী ছিলেন। যুবক বয়সে তিনি জ্ঞানার্জনের জন্য বাগদাদে পাড়ি জমান, যেখানে তিনি কুরআন, হাদিস, ফিকহ, তাসাওউফ ও দর্শনে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন।

গাউসুল আযম হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) ছিলেন ইসলামী তাসাওউফ বা সুফিবাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। তিনি যেমন ছিলেন জ্ঞানের প্রদীপ, তেমনি ছিলেন আল্লাহর প্রেমে নিমগ্ন এক দরবেশ। তাঁর শিক্ষা ও জীবন দর্শন আজও মুসলমানদের জন্য আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।

‘ফাতেহা’ অর্থ স্মরণ বা দোয়া, আর ‘ইয়াজদাহম’ ফারসি শব্দ, যার অর্থ এগারো। অর্থাৎ রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে পালিত হয় এই দিনটি। এদিন গাউসুল আযম হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)এর ওফাত দিবস। বিশ্বের মুসলমানরা এ দিনে তাঁর স্মরণে দোয়া, মিলাদ, কিরাত, কুরআন তেলাওয়াত ও খাদ্য বিতরণের আয়োজন করে।

এই দিবসের মূল তাৎপর্য কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর মূল শিক্ষা হলো—“নিজেকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে ফিরে আসা।” গাউসুল আযম হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) এর জীবন ও কর্ম আমাদের শেখায়, কেবল নামাজ, রোজা বা দান নয়—আসল ইবাদত হলো অন্তরের শুদ্ধতা, নিঃস্বার্থতা ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ।

গাউসুল আযম হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)মানুষের আত্মার উৎকর্ষ ও নৈতিক পরিশুদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলতেন,

“যে আল্লাহকে ভালোবাসে, সে দুনিয়ার মোহে অন্ধ হতে পারে না। আল্লাহর প্রেম এমন এক আলো, যা অন্ধকার হৃদয়কেও জ্যোতিময় করে তোলে।”

তাঁর দৃষ্টিতে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার জন্য তিনটি বিষয় অপরিহার্য: ইবাদতের উদ্দেশ্য হবে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি। দুনিয়ার ভোগবাদ, হিংসা ও অহংকার থেকে দূরে থাকা। মানুষকে ভালোবাসা এবং অন্যের কল্যাণে কাজ করা।

তিনি বিশ্বাস করতেন, যে মানুষ নিজের ভেতরের মন্দ দমন করে, সে-ই আল্লাহর সবচেয়ে নিকটে যেতে পারে। তাঁর দীক্ষা ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা আজও কোটি মুসলমানের হৃদয়ে আলোকবর্তিকা হয়ে আছে।

গাউসুল আযম হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) তাসাওউফকে ব্যাখ্যা করেছেন আল্লাহপ্রেম ও আত্মশুদ্ধির পথে এক জীবনব্যাপী সাধনা হিসেবে। তিনি শিখিয়েছেন, আল্লাহর প্রেম লাভের জন্য মানুষকে নিজের নফসের (অহংকার, লালসা, হিংসা) বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে।

তাঁর ভাষায়—

 “তুমি যদি আল্লাহকে পেতে চাও, তবে তোমার অন্তরকে দুনিয়ার মায়া থেকে মুক্ত করো। দুনিয়া তোমার কাছে থাকুক, কিন্তু তা যেন হৃদয়ে স্থান না পায়।”

এই শিক্ষাই ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের প্রকৃত বার্তা—আত্মা পরিশুদ্ধ করো, বিনয়ী হও, আর আল্লাহর প্রেমে আত্মসমর্পণ করো।

বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে এই দিনটি অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে পালিত হয়। মসজিদ-মাদরাসা, খানকা ও দরগাহগুলোতে আয়োজিত হয় মিলাদ মাহফিল, কোরআন খতম, দোয়া ও ফাতেহা খাওয়ার আয়োজন।

এই আয়োজনগুলো শুধু রীতি নয়—এগুলো হলো আমাদের হৃদয়ের ভালোবাসা প্রকাশের প্রতীক।  গাউসুল আযমন হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) ছিলেন এমন এক সাধক, যিনি আল্লাহ ও মানুষের মধ্যে ভালোবাসার সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন। তাঁর শিক্ষা আমাদের শেখায়—আল্লাহর পথ হলো ভালোবাসা, করুণা ও মানবসেবার পথ।

আজকের দুনিয়া প্রযুক্তি ও ভোগবাদের মোহে হারিয়ে ফেলেছে আত্মিক শান্তি। মানুষ দিনকে দিন ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। মিথ্যা, প্রতারণা, হিংসা, ঘৃণা সমাজে বেড়েই চলেছে। এই সময়ে গাউসুল আযম হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) এর শিক্ষা আমাদের জন্য নবজাগরণের বার্তা বহন করে।

তিনি শিখিয়েছেন, আল্লাহর পথে ফেরার শুরু হয় আত্মসমালোচনা থেকে। নিজের ভেতরের অন্ধকার চিনে, তা আল্লাহর জিকিরের আলোয় দূর করতে হবে। তাঁর পথ অনুসরণ করলে সমাজে ফিরে আসবে শান্তি, সততা ও সহমর্মিতা।

গাউসুল আযম হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) ছিলেন দরিদ্র, নিপীড়িত ও অসহায় মানুষের আশ্রয়দাতা। তাঁর খানকায় সবাই সমান মর্যাদা পেতেন—কেউ ধনী-গরিব, আরব-অনারব বা নারী-পুরুষে বিভক্ত ছিলেন না। তাঁর জীবনের এই মানবিক দিক আমাদের শেখায়, আল্লাহর নিকটবর্তী হতে হলে মানুষের সেবা করাই সবচেয়ে বড় ইবাদত।

তিনি বলতেন, “মানুষের উপকার করো—এটাই তোমার নামাজ, তোমার রোজা, তোমার ফাতেহা।”

এই শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। কারণ, যে সমাজে করুণা, সহানুভূতি ও ভালোবাসা বিলুপ্ত হয়, সেই সমাজ আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়।

প্রতিবছর এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা কেমন মানুষ হয়ে উঠছি? আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী জীবন গড়ে তুলতে পারছি কি? গাউসুল আযম হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)-এর জীবন আমাদের আহ্বান জানায় আত্মসমালোচনার দিকে, সত্য ও ন্যায়ের পথে ফিরে আসার দিকে।

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের মাহফিলে অংশগ্রহণ, কুরআন তেলাওয়াত বা দোয়া—এসব যেন শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক না হয়ে যায়। বরং এগুলো হোক আত্মশুদ্ধির প্রতিজ্ঞা, আল্লাহর প্রেমে নবায়িত বন্ধনের প্রতীক।

গাউসুল আযম হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) ছিলেন এমন এক মহাসাধক, যিনি আল্লাহর ভালোবাসাকে মানুষের জীবনে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষা শুধু অতীতের নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক।

লেখা: শিক্ষক ও গবেষক।। 

শিক্ষাবার্তা /এ/০৪/১০/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.