নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ নারী শিক্ষার প্রতিষ্ঠান বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজকে সমন্বিত কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় করার সব ষড়যন্ত্র বন্ধ করা, কলেজের কোনো অবকাঠামো ব্যবহার না করে স্বতন্ত্র জায়গায় স্বতন্ত্র নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা এবং উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেন বেগম বদরুনেসা সরকারি মহিলা কলেজের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা বলেন, সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও প্রেক্ষাপট বেগম বদরুনেসা সরকারি মহিলা কলেজ ১৯৪০ সালে ইডেন কলেজের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে এটি পুরান ঢাকার বকশীবাজারে স্বতন্ত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ১৯৪৮ সাল থেকে কলেজটি উচ্চমাধ্যমিক কার্যক্রম শুরু করে এবং ১৯৬৮ সালে ডিগ্রী, পরে স্নাতক (অনার্স) ও কিছু ক্ষেত্রে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের একাডেমিক কার্যক্রমও চালু করে। কলেজটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের নারীর শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে আসছে এবং দেশের নারী শিক্ষাব্যবস্থায় বিশেষ অবদান রেখে চলেছে।
গত কয়েক বছরে রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজ (যার মধ্যে বেগম বদরুনেসা সরকারি মহিলা কলেজও রয়েছে) নিয়ে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাঠামো পরিবর্তনের আলোচনা হয়েছে। সর্বশেষ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে সাতটি কলেজকে নিয়ে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এতে আমাদের কলেজসহ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কাঠামো ও কার্যক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় আমরা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছি এবং গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।
শিক্ষার্থীদের মূল উদ্বেগসমূহ:
১) কলেজের স্বতন্ত্র পরিচয় ও ঐতিহ্য রক্ষা: বেগম বদরুনেসা সরকারি মহিলা কলেজ নারী শিক্ষার নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং সম্মানজনক স্থান হিসেবে খ্যাত। কোনো প্রকার পুনগঠন বা নাম-পরিবর্তনের ফলে কলেজের স্বতন্ত্রতা, লোগো, নামফলক ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। আমরা চাই- এই স্বকীয়তা অক্ষুন্ন থাকুক।
২) একাডেমিক কর্মসূচি ও সময়সুচি (টাইম-শেয়ারিং): অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উচ্চমাধ্যমিকের ক্লাস এবং দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস চলবে। অথচ আমাদের ইন্টারমিডিয়েটের ক্লাস কার্যত ২:৩০ পর্যন্ত চলে, বাবহারিক ক্লাস থাকলে আরও বেশি সময় লাগে। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম ও উচ্চমাধ্যমিক ক্লাস একই অবকাঠামো ভাগাভাগি করতে গিয়ে সংঘাত তৈরি হবে। আমরা এটিকে বাস্তবসম্মত মনে করি না। বিকল্প হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পৃথক ক্যাম্পাস বিবেচনা করা উচিত।
৩) ক্যাম্পাস-ভিত্তিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্ৰভাব: একই ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের কার্যক্রম চালু হলে রাজনৈতিক কার্যক্রম ও জনজট বেড়ে যাবে, যা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আমরা শান্তিপূর্ণ ও মনোযোগী শিক্ষার পরিবেশ চাই।
৪) স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও মালিকানার বিষয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী কলেজের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানায় যাবে। এর মানে হলো-আমাদের কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। আমরা এ ধরনের জোরপূর্বক হস্তান্তরের বিরোধিতা করছি। একইসাথে বলা হয়েছে, কলেজের অবকাঠামো ও সেবা ত্রিপক্ষীয় (শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কলেজ কর্তৃপক্ষ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চুক্তির মাধ্যমে যৌথভাবে ব্যবহার করা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে- আমাদের নিজস্ব অবকাঠামো ব্যবহারের জন্য কেন চুক্তি করতে হবে? অধ্যাদেশের কোথাও কলেজ কর্তৃপক্ষের শক্তিশালী অবস্থান নেই, তাই আমরা স্পষ্টভাবে উদ্বিগ্ন ।
৫) নারীর শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা সংকোচনের আশঙ্কা ইডেন ও বদরুনেসা দীর্ঘদিন ধরে নারী শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। নারীর জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী শিক্ষার সুযোগ ও পরিবেশ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখি, যা আমরা কখনোই মেনে নেব না।
৬) আইনগত অস্পষ্টতা ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ধারা ৩(১): বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস সময় দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা। কিন্তু আমাদের উচ্চমাধ্যমিকের ক্লাস ২:০০ পর্যন্ত চলে। এতে সংঘাত তৈরি হচ্ছে।
ধারা ৫(ঞ): বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে একাডেমিক মিউজিয়াম, ল্যাব, খুল, ডিসিপ্লিন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা, সম্প্রসারণ বা বিলোপ করতে পারবে। এতে কলেজ কর্তৃপক্ষের সম্মতির কোনো প্রয়োজন নেই। ভবিষ্যতে উচ্চমাধ্যমিকের ল্যাব বা পাঠাগার বন্ধ করে দেওয়া হলেও আমাদের কিছু বলার থাকবে না।
ধারা ৬(২): অবকাঠামো, সেবা ও কর্মীদের ব্যবহার যৌথভাবে চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এতে কলেজ দুর্বল দক্ষ হয়ে পড়বে। ধারা ১৯-২৫: বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাঠামোর বর্ণনায় কলেজ কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য বা ভূমিকা নেই।
ধারা ৩৮(১): বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। উপরন্ত, আমরা বলতে চাই যে- এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা কাঠামো পরিবর্তনের সময়ে সরাসরি সম্পর্কিত স্টেকহোল্ডার, বিশেষত উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মতামত নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এ পর্যন্ত এই আলোচনা-প্রক্রিয়ায় আমরা পর্যাপ্তভাবে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ পাইনি বলে মনে করি; যার ফলে শিক্ষার্থীদের। উদ্বেগ কার্যত উপেক্ষিত থেকে গেছে।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/২৫/০৯/২০২৫
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
