নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক কর্মচারীর (পরিচ্ছন্নতাকর্মী) বেতন বন্ধ ও বদলি করা নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সাধারণ প্রশাসন শাখায় কথা বলতে গেলে সাধারণ প্রশাসন শাখার সহকারী পরিচালক খালিদ হোসেন বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্তকে অশোভন আচরণ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের পক্ষ থেকে। এ বিষয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও মাউশি মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
গত সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) মাউশির সাধারণ প্রশাসন শাখায় নরসিংদী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক কর্মচারী (পরিচ্ছন্নতাকর্মী) রাজু দাসের বিষয়ে কথা বলতে গেলে নারীমুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্তকে মাউশির সহকারী পরিচালক খালিদ হোসেন অপমান ও অবমাননা করেন বলে অভিযোগ করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) মাউশির মহাপরিচালক বরাবর সীমা দত্ত লিখিত অভিযোগ দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, “গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে স্কুলে কর্মরত এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর প্রতি চলমান অনিয়ম ও অন্যায় বন্ধ করে তার প্রাপ্য পাওনা পরিশোধের আবেদন জানাতে আমি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খালিদ হোসেনের কাছে যাই। উক্ত কর্মকর্তা পরিচ্ছন্নতাকর্মী সম্প্রদায়কে নিয়ে তুচ্ছ ও অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য করেন, আমার সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন এবং আমাকে অপমান করে অফিস কক্ষ থেকে বের করে দেন”।
“আমি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও নিপীড়িত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অধিকার নিয়ে লড়াই করে আসছি। ঢাকার মিরনজিলা কলোনি রক্ষার আন্দোলনে আমি সাহসের সঙ্গে অংশ নিয়েছি। এই মানুষদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তাদের অধিকারের প্রশ্নে আমি সবসময়েই সোচ্চার থেকেছি এবং এখনও আছি। এরই অংশ হিসেবে নরসিংদী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (পরিচ্ছন্নতাকর্মী) রাজু দাসের ওপর চলতে থাকা অবিচার ও অন্যায়ের প্রতিকার চাইতে আমি গতকাল শিক্ষা ভবনে গিয়েছিলাম। কিন্তু ন্যায়বিচারের আশায় গিয়ে নিজেই অপমানের শিকার হলাম। অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (সাধারণ প্রশাসন) মো: খালিদ হোসেন দায়িত্বশীল পদে থেকেও আমাকে চরমভাবে অবমাননা করেছেন, গর্হিত মন্তব্য করেছেন এবং অশোভন আচরণ করেছেন। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তাঁর ভিন্ন বক্তব্য থাকতে পারে, কিন্তু এভাবে অপমান করে তিনি একজন নারীনেত্রী ও অধিকারকর্মীকে তো নয়ই, কোনো নাগরিককেও অফিস থেকে বের করে দিতে পারেন না। আমি প্রতিবাদ করলে খালিদ হোসেন ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে বলেন—“আপনি কি করতে পারেন আমি দেখবো।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজু দাস নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তিনি স্কুলটিতে ২০১৯ সাল থেকেই বিনা অনুমতিতে বিদ্যালয়টিতে উপস্থিত থাকতেনা না। সর্বপ্রথম ৩১ জানুয়ারি ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে তাকে শোকজ করেন নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সৈয়দা আক্তার। এরপর টানা একমাস বিদ্যালয়ে বিনা অনুমতিতে ছুটি কাটান। ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ খ্রিস্টাবে পুনরায় শোকজ করা হয়। ২০১৯ সালেই বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় একাধিকবার শোকজ করা হয়। অনুপস্থিত থাকা মাসগুলোর বেতন দাবি করলে নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি প্রধান শিক্ষককে মারতে উদ্ধত হন এবং বিদ্যালয়ে ময়লা আবর্জনা দিয়ে ভরে ফেলবে বলে হুমকি দেন। গত ১৯/০৯/২০১৯ তারিখে স্কুলের পক্ষ থেকে গেন্ডারিয়া থানায় এ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজু দাস দলিত সম্প্রদায়ের নেতা হওয়ায় ঢাকার তৎকালীন মেয়র ফজলে নুর তাপসের ক্ষমতা ব্যবহার করে একাধিকবার স্কুলের কর্মচারীদের বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখান। নিজের ইচ্ছে মত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন। পাঁচ আগস্টের আগ পর্যন্ত তাকে অন্তত এক ডজন শোকজ করা হয়। প্রধান শিক্ষকের সাথে অসাধাচারণের জন্য মাউশি থেকে তদন্তও করা হয়। পাঁচ আগস্ট পরবর্তীতে নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সৈয়দা আক্তার মাউশির মহাপরিচালক বরাবর ৩ অক্টোবর ২০২৫ ইং তারিখে তাকে বদলির জন্য আবেদন করেন। সে প্রেক্ষিতে ১৫ অক্টোবর তাকে বদলি করা হয়।
নরসিংদী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করা হলে তিনি সেখানেও উপস্থিত হননি। নরসিংদী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) রমজান আলী সরকার তাকে চার বার শোকজ করেন। এবং সর্বশেষ ১৫ এপ্রিল ২০২৫ ইং তারিখে তাকে বদলি এবং তদস্থলে অন্য একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী দেওয়ার জন্য মাউশি মহাপরিচালকের বরাবর আবেদন করেন।
এ বিষয়ে সাধারণ প্রশাসনের কর্মচারীরা জানান, এই ফাইল নিয়ে সীমা দত্ত একাধিকবার দপ্তরে দলবল নিয়ে এসেছেন। তাকে বলা হয়েছে কিন্তু তিনি সর্বশেষ সোমবার পুনরায় দলবল নিয়ে দলিত সম্প্রদায়ের প্রতি অনাচার বলে রাজু দাসের বিরুদ্ধে অনাচার করা হচ্ছে উল্লেখ করে নিজেই শোরগোল করেন। রাজু দাসের বেতন কেন বন্ধ সে বিষয়ে কৈফিয়ত তলব করেন। তাকে বার বার বুঝানো হয়েছে বেতন দেওয়া না দেওয়ার বিষয়ে প্রধান শিক্ষক এবং এজি অফিসের বিষয় মাউশির সাধারণ প্রশাসন শাখার কোনো কিছু করার নেই তারপরেও তিনি দেখা নেওয়ার হুমকি দেন এবং পরবর্তীতে উল্টো সহকারী পরিচালক স্যারের বিরুদ্ধেই অভিযোগ তোলেন।
জানতে চাইলে মাউশির সহকারী প্রশাসন (সা.প্র.) খালিদ হোসেন শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, পরিচ্ছন্নতা কর্মী রাজু দাসের বেতন বন্ধের বিষয়টি আমার দেখার বিষয় নয়। আমি তাদেরকে বুঝালে তারা তা শুনতেই রাজী হননি। একাধিকবার দলবল নিয়ে এখানে এসেছেন উল্টো আমাকে দেখে নেবেন বলে হুমকি দিয়েছেন। নারিন্দা স্কুলে তাকে একাধিকবার শোকজ করা হয়েছে, তিনি প্রধান শিক্ষকের সাথে মারমুখো আচরণ করেছেন। প্রধান শিক্ষকের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে নরসিংদীতে বদলি করা হলেও সেখানেও তিনি উপস্থিত হননি। চার বার তাকে শোকজ করা হয়েছে, সর্বশেষ নরসিংদীর প্রধান শিক্ষক ও ডিজি বরাবর তার বদলির জন্য আবেদন দিয়েছেন। আমার বিরুদ্ধে সীমা দত্ত যে অভিযোগ করেছেন আপনি রাজু দাসের ফাইল দেখলেই বুঝবেন আমি ঐদ্ধত আচরণ করেছি কি না।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
