নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: রাজধানীর সাত সরকারি কলেজের সমন্বয়ে প্রস্তাবিত ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এবার উদ্বেগ জানিয়েছেন বেগম বদরুন্নেসা সরকারি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। নারী শিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় করার সব ষড়যন্ত্র বন্ধ করা, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের কোনো অবকাঠামো ব্যবহার না করে স্বতন্ত্র জায়গায় স্বতন্ত্র নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা দাবি জানান তারা।
মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বদরুন্নেসার সরকারি কলেজের সামনের রাস্তায় সামনে স্মারকলিপি প্রদান ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে উদ্বেগ এবং পাঁচ দফা দাবির কথা জানান তারা। এর আগে সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।
সাত কলেজকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় করার প্রতিবাদে মঙ্গলবার কলেজ ক্যাম্পাসে অবস্থান কর্মসূচি পালন শেষে অধ্যক্ষের মাধ্যমে স্মারকলিপি দিয়ে নিজেদের পাঁচ দফা দাবির কথা তুলে ধরেন বেগম বদরুন্নেসা সরকারি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। ‘কলেজের স্বতন্ত্র কাঠামো ও ঐতিহ্য নষ্ট করে আসন্ন ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নামে নীতিমালা বা অধ্যাদেশ বা আইন জারির চেষ্টা, উচ্চশিক্ষা সংকোচন, নারী উচ্চ শিক্ষা সংকোচন এবং শিক্ষাকে বাণিজ্যকরণের প্রতিবাদে’ এ কর্মসূচি পালিত হয়। অবস্থান কর্মসূচি থেকে ‘কলেজ কেন বিশ্ববিদ্যালয় হবে জবাব দাও, জবাব চাই, নারী শিক্ষা সংকোচন চেষ্টা রুখে দাও’ ইত্যাদি স্লোগান দেয় ছাত্রীরা।

অবস্থান কর্মসূচীতে বদরুন্নেসা মহিলা কলেজের উচ্চমাধ্যমিক স্তরের ছাত্রীরা জানিয়েছে, ঐতিহ্যবাহী সাতটি কলেজকে একত্র করে ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ করার ঘোষণা আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হলেও শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে এ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, সিদ্ধান্তটি কি আসলেই শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন ঘটাবে, নাকি উল্টো দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি জনবান্ধব শিক্ষাপ্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে? শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। উচ্চমাধ্যমিক রেখে বিশ্ববিদ্যালয় কতটুকু যুক্তিযুক্ত হবে সেটাও বিবেচনায় আনা হয়নি। সরকার যদি চায় নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে পারবে কিন্তু সক্ষমতা থাকলে একটি ঐতিহ্য বা শতবর্ষী কলেজ সৃষ্টি করে দেখাক।

শিক্ষার্থীদের পাঁচ দফা দাবি
- বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজকে ‘হাইব্রিড’ বানানোর অপচেষ্টা থেকে সরে আসতে হবে।
- নারী শিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় করার সব ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে হবে। সে জন্য বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের কোনো অবকাঠামো ব্যবহার না করে স্বতন্ত্র জায়গায় স্বতন্ত্র নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
- উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় একসঙ্গে চলতে পারে না। এতে উচ্চমাধ্যমিক বা বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সে জন্য বেগম বদরুন্নেসাকে কলেজকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা বন্ধ করতে হবে।
- ‘হাইব্রিড’ বিশ্ববিদ্যালয় নই, হাই কোয়ালিটি স্বতন্ত্র জায়গায় গবেষণা ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় করা হোক।
- শিক্ষার মানোন্নয়নে বেগম বদরুন্নেসার সরকারি মহিলা কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন সুবিধা বৃদ্ধি, যাতায়াত সুবিধা বৃদ্ধিতে বাস বাড়াতে হবে।
গত বুধবার (১৮ সেপ্টম্বর) ঢাকার এ সাতটি কলেজের কয়েকশ শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সামনে মানববন্ধন করেন এবং ইউজিসি চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি জমা দেন।
অপরদিকে, প্রস্তাবিত কাঠামোয় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় করতে দ্রুত অধ্যাদেশ জারির দাবিতে আন্দোলন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে আন্দোলন করে আসা শিক্ষার্থীদের একাংশ।
গত আগস্টে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, প্রস্তাবিত ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত কলেজকে চারটি স্কুলে ভাগ করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা ব্যবস্থা হবে ‘ইন্টার ডিসিপ্লিনারি’ ও ‘হাইব্রিড ধরনের’। সেখানে ৪০ শতাংশ ক্লাস অনলাইনে ও ৬০ শতাংশ ক্লাস অফলাইনে হবে ৷ তবে সব পরীক্ষা হবে সশরীরে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি কলেজগুলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। আর আগে কলেজগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার পর নানা সমস্যা দেখা দিলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত জানুয়ারিতে কলেজগুলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্তি থেকে বাদ দেয়। এরপর নতুন বিশ্ববিদ্যালয় করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি সরকার ঢাকার সাতটি ঐতিহ্যবাহী কলেজকে একত্র করে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। ঘোষণাটি আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হলেও শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে এ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, সিদ্ধান্তটি কি আসলেই শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন ঘটাবে, নাকি উলটো দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি জনবান্ধব শিক্ষাপ্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে? ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও সরকারি বাংলা কলেজ-এ সাতটি প্রতিষ্ঠান বহু বছর ধরে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার প্রধান ভরসা। বর্তমানে প্রায় দেড় লক্ষাধিক শিক্ষার্থী এ কলেজগুলোতে অধ্যয়নরত। স্বল্প খরচে অনার্স ও মাস্টার্সে পড়ার সুযোগ দিয়ে এ কলেজগুলো শুধু শিক্ষার কেন্দ্র নয়, বরং সামাজিক উন্নতির এক সোপান হয়ে উঠেছে। এ বাস্তবতায় সাত কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার পরিকল্পনা নিয়ে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে।
প্রথমত, ঢাকায় শিক্ষার্থীর চাপ এমনিতেই চরমে। স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির প্রতিযোগিতা এত তীব্র যে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বহু শিক্ষার্থী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা পান না। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত কারণে ভর্তি আসন সীমিত হয়ে গেলে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ উচ্চশিক্ষার বাইরে থেকে যাবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হবে এবং বৈষম্য বাড়বে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, কারণ ইডেন ও বদরুন্নেসা মহিলা কলেজের আসনসংখ্যা হ্রাস পেলে, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে।
দ্বিতীয়ত, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলে, শিক্ষকদের পদ-পদবি ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে একদিকে শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তায় পড়বেন, অন্যদিকে একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যেসব শিক্ষার্থী স্বল্পব্যয়ে এ কলেজগুলোতে পড়াশোনা করতে পারতেন, তারা বাধ্য হবেন ব্যয়বহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ঝুঁকতে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি হবে অসহনীয় বোঝা।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
