এইমাত্র পাওয়া

সরকারি স্কুলের দায়িত্ব ফাঁকি দিয়ে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে সময় দিচ্ছেন শিক্ষক

শেরপুর: শেরপুর সদর উপজেলার কামারিয়া ইউনিয়নের আন্দারিয়া সুতিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতায় শিক্ষার মান মারাত্মকভাবে নেমে গেছে। একসময় প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০২ জনে। এর মধ্যে বালক ৪৫ ও বালিকা ৫৭ জন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৬৯ জন শিক্ষার্থী। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু সহকারী শিক্ষক আল আমিন (সুহেল)।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন (সুহেল) নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত হন না। সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে বিকেল সোয়া ৪টা পর্যন্ত শিক্ষকের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হলেও তিনি প্রায়ই সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে আসেন। অথচ অ্যাটেনডেন্স খাতায় সকাল ৯টার স্বাক্ষর দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

একই সঙ্গে তিনি শেরপুর শহরের বটতলায় ‘জিদনি মডেল স্কুল’ নামে একটি ব্যক্তিগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী অন্য কোনো পেশায় সম্পৃক্ত থাকার বিধান নেই। এলাকাবাসীর দাবি, গত ১২ বছর ধরে তিনি নিজের স্কুলে নিয়মিত সময় দিচ্ছেন, অথচ সরকারি বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মুস্তুফা কামাল বলেন, “এই স্কুলের শিক্ষকেরা সঠিক সময়ে আসেন না। সুহেল মাস্টার স্কুলে দুই-তিন ঘণ্টা থেকে চলে যান। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে, দিন দিন ছাত্রছাত্রী কমে যাচ্ছে।”

বিদ্যালয়ের জমিদাতা, স্কুলের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সদস্য আব্দুল খালেক বলেন, “আমরা যে স্কুলের জন্য জমি দিয়েছি, সেখানে শিক্ষকদের অনিয়মে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। দুই বছর আগে এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি।”

কামারিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুস সালাম বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকরা নিয়ম মানছেন না। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তেমন কোনো নজরদারি নেই।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষিকা জানান, গত ৫ আগস্টের আগে অভিযুক্ত শিক্ষক নিজের বদলে একজন প্রাইভেট শিক্ষক দিয়ে ক্লাস নিতেন এবং বিনিময়ে তাকে কিছু পারিশ্রমিক দিতেন।

আইনজীবীর মতামত

শেরপুর জজকোর্টের আইনজীবী আলমগীর কিবরিয়া কামরুল বলেন, “সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী ওই শিক্ষককে সঠিক সময়ে স্কুলে উপস্থিত থেকে পাঠদান করাতে হবে। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তা সরকারি বিধিমালার লঙ্ঘন। অভিযোগ সত্য হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের উচিত ব্যবস্থা নেওয়া।”

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “সুহেল স্যার সাধারণত সকাল ১১টার দিকে স্কুলে আসেন। এতে আমাদের কোনো সমস্যা হয় না।” দেরিতে স্কুলে আসার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি।

ব্যক্তিগত জিদনি মডেল স্কুলের তথ্য

সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে স্কুল পরিদর্শনে গেলে জিদনি মডেল স্কুলের বাংলা শিক্ষিকা ঝিনুক সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের এই স্কুলের পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন (সুহেল)। তিনি গত ১২ বছর ধরে এই স্কুলটি পরিচালনা করছেন। বর্তমানে এখানে শিক্ষক সংখ্যা ২২ জনের অধিক। এখানে প্লে থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী পড়ছে। আমি নিজেও অনেক বছর ধরে এখানে শিক্ষিকা হিসেবে আছি।”

জিদনি মডেল স্কুলের দপ্তরি শক্তি নন্দি জানান, “পরিচালক সাহেব সকালে সাড়ে ১০টার দিকে সরকারি স্কুলে যাওয়ার জন্য বের হন। পরে আবার ফিরে এসে স্কুলের তদারকি করেন।”

প্রশাসনের বক্তব্য

শেরপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সাইদুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, “আপনার মাধ্যমে এ তথ্য জানলাম। স্কুলগুলোতে শিক্ষকদের অনিয়ম নিয়ে আমি নিজেও কাজ করছি। যদি সত্যিই এমন অনিয়ম হয়ে থাকে, তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অভিযুক্ত শিক্ষকের প্রতিক্রিয়া

১৭ সেপ্টেম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে সাংবাদিকরা গেলে শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল আমিন (সুহেল) সকাল ১১টা ১৩ মিনিটে স্কুলে উপস্থিত হন। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমি দেরিতে এলেও সঠিকভাবে ক্লাস নিই, শিক্ষার্থীদের কোনো ক্ষতি হয় না।” তবে ব্যক্তিগত স্কুল পরিচালনার অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/২৩/০৯/২০২৫


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.