মো: তরিকুল আলম: মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এর অধীনে পরিচালিত একটি উল্লেখযোগ্য ও সফল প্রকল্প হচ্ছে সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (সেসিপ)। প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় পরিচালিত এই প্রকল্পটি মাধ্যমিক স্তরে দীর্ঘমেয়াদি ভাবে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার মান(Quality), কার্যকারিতা(Efficiency) ও সাম্য (Equity) বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মাধ্যমিক শিক্ষার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফলতা অর্জন করেছে যা বিভিন্ন শিক্ষা গবেষণায় উঠে এসেছে।
আধুনিক শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করে(জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০১২) নতুন পাঠ্যপুস্তক ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা চালু,শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল কনটেন্ট এর ব্যবহার, স্কুলে ল্যাবরেটরি স্থাপন, আইসিটি ও অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও শিক্ষা তথ্য ব্যাংক চালু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদের জন্য উপবৃত্তি কর্মসূচি গ্রহণ, কন্যাশিক্ষা ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রদান এবং চর এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে সেসিপ সফল ভূমিকা পালন করে।
এগুলোর পাশাপাশি এই প্রকল্পের একটি যুগোপযোগী উদ্যোগ হচ্ছে-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও ফলাফল বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে শিক্ষক নিয়োগ এবং কর্মমুখী শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষা ধারায় সংযুক্ত করনের জন্য ৬৪০ টি প্রতিষ্ঠানে দুইজন করে ট্রেড ইন্সট্রাক্টর নিয়োগ।
সফলতায় শীর্ষে থাকা সেসিপ প্রকল্পের নিরীহ ও অভিভাবকহীন একটি শিক্ষক সম্প্রদায় হচ্ছে রিসোর্স শিক্ষক (আর টি)। সরকারের এসডিজি ৪ লক্ষ্যমাত্রা “সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা” অর্জনের লক্ষ্যে ২০১৭সালে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এর অধীনে পরিচালিত সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম এর আওতায় ১০০০ জন( ইংরেজি, বিজ্ঞান ও গণিত)বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। সরকারি নিয়োগ বিধি অনুসরণ করে ২০১৮ সালে প্রতিযোগিতা ও মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য যে উক্ত শিক্ষকরা ১৩/০৩/২০১৮তারিখ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে যোগদান করেন এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজ নিজ জেলা শিক্ষা অফিস ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস কে অবহিত করে বদলিভিত্তিক পদায়নকৃত মাধ্যমিক স্কুল ও মাদ্রাসা সমূহে পুনরায় যোগদান করেন।
সেসিপ প্রকল্পে নিয়োগকৃত অধিকাংশ আরটি শিক্ষকরা শিক্ষাজীবনে ন্যূনতম তিনটি স্তরে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন ও চাকরি কালীন সময়ে বিএড ডিগ্রি সম্পূর্ণ করে এমএড ডিগ্রিতে অধ্যানরত রয়েছেন যা তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
মাধ্যমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে সেসিপ প্রকল্পের ভূমিকা ও মাঠ পর্যায়ে এর জনবল কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে অন্তবর্তীকালিন সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড: মোঃ ইউনুস মহোদয়ের সভাপতিত্বে ২০/০৪/২৫ তারিখ একনেক বৈঠকে এর মেয়াদ ৩১/১২/২০২৬ তারিখ পর্যন্ত অনুমোদিত হয় । একনেক বৈঠক শেষে মাননীয় পরিকল্পনা উপদেষ্টা জনাব ড: ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ মহোদয় উল্লেখ করেন সেসিপ প্রকল্পের প্রায় দুই হাজার জনবলের চাকরি রাজস্বকরনের প্রক্রিয়া চলমান আছে। এতে প্রকল্পের সকল জনবলের মধ্যে উদ্যোম সঞ্চারিত হয়।
রিসোর্স শিক্ষকদের এমপিও এর উদ্যোগ ২০১৯ সালে আইনগত জটিলতায় ব্যর্থ হলে আরটি শিক্ষকদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র কর্মকর্তাদের ১১৮৭ পদ রাজস্ব করণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় যার প্রক্রিয়া বর্তমানেও বিদ্যমান। গত ১৫ জুন ২০২৫ ইং তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় চিপ একাউন্টস এন্ড ফিন্যান্স অফিসার, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর একটি আদেশ জারি করে উক্ত আদেশে পুনরায় রিসোর্স শিক্ষকদের উপেক্ষা করে পূর্বের ১১৮৭ পদের সঙ্গে আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে নিয়োগকৃত ১৪০ জন কর্মচারী সহ মোট ১৪৮৭ টি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদের মেয়াদ সংরক্ষণের সরকারি আদেশ জারি হয়। যা বর্তমান সরকারের বৈষম্যহীন নীতির সাথে সাংঘর্ষিক। এতে করে আরটি শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা এবং চাকরি হারানোর ভয় বিরাজ করছে।
প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সর্বনিম্ন স্তরে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং সরাসরি মাঠ পর্যায়ে শিক্ষার মান উন্নয়নে নিয়োজিত রিসোর্স শিক্ষকরা উক্ত প্রকল্পের সফলতার অন্যতম দাবিদার। রিসোর্স শিক্ষকরা পদায়নকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, একাডেমিক সুপারভাইজার ও প্রতিষ্ঠান প্রধানের নির্দেশনায় নিজ চাকরিবিধি অনুসরণ করে অভিভাবকদের সাথে পরামর্শ ক্রমে, ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে প্রেষণা তৈরি ও শিখন -শিখানো কার্যাবলী পরিচালনার পাশাপাশি শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করে। রিসোর্স শিক্ষকদের উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে উপজেলায় মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে অংশগ্রহণ,শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়া রোধ ও বাল্যবিবাহ দূরীকরণে সচেতনতা বৃদ্ধি,কোচিং বাণিজ্যকে নিরুৎসাহিত করা, মাদক বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাস গ্রহণ, শিক্ষার্থীদের সহকার্যক্রমভিত্তিক জ্ঞান অর্জন, শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশ, দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজন, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে পাঠদান , শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানাগার বিষয়ে আগ্রহী করা, সপ্তাহভিত্তিক ইংলিশ স্পীকিং ক্লাস,নৈতিকতা মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্বের বিকাশ, বিদ্যালয়ে শিখন-শেখানো পরিবেশ আধুনিকায়নে ভূমিকা পালন ও মাউশির নির্দেশিত কর্মসূচী বাস্তবায়ন। শিক্ষার মান উন্নয়নে সফলতার প্রমাণ দেয়া সত্বেও রিসোর্স শিক্ষকরা বার বার বঞ্চিত হচ্ছেন।
২০১৯ সালে তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো: জাবেদ আহমেদ স্যারকে কমিটির প্রধান করে সেসিপ প্রকল্পের রিসোর্স শিক্ষকদের এমপিও ভুক্ত করনের লক্ষ্যে শর্তাবলী ও আর্থিক সংশ্লেষসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাঠাতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় । উক্ত প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন যেহেতু রিসোর্স শিক্ষকদের অনেকেরই শিক্ষক নিবন্ধন সনদ নেই তাই প্রচলিত বিধান অনুযায়ী তাদের এমপিও ভুক্ত করার কোনো সুযোগ নেই এবং এই শিক্ষকদেরকে পরবর্তী রাজস্ব প্রকল্পে স্থানান্তরের জন্য তিনি প্রস্তাব পেশ করেন। আরটি শিক্ষক নিয়োগে শিক্ষক নিবন্ধন সনদের বাধ্যবাধকতা না থাকা এবং পরবর্তী প্রকল্পে এসিটি কম্পনেন্ট থাকা সত্ত্বেও এই প্রস্তাব কোন অজানা কারণে আলোর মুখ দেখেনি। পরবর্তীতে এমপিও ভুক্তির জটিলতা এড়ানোর জন্য সেসিপ এনটিআরসিএ এর মাধ্যমে ৬৪০টি সাধারণ শিক্ষা ধারার প্রতিষ্ঠানে ২ জন করে ট্রেড ইন্সট্রাক্টর নিয়োগ দেয় যারা এমপিও ভুক্ত হয়ে স্থায়ীভাবে চাকরিরত রয়েছেন। বর্তমানে রিসোর্স শিক্ষকদের কে উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে এমপিও ভুক্ত করনের আইনগত জটিলতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে কেননা উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইতোমধ্যে এনটিআরসিএ সুপারিশের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে।
সেসিপ প্রোজেক্টের একই নীতিমালা অনুসরণে নিযুক্ত(প্রজেক্ট মেয়াদকালীন সময়ের জন্য ) শুধুমাত্র কর্মকর্তা কর্মচারীদের গুরুত্বপূর্ণ১৪৮৭ টি পদ রাজস্ব ভুক্ত হবে আর রিসোর্স শিক্ষকরা চাকরি হারাবে তা ৫ই আগস্ট২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশে কোনভাবেই কাম্য নয়।
১৪২টি উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ৩০০ জনের মতো রিসোর্স টিচার কর্মরত রয়েছেন তাই উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সেসিপ প্রকল্পের শূন্য পদগুলোতে পদোন্নতি ভিত্তিতে পদায়ন, শিক্ষক সংকটে থাকা সদ্য জাতীয়করণকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পদ সৃষ্টি বা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে পদ সৃজন করে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। রিসোর্স শিক্ষকদের চাকরির সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে প্রকল্পের শিক্ষকরা যেমন সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে ঠিক তেমনি প্রকল্পের সফলতা কুলুষিত হবে।
সেসিপ প্রকল্পের রিসোর্স শিক্ষকদের অভিভাবক হিসাবে ও শিক্ষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মাননীয় শিক্ষা উপদেষ্টা মহোদয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় সচিব মহোদয়, প্রোগ্রাম পরিচালক মহোদয় ও যুগ্ম প্রোগ্রাম পরিচালক মহোদয়ের মানবিক সহযোগিতা কামনা করছি।
লেখক: রিসোর্স শিক্ষক (ইংরেজি), সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম
Email:rocky88iu@gmail.com
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/২৩/০৮/২০২৫
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
