সফিউল্লাহ লিটন, ভালুকা, ময়মনসিংহ।।
ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার পাড়াগাঁও গ্রামের এক প্রবাস ফেরত কৃষক আব্দুল মোতালেব বর্তমানে পরিচিত “খেজুর মোতালেব” নামে। জীবিকার সন্ধানে তিনি ১৯৯৮ সালে পাড়ি জমান সৌদি আরবে, সেখানে আল কাসিম শহরের একটি খেজুর নার্সারিতে কাজ শুরু করেন। কিন্তু প্রবাস জীবনের ক্লান্তি ও নিজের দেশে কিছু করে দেখানোর অদম্য ইচ্ছা তাকে দেশে ফিরে আসার সাহস দেয়। ২০০০ সালে বকেয়া বেতন না পেয়েই তিনি ফিরে আসেন নিজের মাটিতে, কিন্তু সঙ্গে নিয়ে আসেন নতুন এক স্বপ্ন ; ৩৫ কেজি সৌদি খেজুরের বীজ।

২০০১ সালে মাত্র ৭০ শতাংশ জমিতে সৌদি খেজুর চাষ শুরু করেন মোতালেব। শুরুতে অনেকে তাকে পাগল বললেও, কঠোর পরিশ্রম ও ধৈর্য নিয়ে এগিয়ে যান তিনি। আজ তার সফলতার গল্পই অন্যদের অনুপ্রেরণা। বর্তমানে তিনি তিনটি খেজুর বাগানের মালিক, যেখানে রয়েছে ৩,০০০-এরও বেশি খেজুর গাছ। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ গাছে নিয়মিত খেজুর ধরে।
তার বাড়ির পাশে স্থাপিত “মোফাজ্জল-মিজান সৌদিয়া খেজুর বাগানে” গেলে দেখা যায় সারি সারি খেজুর গাছে ঝুলছে পাকা ও আধা-পাকা কাঁদি। খেজুরের কাঁদি রক্ষা করতে প্রতিটি কাঁদি ঢেকে দেওয়া হয়েছে নীল পলিথিনে। তার বাগানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সৌদি খেজুর, যেমন—আজুয়া, আমবাগ, সুকারী, বরকি এবং লিপজল। প্রতিটি গাছে গড়ে ৫-১০টি কাঁদি ধরে এবং প্রতি কাঁদি থেকে ২০–২৫ কেজি পর্যন্ত খেজুর পাওয়া যায়।
বাজারে এসব খেজুরের কেজি প্রতি দাম ১,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। প্রতি বছর জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে কাঁদি সংগ্রহ শুরু হয়। শুধু ফল উৎপাদন নয়, খেজুরের চারা বিক্রির মাধ্যমেও মোতালেব অর্জন করেছেন আর্থিক সচ্ছলতা। ছোট চারার দাম ৫০০–১,০০০ টাকা এবং ফলধারী গাছের দাম ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ওঠে।
এই আয় দিয়েই তিনি মাটির ঘর থেকে উঠে এসেছেন দ্বিতল পাকা বাড়িতে, কিনেছেন ৬ বিঘা জমি। বড় ছেলে মোফাজ্জল প্রবাসে থাকলেও ছোট ছেলে মিজান বাবার পথ অনুসরণ করে আরও দুটি খেজুর বাগান গড়ে তুলেছেন।
তবে দুঃখজনকভাবে এত সাফল্যের পরেও তিনি এখনো কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। খেজুর প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে তাকে পাঁকা খেজুর সরাসরি বিক্রি করতে হয়। মোতালেব বিশ্বাস করেন, সরকারি সহায়তা পেলে খেজুর প্রক্রিয়াজাত করে দেশীয় বাজারে ও রপ্তানিতে বড় ধরনের অবদান রাখা সম্ভব।
আব্দুল মোতালেব প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া সৌদি খেজুর চাষের জন্য উপযোগী। তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ইতিমধ্যে পাড়াগাঁও গ্রামে গড়ে উঠেছে আরও চারটি খেজুর বাগান।
তার সাহসিকতা, পরিশ্রম ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত। খেজুর মোতালেব এখন শুধু একজন কৃষক নন, বরং এক যুগান্তকারী উদ্যোক্তার নাম।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
