বামে এস এম আব্দুল্লাহ আল মামুন ও ডানে মোঃ শফিকুল ইসলাম। ছবিঃ সংগৃহীত

১০ বছর কর্মরত প্রভাষককে বাদ দিয়ে ভিন্ন কলেজের শিক্ষক এনে এমপিওভুক্তিকরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ শেরপুরের শ্রীবর্দী উপজেলার কাকিলাকুড়া মালেকুননিসা হজরত আলী কলেজ প্রতিষ্ঠা হয় ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রভাষক (পৌরনীতি ও সুশাসন)  পদে নিয়োগ পান এস এম আব্দুল্লাহ আল মামুন। আশায় ছিলেন নন এমপিও  এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি একদিন এমপিওভুক্ত হলে তার বেতন-ভাতা চালু হবে। সেই আশাতেই প্রায় টানা দশ বছর নিয়মিত ক্লাস পরীক্ষা নিয়েছেন। ঝড়বৃষ্টিতেও ফাঁকি দেননি কলেজ। অবশেষে কলেজটি এমপিওভুক্ত হয় ২০২২ সালে। তবে এমপিওভুক্ত হতে পারেননি তিনি। তাকে বাদ দিয়ে তার স্থলে অন্য একটি নন এমপিও কলেজের শিক্ষক এনে ব্যাকডেটে নিয়োগ দেখিয়ে মোটা অংকের অর্থে বিনিময়ে শতভাগ জালিয়াতি করে এমপিওভুক্ত করান প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি ও তৎকালীন অধ্যক্ষ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এস এম আব্দুল্লাহ আল মামুন পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ের প্রভাষক পদে ২০১৩ সালে যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ নিয়ে ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটিতে যোগদান করেন। ২০২২ সালের ৬ জুলাই সরকার ১০৯টি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ এমপিওভুক্ত ঘোষণা করে। ১০৯ টি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের একটি হচ্ছে কাকিলাকুড়া মালেকুননিসা হজরত আলী কলেজ। ৬ জুলাই কাকিলাকুড়া মালেকুননিসা হজরত আলী কলেজ এমপিও ঘোষণা হবার পর ১৪ জুলাই কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা এস এম আব্দুল খালেক ও তৎকালীন অধ্যক্ষ মোঃ সাইদুর রহমান এস এম আব্দুল্লাহ আল মামুনকে মৌখিকভাবে প্রতিষ্ঠানটিতে যেতে নিষেধ করেন। পরবর্তীতে তাকে কলেজটিতে প্রবেশ করতে না দিয়ে শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতি উপজেলার আলহাজ্ব হাজেরা আক্তারুজ্জামান কলেজে কর্মরত পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ের প্রভাষক মোঃ শফিকুল ইসলামকে মোটা অংকের অর্থের মাধ্যমে এস এম আব্দুল্লাহ আল মামুনের পদে বিধিবর্হিভুতভাবে নিয়োগ দেন এবং পরবর্তীতে এমপিওভুক্ত করান। 

ব্যাকডেটে নিয়োগ ঠেকাতে সরকার ২০১৩ সাল থেকে প্রতিবছর শিক্ষকদের হালনাগাদ তথ্য বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)তে আবশ্যিকভাবে জমা নেন এবং অনলাইনে তা প্রকাশ করেন। ব্যানবেইসে এমপিও টিচার ভ্যারিফাইড অপশন থেকে প্রতিবছর শিক্ষক-কর্মচারীদের হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়। ২০১৪ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এস এম আব্দুল্লাহ আল মামুন ব্যানবেইসের সরকারি তথ্যমতে কাকিলাকুড়া মালেকুননিসা হজরত আলী কলেযে কর্মরত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির হাজিরা খাতা, অফলাইন জরিপ এবং ২০২০ সালে সরকার নন এমপিও শিক্ষকদের করোনাকালীন ভাতা বাবাদ অর্থ প্রদান করে সেই অর্থ তিনি পেয়েছিলেন এবং সে ভাতাতেও তার নাম রয়েছে। অন্যদিকে মোঃ শফিকুল ইসলাম ২০১৫ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আলহাজ্ব হাজেরা আক্তারুজ্জামান কলেজে পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ের প্রভাষক পদে কর্মরত ছিলেন তার তথ্য ব্যানবেইসে রয়েছে। অর্থ্যাৎ ব্যানবেইসের তথ্যমতে মোঃ শফিকুল ইসলাম বিধিবহির্ভুতভাবে ব্যাকডেটে নিয়োগ দেখিয়ে এস এম আব্দুল্লাহ আল মামুনের পদে ২০২২ সালে যোগদান এবং পরবর্তীতে এমপিওভুক্ত হোন তা সহজেই প্রমাণ মেলে। 

২০২২ সালে সরকার  ২ হাজার ৭১৬ বেসরকারি নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত ঘোষণা করার পর শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যক্তি পর্যায়ের এমপিওভুক্তিতে বেকডেটে নিয়োগ ঠেকাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ বিভাগের সচিব মো. সোলেমান খান স্বাক্ষরিত একটি পরিপত্র জারি করা হয়। পরিপত্রে বলা হয়, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান বা স্তর এমপিও কোড পাওয়ার পর ব্যক্তি এমপিওর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই বাছাই করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর ব্যক্তি এমপিওভুক্তির সময় আগে নিয়োগকৃত শিক্ষক-কর্মচারীকে বাদ দিয়ে পূর্ববর্তী তারিখ ও স্মারক ব্যবহার করে অন্য কোনো শিক্ষক-কর্মচারীকে নিয়োগ দেখিয়ে এমপিওভুক্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এ অবস্থায় শিক্ষক কর্মচারীর ব্যক্তি এমপিওভুক্তির আবেদন যাচাই বাছাইয়ের সময় সংশ্লিষ্ট দপ্তর কর্তৃক প্রতিটি ধাপে (উপজেলা, জেলা, অঞ্চল অধিদপ্তর পর্যায়ে) ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ব্যানবেইসে অনলাইনে সংগৃহীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীদের ডাটাবেইসে সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে আবশ্যিকভাবে ব্যক্তি এমপিওভুক্তির জন্য দাখিলকৃত তথ্য তুলনামূলক যাচাই বাছাই করতে হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে এস এম এস এম আব্দুল্লাহ আল মামুনের স্থলে মোঃ শফিকুল ইসলামকে এমপিওভুক্ত করান কাকিলাকুড়া মালেকুননিসা হজরত আলী কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন অধ্যক্ষ। মোটা অংকের অর্থের মাধ্যমে নীতিমালাকে তোয়াক্কা না করে কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন অধ্যক্ষের যোগসাজসে বিনা বাধায় মোঃ শফিকুল ইসলামকে এমপিওভুক্ত করান মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার ময়মনসিংহ অঞ্চলের তৎকালীন পরিচালক। 

কলেজের প্রভাষক (পৌরনীতি ও সুশাসন) এস এম আব্দুল্লাহ আল মামুন শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, প্রতিষ্ঠাকাল (২০১৩ সাল) থেকে এই কলেজে শিক্ষকতা করে আসছি। ২০২২ সালে কলেজটি এমপিওভুক্ত হওয়ার পর হঠাৎ করে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আবদুল খালেক আমাকে কলেজ থেকে বের করে দেন। আমার স্থলে অন্য একটি কলেজে কর্মরত শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করান। আমি এ বিষয়ে একাধিক জায়গায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছি কিন্তু কেউ কোন ব্যবস্থা নেয়নি। আমার সকল বৈধ কাগজ এবং সরকারি দপ্তরে আমার নাম থাকলেও সরকারি খাতায় এই কলেজের তালিকায় যার কোন নাম নেই তিনিই এখানে চাকরি করছেন ও বেতন নিচ্ছেন অথচ দশ বছর নন এমপিও শিক্ষক হিসেবে চাকরি করে এখন আমি পথে পথে ঘুরছি। 

এদিকে আদালত সূত্রে জানা গেছে, শফিকুল ইসলাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারি শিক্ষককে হত্যা মামলায় দুই নম্বর আসামী হয়ে গত ৯ অক্টোবর ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫ মে ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত জেলে থাকলেও এই সময়ের কলেজটি থেকে জেলাথাকাকালীন পুরো সময়ের বেতন-ভাতা উত্তোলন করেন। নীতিমালা অনুযায়ী কোনো শিক্ষক কোন মামলায় জেল হাজতে থাকলে জেল হাজতে থাকাকালীন সময়ে তিনি সাময়িক বরখাস্ত থাকবে। অথচ টানা সাত মাস জেলে থাকলেও তাকে সাময়িক বরখাস্ত তো করায় হয়নি অপরদিকে এই সময়টার বেতন-ভাতা জামিনে বের হয়ে এসে একসাথে উত্তোলন করেন।

এ বিষয়ে জানতে শফিকুল ইসলাম শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আমি জেলে থাকাকালীন সময়ে কোনো বেতন-ভাতা নেইনি। আলহাজ্ব হাজেরা আক্তারুজ্জামান কলেজে কর্মরত থাকাবস্থায় কিভাবে কাকিলাকুড়া মালেকুননিসা হজরত আলী কলেজের প্রভাষক (পৌরনীতি ও সুশাসন) এস এম আব্দুল্লাহ আল মামুনকে বাদ দিয়ে তার স্থলে কোন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ এবং এমপিওভুক্ত হলেন জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। 

কাকিলাকুড়া মালেকুননিসা হজরত আলী কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ মোঃ বজলুর রশিদ শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি বলতে পারবেন।

জানতে চাইলে  কলেজটির সভাপতি ও প্রতিষ্ঠাতা মো. আবদুল খালেকের মুঠোফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার ময়মনসিংহ অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক আলিফ উল্লাহ এর মুঠোফোনে কল করলেও তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। 

কিভাবে এমন নিয়োগ জালিয়াতি ও কর্মরত শিক্ষককে বাদ দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করানো হলো জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের বেসরকারি কলেজ শাখার সহকারি পরিচালক মো: মাঈন উদ্দিন শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/২৯/০৬/২০২৫

 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.