আবুল হোসেন বাবলু, রংপুর: রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের ছয়জন শিক্ষক ও এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে ভুয়া সনদে চাকরি, এমপিও নীতিমালা লঙ্ঘন, অর্থের বিনিময়ে এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রে নকল সরবরাহসহ নানাবিধ অভিযোগ উঠেছে।
সোমবার (১৬ জুন) বিকালে ছয় শিক্ষক ও এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মাহেদুল আলম। এর আগে গত ৩ জুন ওই প্রতিষ্ঠানের অফিস সহায়ক হায়দার আলী বাদী হয়ে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর ওই ৭জন শিক্ষক কর্মচারীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
আরও পড়ুনঃ এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে অর্থের বিনিময়ে নকল সরবরাহের প্রতিযোগিতা
অভিযুক্তরা হলেন, ওই বিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিষয়ের সিনিয়র শিক্ষক রাজ্জাকুর রহমান, সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী শিক্ষক মাকসুদার রহমান মিঞা, কৃষি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক রেজাউল করিম (জুয়েল), সমাজবিজ্ঞান শাখার সহকারী শিক্ষক মোছাঃ রোকেয়া বেগম, বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী শিক্ষক আব্দুল কাইয়ুম, সহকারী লাইব্রেরিয়ান মোছাঃ রেজিনা আফরোজ বেলি, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মোছাঃ নুর জাহান বেগম।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কম্পিউটার বিষয়ের অনুমোদন নেয়ার আগেই জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কম্পিউটার সনদের মাধ্যমে রাজ্জাকুর রহমান গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০০২ সালে কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে আজ অবধি কম্পিউটার চালাতে জানেন না এই শিক্ষক। কম্পিউটার ল্যাবের ল্যাপটপ বিভিন্ন শিক্ষকদের মধ্যে বন্টন করে দিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ল্যাবের কার্যক্রম বন্ধ করে রেখেছেন। অডিট আসলেই ছুটি নিয়ে স্কুলে আসেন না এই শিক্ষক। নীতিমালা ভঙ্গ করে তিনি একটি স্কুল ও কোচিং সেন্টার পরিচালনা করছেন।
এছাড়াও ২০ সেপ্টেম্বর ২০০৬ ইং তারিখে সমাজ বিজ্ঞান শাখার সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন মাকসুদুর রহমান মিঞা। দীর্ঘদিন এমপিওভুক্ত না হওয়ায় তিনি ২০১০ ইং সালে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে সহকারী বিজ্ঞান শিক্ষক পদে এমপিওভুক্ত হন। পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অডিটের পূর্বে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে এমপিও সংশোধন করে ২০২২ সালে সমাজ বিজ্ঞান শাখা শিক্ষক পদে পুনরায় যোগদান দেখান। ২০১৮ ইং সালে এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে কক্ষ পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় পরীক্ষার্থীকে নকল দেয়ার সময় হাতেনাতে আটক হয়ে থানা হাজতে আটক ছিলেন এই শিক্ষক। এছাড়াও ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় নকল সরবরাহের জন্য এই শিক্ষকের নির্ধারিত কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে পরিদর্শকের দায়িত্ব দেয়া হয়।
এদিকে এমপিও নীতিমালা লঙ্ঘন করে কৃষি শিক্ষা বিষয়ে অনুমতি ও অনুমোদন না নিয়ে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৬ ইং তারিখে কৃষি শিক্ষার সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে ২০০৯ সালে এমপিওভুক্ত হন রেজাউল করিম (জুয়েল)। পরবর্তীতে তিনি ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০ ইং তারিখে জালয়াতির মাধ্যমে কৃষি শিক্ষা বিষয়ে অনুমতি নেন।
সমাজ বিজ্ঞান শাখার সহকারী শিক্ষক হিসেবে গত ৯ মার্চ ২০১৫ ইং সালে যোগদান করেন মোছাঃ রোকেয়া বেগম। এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি ক্লাসে কমপক্ষে ৬০ জনের অধিক শিক্ষার্থী হলে শাখা শিক্ষক হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা থাকলেও ষষ্ঠ শ্রেণিতে ২৭ জন ও সপ্তম শ্রেণিতে ৪০ জন শিক্ষার্থীর তথ্য গোপন করে এমপিও নীতিমালা ভঙ্গ করে তিনি এমপিওভুক্ত হন। সহকারী লাইব্রেরিয়ান হিসেবে গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০১১ ইং তারিখে নিয়োগ প্রাপ্ত হন মোছাঃ রোজিনা আফরোজ। বন্ধ হয়ে যাওয়া দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় হতে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে সহকারি লাইব্রেরিয়ান সনদ নিয়ে তিনি ২০১৪ সালে এমপিওভুক্ত হন। এসময় এমপিও নীতিমালা লঙ্ঘন করে সরাসরি সিনিয়র স্কেলে এমপিওভুক্ত হন ও বকেয়া বেতন ৭০,১৩০ টাকা অবৈধভাবে উত্তোলন করেন। দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত ঘোষণার পরেও অদ্যাবধি একই সার্টিফিকেটে কর্মরত রয়েছেন এই শিক্ষক।
বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী শিক্ষক মোঃ আব্দুল কাইয়ুম মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি দেয়ার নামে একই প্রতিষ্ঠানের দুই সহকারী শিক্ষক ও পীরগাছা পারুল এলাকার সাইফুলের কাছে ২৬ লক্ষ টাকা নিয়ে দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন ও তিন বছর যাবত বরখাস্ত ছিলেন এবং বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০ জুলাই ২০২২ ইং তারিখে তার সম্পূর্ণ বেতন ভাতাদি স্থগিত করা হয়েছিলো। এছাড়াও এই শিক্ষক ২০১৮ সালে বার্ষিক পরীক্ষার ২২,২০০ টাকা ড্রয়ার ভেঙে চুরি করেন ও ২০১৮ সালে এসএসসি পরীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারের ব্যাগ থেকে ৫,০০০ টাকা চুরি করেন। পরবর্তীতে ম্যানেজিং কমিটির নিকট ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেন এবং আংশিক টাকা পরিশোধ করে বাদীদের সাথে আপোস করেন। চাকরি বহাল হওয়ার পরে আবারো বিভিন্ন লোকজনের সাথে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
গত ৯ মার্চ ২০১৫ ইং তারিখে তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আওয়ামীলীগ নেতা মোঃ ফয়জার রহমান খান ছয় মাস মেয়াদি কম্পিউটার শিক্ষার ভুয়া সনদ সংগ্রহ করে তার স্ত্রী নুর জাহান বেগমকে নিম্নমান সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগ প্রদান করেন। অভিযোগ রয়েছে কম্পিউটার চালাতে না জানলেও স্বামীর হস্তক্ষেপে নিয়োগ পেয়ে কোন প্রকার কাজ না করে শুধুমাত্র স্কুলে হাজিরা দিয়ে অদ্যাবধি বেতন তুলছেন নুর জাহান বেগম।
এবিষয়ে পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মাহেদুল আলম জানান, আমার প্রতিষ্ঠানের ছয়জন শিক্ষক ও একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে ইউএনও এবং জেলা শিক্ষা অফিসে। এবিষয়ে কোন মন্তব্য করতে চাই নাহ। আমি চাই এই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হোক।
মিঠাপুকুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল মমিন মন্ডল জানান, অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা নেই। লিখিত অভিযোগ দিয়ে থাকলে এবিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এবিষয়ে কথা বলতে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ মুলতামিস বিল্লাহ’র মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১৬/০৬/২০২৫
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
