জাতির প্রত্যাশা ও প্রাথমিক শিক্ষকের প্রাপ্তি

মোহাম্মদ নাছিম ফারুকী।।

প্রাথমিক শিক্ষা হলো দেশের শিক্ষা স্তরগুলোর বুনিয়াদী স্তর। এ শিক্ষার ভিত যতটা মজবুত হবে জাতি ততটা উন্নত প্রজন্ম পাবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৩ সালে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা বিরাজমান থাকার পরেও প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করার মধ্য দিয়ে ৩৬০০০ হাজার বিদ্যালয় যেমন সরকারিকরণ করেছিলেন তার সাথে ঐ সকল বিদ্যালয়ে কর্মরত বিপুল সংখ্যক শিক্ষকদের জীবন জীবিকার সুযোগও তৈরি করে দিয়েছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা তথা মৌলিক শিক্ষাকে সবার জন্যে সহজতর করার মানসে। ১৯৯১ সালে তৎকালীন সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে সকলের জন্যে বাধ্যতামূলক করে সকল শ্রেণি -পেশার মানুষের সন্তানদের বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ নিশ্চিত করেন অধিক গুরত্বারোপ করে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রাথমিক স্তরের শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের প্রত্যাশায় শিশুদের বিনামূল্য বই বিতরণ, উপকরণ সরবরাহ, উপবৃত্তি বিতরণ সহ স্থানভেদে খাদ্য সরবরাহ করে আসছেন দীর্ঘসময়কাল থেকে।

শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মূখী করার প্রয়োজনে আকর্ষণীয় ভবন, উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা, বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান, বিদ্যালয় গমনোপযোগী রাস্তা ঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে / হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশ্বমানের শিক্ষায় রৃপদানের পরিকল্পনায়। ১৯৯১ সাল থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পুরুষের জন্যে স্নাতক ও মহিলার জন্যে এসএসসি যোগ্যতা রেখে জাতীয় কেন্দ্রীয় শিক্ষক নির্বাচন কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া শিক্ষকগণের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষাকে মানসম্মত করার সর্বোপরি প্রত্যাশা নিয়ে কাজ করছে প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন। ১৯৭৪ থেকে দীর্ঘ সময়ে ব্যক্তি পর্যায়ে স্থাপিত ও বেসরকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রেজিষ্টার্ড বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে ২০১৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয়করণের ঘোষনার মধ্য দিয়ে এ ২৬১৯৩ বিদ্যালয় সহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যাকে প্রায় ৬৬ হাজারে বিস্তৃত করেন এমডিজি ও এসডিজির সফল বাস্তবায়নের জন্যে। ইতিমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা ২০১৩ তে পুরুষের ক্ষেত্রে স্নাতক ও মহিলাদের ক্ষেত্রে এইচএসসি নির্ধারণ এবং ২০১৯ সালে পুরুষ – মহিলা উভয়ের নিয়োগকালীন যোগ্যতা স্নাতকে উন্নীতকরণ করা হয়েছে মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষাদান নিশ্চিত করার প্রত্যাশা নিয়ে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলার কিংবা তদারকি করার ব্যক্তিবর্গের ঘাটতি কখনও ছিলনা, এখনো নেই। প্রাথমিক শিক্ষকদের মূল কাজ শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা হলেও শিক্ষকদের প্রতি কর্মদিবসে কমপক্ষ্যে ৭ ঘন্টা শ্রেণি কার্য পরিচালনা করার পর শিক্ষার্থীর হোমভিজিট, উপবৃত্তির তথ্য তৈরিকরণ, কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়ানো,জাতীয় টিকার প্রোগ্রামে সাহায্যকরণ, জাতীয় ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণে অংশগ্রহন, জাতীয় দিবসগুলোসহ আন্তর্জাতিক দিবসগুলোর কর্মসূচীর বাস্তবায়ন, শিক্ষা প্রশাসন,উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসনসহ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অর্পিত দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি মানসম্মত যে শিক্ষা তা নিশ্চিতকরণ খানিকটা অসম্ভব। তদুপরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক – ছাত্র অনুপাতের যৌক্তিক বাস্তবায়ন কখনও ছিলনা, আজও নেই।

প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকা, উপজেলায়, উপশহরে ৩/৪ জন কিংবা ৫ জন শিক্ষকের মাধ্যমেই চলা প্রাথমিক শিক্ষা মানসম্মত দূরের কথা নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনাও অনেক ক্ষেত্র দুঃসাধ্য, দুরহ। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ সৃষ্টির পর থেকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন প্রাথমিক শিক্ষার সাথে একেবারেই সংশ্লিষ্টজনেরা / প্রাথমিক শিক্ষা তথা শিক্ষা ব্যবস্থা – ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অভিজ্ঞতাসম্পন্নদের হাতে না হয়ে ভিন্ন মাত্রায় সম্পৃক্তজনদের দ্বারাই পরিচালিত বিধায় এ শিক্ষার মূল ধারক প্রাথমিক শিক্ষকরা বরাবরই বঞ্চিত, অবহেলিত। এ মন্ত্রনালয়ে নিকটতম অতীতে চালিকা শক্তির দায়িত্বপালনকারী ব্যক্তিগণ, মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় প্রাথমিক শিক্ষকদের মূল্যায়ন /মূল্যমান বিবেচনায় না এনে প্রাইশয়ঃ নিজেদের ধ্যাণ -ধারণা পরিপত্র/নির্দেশনা আর বিজ্ঞপ্তির মোড়কে জারি করে বাধ্য করতে চেয়েছেন প্রতিপালন করাতে। যে শিক্ষক দিয়ে এতগুলো কাজ আদায় করিয়ে নেয়া হচ্ছে, যে শিক্ষকের কাছে এত প্রত্যাশা সেই প্রাথমিক শিক্ষকরা কলুর বলদের মত খেটে যাচ্ছে দেশ মাতৃকার প্রয়োজনে। শিক্ষকদের প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে পরিপত্রের আবর্তে আটকে রাখা হচ্ছে যেন তারা নিজেদের প্রাপ্তির প্রয়োজনীয় তুলে ধরার সুযোগ না পায় সে উদ্দেশ্যে।

প্রাথমিক শিক্ষক যখন মানসম্মত শিক্ষার প্রয়োজনে নিজেদের সামাজিক মানবৃদ্ধির কথা তোলেন তখন মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বপূর্ণ ব্যক্তি জনসম্মুখে ঘোষনা দেন প্রাথমিক শিক্ষক বর্তমানে যে বেতন কাঠামোতে সেই বেতনের মধ্যেই কমপক্ষ্যে ৫ জন শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার মত শিক্ষক তার হাতেই বিদ্যমান, আবার নীতি নির্ধারকদের কেউ বলছেন প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন কাঠামো যথেষ্টই এতেই সামাজিক অবস্থান যথার্থ। এমন অনেক দায়িত্বশীলও রয়েছেন শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয়টিকে ধূলায় মিশিয়ে দেয়ার মানসে প্রত্যন্ত চর এলাকায় গিয়ে ছাত্র- শিক্ষক অনুপাত ঠিক না থাকা, কাজের পর্যাপ্ত সুযোগ না পাওয়া, অস্বচ্ছল,অসচেতন এলাকায় কোন এক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পঠন -পাঠন শৈলীর বিষয়ে প্রশ্ন উঠানোর মধ্য দিয়ে। প্রাথমিক শিক্ষকরা শিক্ষাদানের মূল কাজটি জাতিকে উপহার দিলেও শিক্ষকরা দেশের তৃতীয় শ্রেণির একজন কর্মচারি সর্বনিম্ন সমমান বেতনভাতাদি নিয়ে সমাজে বসবাস করে, দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। সে বিষয়ে দীর্ঘ সময়ে কোন কর্তৃপক্ষেরর দৃশ্যমান কোন ভূমিকা না থাকলেও শিক্ষকদের বিভিন্ন ঘাটতির বিষয়ে কথা বলার এবং কাজ করার ব্যক্তিবর্গের অভাব নেই। তাই তো শিক্ষক যখন নিজে তার সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে রাস্তায় শান্তিপূর্ণ অবস্থানে, তখন রাষ্ট্রের শৃংখলার দায়িত্বে থাকা আরেক সরকারি কর্মচারি শিক্ষকের পিঠে কষে দু’টো লাগিয়ে বলে ‘ যাও রাস্তা ছেড়ে বাড়ি, না হলে যে সবিই হবে খালি ‘।

প্রাথমিক শিক্ষক তার ন্যায্য দাবী আদায়ে রাস্তায় নেমে নির্যাতিত হতে হলো কোন যৌক্তিক কারন ছাড়াই। অথচ দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের নেই কোন বক্তব্য অথচ শিক্ষকদের টুটি চেপে ধরার পরিপত্র / পত্র হচ্চে যত্রতত্র। সর্বোপরি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চয়নের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি যারা করে থাকেন, তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ একজন হতভাগ্য প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে সর্বাগ্রে প্রাথমিক শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করুন, শিক্ষকদের চাহিত বেতনস্কেল প্রদানের মাধ্যমে বেতন কাঠামোয় মর্যদাপূর্ণতা আনয়ন করুন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার সকল অপূর্ণতা পূরন করুন দেখবেন নিজের অজান্তেই মানসম্মত ও সময়োপযোগী শিক্ষা উপহার পাবেন নিশ্চিত।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.