যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। বিপর্যস্ত অর্থনীতি, বিপর্যস্ত অবকাঠামো। স্কুলে পরীক্ষা নেওয়ার কোনো পরিবেশ নেই, সুযোগও নেই। এসএসসি ব্যতীত অন্য সব শ্রেণিতে ঘোষিত হয় ‘অটোপাস’। কিন্তু ১৯৭২ সালের সেই এসএসসি পরীক্ষা আজও সারাদেশে বিতর্ক ছড়ায়। কথিত আছে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির অনেকেই সে বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল। আরও কথিত আছে, সে বছর পরীক্ষায় প্রচুর অনিয়ম হয়। ভয়ভীতি দেখিয়ে, অস্ত্র ঠেকিয়ে, বল প্রয়োগ করে অনেকেই সেই পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করে ও উত্তীর্ণ হয়। আজও সেই পরীক্ষা দেশে কালো দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ‘বাহাত্তরে পাস (!)’, এই তির্যক কথা তাদের অনেককে আজও শুনতে হয়। যারা অসদুপায় অবলম্বন করেছে, কিংবা করেনি প্রত্যেককেই সেই কটুকথা শুনতে হয়েছে।
দীর্ঘদিন পর করোনা সংকটে যখন পৃথিবী স্থবির, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বিপর্যস্ত তখন আমরা আবারও ‘অটো পাস’ ঘোষণা করলাম। তবে এবার এইচএসসিতে। বিষয়টা আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। নতুন একটি উদাহরণ সৃষ্টি হলো বাংলাদেশে। প্রশ্ন জাগছে, সংকট কাটাতে গিয়ে আমরা নতুন সংকটের মুখোমুখি হলাম না তো?
কথা ছিল সেদিন পরীক্ষার সম্ভাব্য সূচি প্রকাশ করা হবে। মোটামুটি আমরা সবাই সেই অপেক্ষাতেই ছিলাম। হঠাৎ বিনা মেঘে বৃষ্টি। কারও কারও জন্য সে বৃষ্টি প্রশান্তি বয়ে আনলো। কারও কারও জন্য অশান্তি। ঘোষিত হলো ফল। জানা গেল, অতীতের ফলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে বর্তমান ফল। পৃথিবীর সবচেয়ে অসত্য তথ্য উপস্থাপন করে পরিসংখ্যান। গড় প্রকাশ করে। বলে ভালো, মন্দ অথবা মোটামুটি। যে গড় দিয়ে আমরা প্রকৃত অবস্থা বোঝার চেষ্টা করি। সেখানে সবচেয়ে ভালো ও সবচেয়ে খারাপকে ব্যাপকভাবে বঞ্চিত করা হয়। এই ফলেও খানিকটা সেই ঘটনা ঘটেছে। জেএসসি ও এসএসসিতে একজন শিক্ষার্থী খারাপ ফল করতে পারে। কিন্তু এইচএসসিতে সে ভালো ফল করতে পারে।
উল্টোটাও ঘটতে পারে। ঘটেও। কিন্তু আমরা এই করোনা সংকটে এইচএসসির ফলের জন্য অসত্য মানদণ্ড গড়কেই বেছে নিলাম! আমরা বিশ্বাস করি, পরীক্ষা কোনো অবস্থাতেই একটি শিাব্যবস্থার প্রাণ হতে পারে না। কিন্তু এ কথাও সত্য, আমাদের উচ্চাশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে এইচএসসি পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই পরীক্ষার জন্য আমরা অনেক বিকল্পই বিবেচনা করতে পারতাম। ফলের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার আগে বিশেষজ্ঞ মত ও জনমত বিবেচনা করতে পারতাম। আপাতদৃষ্টিতে আমরা তা করিনি, অথবা করা হয়ে ওঠেনি।
আমাদের হাতে আর কী কী বিকল্প ছিল।
পরীক্ষা বাতিলের মতো এত বড় সিদ্ধান্তের জন্য আমরা আরেকটু অপেক্ষা করতে পারতাম; আমরা যেহেতু দাবি করি, দেশ এখন ডিজিটাল, সেহেতু আমরা একটু চেষ্টা করে দেখতে পারতাম অনলাইন পদ্ধতিতে সংক্ষিপ্ত আকারে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা যায় কিনা; যেহেতু দেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবকিছু করা সম্ভব হচ্ছে; সেহেতু স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমরা পরীক্ষা আয়োজনের চেষ্টা করতে পারতাম। যেহেতু শুক্র-শনিবার অন্যান্য সবকিছু বন্ধ থাকে সেহেতু; সপ্তাহের এই দিনগুলোতে পরীক্ষা আয়োজন করলে হয়তো স্বাস্থ্যবিধি মানা সহজতর হতো।
প্রয়োজনে পরীক্ষার সংখ্যা কমিয়ে আনা যেত; দুই বা ততোধিক গ্রুপ করে, কম সংখ্যক পরীক্ষার্থীর স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধাপে ধাপে পরীক্ষা আয়োজন করা যেতে পারত; বিষয় গুরুত্ব বিবেচনা করে, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষার আয়োজন করা যেত। মূল বিষয় দুটো ও সংশ্নিষ্ট বিভাগের জন্য দুটো। এতে মূল্যায়ন সহজ হতো ও ভর্তির জন্য যথাযথ যোগ্যতা বিবেচনা করাও সহজ হতো; স্বাস্থ্যবিধি মেনে, শুধু মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করা যেত। এতে হয়তো পুরোপুরি মূল্যায়ন সম্ভব হতো না, কিন্তু খানিকটা অন্তত হতো।
যেমনটা শুরুতে উল্লেখ করছিলাম, আজও বাংলাদেশে বাহাত্তরের পরীক্ষা একটি উদাহরণ। ঠিক তেমনই আরেকটি উদাহরণ হয়ে রইল ২০২০। দীর্ঘদিন তাদের সামাজিকভাবে তিরস্কারের মুখোমুখি হতে হবে। যা ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরুও হয়েছে। আমরা কোনো অবস্থাতেই এভাবে একটি প্রজন্মকে তিরস্কারের মুখে ফেলে দিতে পারি না। তাছাড়া এই বিনা মূল্যায়নে এইচএসসি পাস প্রক্রিয়া উচ্চশিক্ষার ভর্তি প্রক্রিয়া জটিল করে তুলবে। এবার যত শিক্ষার্থী পাস করবে, তাদের প্রত্যেককে উচ্চশিক্ষায় সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে না।
তাছাড়া মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে বড় ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। আরেকটি বড় জটিলতা হলো, অন্যান্য পাবলিক পরীক্ষার শিক্ষার্থীরাও ‘অটো প্রমোশন’ প্রত্যাশা করবে। আমাদের উচ্চশিক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী প্রত্যাশা করবে, পুরোনো বর্ষের ফলে ভিত্তিতে তাদের প্রমোশন দেওয়া হোক। তারা প্রত্যাশা করবে, পুরোনো ফলের ভিত্তিতে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তরের ফল প্রকাশ করা হোক। শিশু ছাড়া, অন্য কারও জন্য আমরা বিনা মূল্যায়নে প্রমোশনের পক্ষে নই। কিন্তু একই শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা বৈষম্য আনতে পারি না। ফলে এইচএসসির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো আরও ভালোভাবে বিবেচনা করা উচিত ছিল।
পরিবর্তনশীল সিদ্ধান্তই সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য। পরিস্থিতি, আলোচনা-সমালোচনা বিবেচনায় প্রয়োজনে আমরা চাইলেই পুরোনো সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারি। এই ব্যাচে সন্দেহাতীতভাবে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আছে যারা যে কোনো কারণেই হোক আগের পাবলিক পরীক্ষায় ভালো করতে পারেনি। অতএব, সেই ফল তাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার নির্ধারক হতে পারে না। আমরা তাদের পুরো শিক্ষাজীবনকে বিপদগ্রস্ত বা বাধাগ্রস্ত করতে পারি না। এইচএসসি পরীক্ষার ফল একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।
ফলে আমাদের উচিত পূর্বসিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনাপূর্বক যে কোনো আঙ্গিকে পরীক্ষার আয়োজন করে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ও তাদের আগামী কর্মজীবনকে আনন্দময় করে তোলা। তাদের শিক্ষাজীবনকে সংকটাপন্ন, বিতর্কিত ও লজ্জাজনক পরিবেশের মুখোমুখি না করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। মনে রাখা দরকার, পরীক্ষা যেমন শিক্ষাজীবনের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নয়, তেমনি কখনও কখনও পরীক্ষার কোনো বিকল্পও নেই।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
