এইমাত্র পাওয়া

সরকারের নির্ভরতা কমছে সঞ্চয়পত্রে

নিজস্ব প্রতিবেদক।। 

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি সামান্য বাড়লেও সামগ্রিক চিত্র বলছে, অর্থায়নের উৎস হিসেবে সঞ্চয়পত্রের ওপর সরকারের নির্ভরতা ক্রমেই কমছে। উচ্চ সুদ ব্যয়, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং গৃহস্থালি পর্যায়ের দুর্বল চাহিদাকে এই প্রবণতার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি ২৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৭৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। তবে এই প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও প্রকৃত চাহিদা শক্তিশালী হয়নি।

কারণ নতুন বিক্রির তুলনায় পরিশোধের পরিমাণ এখনো বেশি।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি দাঁড়ায় ঋণাত্মক ২৯৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ওই মাসে সরকার সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে যত অর্থ সংগ্রহ করেছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ পরিশোধ করেছে। যদিও এটি ২০২৪ সালের নভেম্বরের ঋণাত্মক ৩ হাজার ৪৩০ কোটি টাকার তুলনায় কমেছে, তবুও বাজেট অর্থায়নে সঞ্চয়পত্রের সীমিত ভূমিকারই ইঙ্গিত দেয়।

সরকার বর্তমানে অর্থায়নের চাহিদা মেটাতে প্রধানত ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণগ্রহণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকায়, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৬ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জন্য সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ঋণগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রসহ নন-ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা।
গত তিন অর্থবছর ধরেই সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বার্ষিক হিসাবে ঋণাত্মক রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা রেকর্ড ঋণাত্মক ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ঋণাত্মক ৩ হাজার ২৯৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নির্দিষ্ট মুনাফাভিত্তিক এই বিনিয়োগের আকর্ষণ কমে গেছে। প্রায় তিন বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকায় সঞ্চয়পত্রের প্রকৃত রিটার্ন কমেছে।

ফলে অনেক পরিবার মেয়াদপূর্তির সঞ্চয়পত্র নতুন করে বিনিয়োগ না করে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে ভাঙিয়ে ফেলছে। ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে নামলেও তা এখনো নতুন চাহিদা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদ ব্যয় সরকারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ট্রেজারি বিল ও সরকারি বন্ডের তুলনায় বেশি হওয়ায় এটি সরকারের জন্য ব্যয়বহুল অর্থায়ন মাধ্যম। উপরন্তু ব্যাংক আমানতের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় সঞ্চয়পত্রের তুলনামূলক আকর্ষণ আরও কমেছে।

বর্তমানে বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক ৮ থেকে ১১ শতাংশ সুদে স্থায়ী আমানত সুবিধা দিচ্ছে।
২০২১ সাল থেকে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার সর্বোচ্চ দুই শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে। পাশাপাশি কঠোর শর্ত আরোপের ফলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগও সীমিত হয়েছে। এসব কারণ মিলিয়ে ভবিষ্যতেও সঞ্চয়পত্রের ওপর সরকারের নির্ভরতা আরও কমতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.