এইমাত্র পাওয়া

দায় ব্যক্তির, কিন্তু প্রশ্ন পুরো ব্যবস্থার

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল থেকে ২১ বোতল মদ উদ্ধারের ঘটনা আপাতদৃষ্টিতে একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ বলেই মনে হতে পারে। একজন শিক্ষার্থী—তিনি যে হলের আবাসিক নন—দীর্ঘদিন ধরে অন্য হলে অবস্থান করেছেন, সেখানেই মদ মজুত রেখেছেন, এবং শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েছেন। এই বর্ণনায় দায়টা ব্যক্তিরই। আইন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী এবং সামাজিক নৈতিকতার বিচারে ওই শিক্ষার্থী দায় এড়াতে পারেন না। তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ঘটনাকে কি শুধু একজন শিক্ষার্থীর ‘ব্যক্তিগত অপরাধ’ হিসেবে দেখলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? নাকি এর পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক শৈথিল্য, অব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণহীন ক্যাম্পাস সংস্কৃতি, যার সুযোগ নিয়ে এমন ঘটনা ঘটতে পারছে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ‘অবৈধভাবে থাকা’ নতুন কোনো বিষয় নয়। কোন শিক্ষার্থী কোন হলে থাকছেন, কতদিন ধরে থাকছেন, নিয়মিত না অনিয়মিত—এসব তথ্য প্রশাসনের অজানা থাকার কথা নয়। তবু বাস্তবে দেখা যায়, এক হলের শিক্ষার্থী অন্য হলে বছরের পর বছর অবস্থান করছেন, কেউ কেউ আবার কোনো হলেরই আবাসিক নন, অথচ হলের কক্ষে রীতিমতো বসবাস করছেন।

এই ঘটনা সেই বাস্তবতারই একটি নগ্ন উদাহরণ। অভিযুক্ত শিক্ষার্থী মীর মশাররফ হোসেন হলের আবাসিক হয়েও দীর্ঘদিন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলে অবস্থান করেছেন। প্রশ্ন উঠতেই পারে—হল প্রশাসন এতদিন বিষয়টি জানল না কেন? জানলেও কেন ব্যবস্থা নেয়নি? নাকি জানার পরও ‘সবাই জানে’—এই অলিখিত নিয়মে বিষয়টি উপেক্ষিত ছিল?

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—২১ বোতল মদ কোনো পকেটে ভরে আনা যায় না। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযুক্ত নিজেই স্বীকার করেছেন। তাহলে সেই মদ কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করল? কীভাবে হলের ভেতরে, কক্ষের বিছানার নিচে, দিনের পর দিন রাখা থাকল?

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গেট আছে, নিরাপত্তা আছে, আনসার আছে, নাইট গার্ড আছে। হলগুলোতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী আছেন। তারপরও যদি এত বড় পরিমাণ মাদক অনায়াসে ঢুকে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় সেখানে থাকে, তাহলে দায় শুধু শিক্ষার্থীর নয়—ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরের ওপরই প্রশ্ন ওঠে।

এই ঘটনায় হল প্রশাসনের তাৎক্ষণিক অভিযান প্রশংসনীয়। তথ্য পেয়ে অভিযান চালানো হয়েছে, মাদক জব্দ হয়েছে, বিষয়টি গোপন না রেখে প্রকাশ্যে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অভিযান কেন ‘তথ্য পাওয়ার পর’? নিয়মিত তদারকি, আকস্মিক কক্ষ পরিদর্শন, অবৈধ আবাস চিহ্নিত করার কার্যকর প্রক্রিয়া যদি থাকত, তাহলে কি এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো?

বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো কেবল থাকার জায়গা নয়; এগুলো শিক্ষার্থীদের চরিত্র, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সেখানে নিয়ম প্রয়োগ যদি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এমন ঘটনা একটির পর একটি ঘটতেই থাকবে।

এই ঘটনায় আরেকটি দিক হলো ছাত্ররাজনীতিকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক। অভিযুক্ত শিক্ষার্থী অতীতে একটি ছাত্রসংগঠনের প্যানেল থেকে নির্বাচন করেছিলেন—এই তথ্য সামনে আসতেই শুরু হয় দায় চাপানোর রাজনীতি। সংগঠনটি তড়িঘড়ি বিবৃতি দিয়ে জানায়, অভিযুক্ত তাদের কর্মী নন।

বাস্তবে, একজন শিক্ষার্থী কোন সংগঠনের কর্মী কি না—এই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, তিনি অপরাধ করেছেন কি না। অপরাধ ব্যক্তির, সংগঠনের নয়—এটা যেমন সত্য, তেমনি অপরাধ আড়াল করতে বা দায় এড়াতে ছাত্ররাজনীতিকে ঢাল বানানোও অনৈতিক।

এখানে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে অকারণ হইচই না করে মূল সমস্যার দিকে তাকানো জরুরি—ক্যাম্পাসে মাদক প্রবেশ করল কীভাবে, প্রশাসনিক নজরদারি কেন ব্যর্থ হলো, এবং ভবিষ্যতে কীভাবে এটি বন্ধ করা যায়।

অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বক্তব্য—থার্টি ফার্স্ট নাইটে বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করার জন্য মদ আনা হয়েছিল—আরেকটি গভীর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোন ধরনের সংস্কৃতি গড়ে উঠছে? শিক্ষাঙ্গন কি ধীরে ধীরে দায়িত্বহীন ভোগবাদী বিনোদনের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে?

নিশ্চয়ই, তরুণদের আনন্দ-উৎসব থাকবে। কিন্তু সেই আনন্দ যদি আইন, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার সীমা লঙ্ঘন করে, তাহলে তা আর ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না—তা সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

এই ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। এতে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু শুধু শাস্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রয়োজন—
হলগুলোতে আবাসিক তালিকার কঠোর বাস্তবায়ন
অবৈধ আবাসের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান
নিরাপত্তা ব্যবস্থার জবাবদিহি
শিক্ষার্থীদের জন্য সচেতনতা ও নৈতিক শিক্ষা
এবং সর্বোপরি, প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থান
যতদিন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা’ এই নীতিতে চলবে, ততদিন ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

এই ঘটনায় দায় অবশ্যই একজন শিক্ষার্থীর। তিনি আইন ভেঙেছেন, নিয়ম ভেঙেছেন, বিশ্বাস ভেঙেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন পুরো ব্যবস্থার—যে ব্যবস্থা তাঁকে এতদিন আড়ালে থাকতে দিয়েছে, যে ব্যবস্থা মাদক প্রবেশ ঠেকাতে পারেনি, যে ব্যবস্থা নিয়ম ভাঙাকে প্রায় স্বাভাবিক করে তুলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় যদি সত্যিই জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার কেন্দ্র হতে চায়, তাহলে ব্যক্তির শাস্তির পাশাপাশি ব্যবস্থার সংস্কারই হোক এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক। 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.