কিশোরগঞ্জঃ শিক্ষার ক্ষেত্রে বয়স কোন বাধা নয়। এমনকি বিয়ে-সংসার কিংবা সন্তান লেখাপড়ায় অন্তরায় হতে পারে না। এমনটাই করে দেখালেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের নাঈম-শারমীন দম্পতি। বিয়ের ১৬ বছর পর নানা প্রতিকূলতার মাঝেও একসঙ্গে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন তারা।
কিশোরগঞ্জে কুলিয়ারচর উপজেলার বাসিন্দা ৪৩ বছর বয়সী বদিউল আলম (নাঈম) এবং ৩৩ বছর বয়সী শারমীন আক্তার বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ঢাকার অধীনে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন।
মঙ্গলবার (১৫ অক্টোবর) ঘোষিত ফলাফলে কুলিয়ারচর উপজেলার লক্ষ্মীপুর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এই দম্পতির মধ্যে স্বামী নাঈম পেয়েছেন জিপিএ ৪ দশমিক ২৯ এবং স্ত্রী শারমীন পেয়েছেন জিপিএ ৪ দশমিক ৫।
পেশায় ঠিকাদার নাঈম কুলিয়ারচর উপজেলার ছয়সূতী ইউনিয়নের দ্বাড়িয়াকান্দি গ্রামের মো. কনু মিয়া ও মোছাম্মাৎ সাজেদা দম্পতির ছেলে। ১৯৯৭ সালে তার এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার কথা থাকলেও আর পরীক্ষা দেওয়া হয়নি তখন।
অপরদিকে গৃহিনী শারমীন আক্তার কুমিল্লা জেলার হোমনা থানার মঙ্গলকান্দি গ্রামের মো. ইসমাইল হোসেন ও মায়া বেগম দম্পতির মেয়ে। নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয় তার। ২০১০ সালে তার এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার কথা থাকলেও সন্তান গর্ভে আসায় আর পরীক্ষা দিতে পারেননি। পরে আর লেখাপড়া করার সুযোগ হয়নি। ২০০৮ সালে বিয়ে হওয়া এ দম্পতির দুই মেয়ে ও এক ছেলে আছে।
তাদের বড় মেয়ে বুশরা আক্তার বীথি স্থানীয় ছয়সূতী ইউনিয়ন হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী ও মেজো ছেলে রেদোয়ান আলম সিয়াম একই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। সবার ছোট মেয়ে তাসনীম (৫) এখনো স্কুলে ভর্তি হয়নি।
এ দম্পতি জানান, ২০২০ সালে বড় মেয়ে বীথি ও তৎকালীন কুলিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাদিয়া ইসলাম লুনার উৎসাহে নতুন করে পড়াশোনা করার আগ্রহ জাগে তাদের।
ওই বছর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তারা দুজন বিন্নাবাইদ দারুল উলুম দাখিল মাদরাসায় ভর্তি হন। পরে ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় নাঈম জিপিএ ৪ দশমিক ৯৫ এবং স্ত্রী শারমীন জিপিএ ৫ পেয়েছিলেন।
নাঈম বলেন, বিয়ের আগে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা দিতে না পারলেও কয়েকবার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ব্যবসা ও সাংসারিক চাপে শেষপর্যন্ত হয়ে ওঠেনি।
শারমীন আক্তার বলেন, মনের জোর এবং স্বজনদের উৎসাহে পড়াশোনা করে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছেন।
এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পেরে তারা নিজেরা আনন্দিত হওয়াসহ তাদের পরিবারে যেমন আনন্দের বন্যা বইছে, তেমনি এলাকার লোকজনও খুশি হয়ে তাদেরকে অভিনন্দন জানাচ্ছে বলে জানালেন এই দম্পতি।
স্থানীয়রা জানান, পড়াশোনা ছাড়া বর্তমান সময়ে চলা অনেক কঠিন। তবে এই বয়সে এসেও তাদের পড়াশোনার প্রতি যে আগ্রহ আছে তা প্রশংসনীয়। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাক। তাদের জন্য শুভ কামনা।
লক্ষ্মীপুর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম হায়দার বলেন, শিক্ষার কোনো বয়স নেই। বদিউল আলম ও শারমীন আক্তার দম্পতি এ বছর আমাদের কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফলাফল অর্জন করেছেন। তারা কলেজে নিয়মিত ছিলেন এবং লেখপড়ায়ও মনোযোগী ছিলেন। আমি প্রায়ই ক্লাস রুমে গিয়ে তাদের খোঁজ-খবর নিতাম। ব্যবসা-সংসার সামলিয়েও যে পড়াশোনা করা যায় এটা দেশবাসীর কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমরা খুবই খুশি।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১৬/১০/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
