website page counter ভালো মানুষ হওয়াটাই আমাদের জন্য জরুরি – শিক্ষাবার্তা

বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৬

ভালো মানুষ হওয়াটাই আমাদের জন্য জরুরি

নিউজ ডেস্ক।।

আপনার বেড়ে ওঠার গল্প জানতে চাই।

রংপুরে আমার জন্ম, ১৩ জানুয়ারি ১৯৫৭। মায়ের নাম ইসমত আরা খান। বাবা মাজহারউদ্দিন খান ছিলেন ইনকাম ট্যাক্স অফিসার। তিনি চাকরিসূত্রে রংপুরে ছিলেন। আবার আমার নানার বাড়িও রংপুরেই। সেখানেই শৈশব কেটেছে। সেখানেই আমার প্রথম স্কুল। সেটি আসলে একটি পাঠশালা ছিল।

ছোটবেলায় ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হেঁটে হেঁটে সেই পাঠশালায় যেতাম। ওখানকার ডিসির বাংলো, এসপির বাংলো যে রাস্তার ওপর ছিল, সেই রাস্তাটা খুব নির্জন ছিল। রাস্তার পাশে কদমফুল ফুটে থাকত, মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। রাস্তায় একটা চাঁপাফুলের গাছ ছিল। বর্ষাকালে চাঁপাফুল ফুটত—তাও মনে আছে। বিকেলবেলা একটা নরমাল স্কুলের মাঠে খেলতে যেতাম। বাবা চাকরি বদল করে ঢাকায় এলেন ১৯৬৩ সালে। তখন আমরাও ঢাকায় চলে আসি।

গানের প্রতি আকৃষ্ট হলেন কখন?

ঢাকায় এসে প্রথমে তেজগাঁওয়ে একটা বাড়িতে ছিলাম। তারপরে ধানমণ্ডি এলাম। ঢাকায় আসার পর আজিমপুরের লিটল অ্যাঞ্জেলস কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি হয়েছি। রংপুরের পাঠশালায় আসলে স্লেটে চক দিয়ে দাগ কষতাম।

প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার প্রকৃত শুরুটা ঢাকায়ই। ছোটবেলায় গান হয়তো ভালোবাসতাম, কিন্তু নিজে কখনো শিল্পী হবো—সেটা ভাবিনি। গানের প্রতি আমি আকৃষ্ট হয়েছি আসলে কৈশোরে। আমার মামা গান করতেন। বাড়ির সবাইকে তিনি গান করাতেন। সেই থেকে শুরু।

গানের চর্চা শুরু কখন…

অনেক পরে, ১৯৬৮ সালে, ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়। আমি তখন ধানমণ্ডি গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলের ছাত্রী। মামার কাছে চর্চার শুরু। তারপর ১৯৬৯ সালে ছায়ানটে ভর্তি হলাম। সেখানকার শিশু বিভাগে আমি এক বছর গান শিখেছি। সন্জীদা খাতুন আর সোহরাব হোসেন ক্লাস নিতেন। খুব যত্ন করে গান শেখাতেন তাঁরা।

ছায়ানটে এক বছর পড়ে তারপর বাফায় ভর্তি হলাম। এরই মধ্যে ১৯৭১ সাল চলে এলো। গান-বাজনা বন্ধ। ১৯৭২ সালে ম্যাট্রিক এবং ১৯৭৪ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিলাম। কাজেই এ সময়ে পড়াশোনার চাপে গানচর্চা বন্ধ ছিল। ইন্টারমিডিয়েটের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। তখন পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন নজরে পড়ল। সেই বিজ্ঞাপন দেখেই শান্তিনিকেতনে পড়ার জন্য আবেদন করেছিলাম।

গানচর্চাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিলেন কখন?

১৯৭৫ সালে শান্তিনিকেতনে যাওয়ার পরই গানচর্চাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিলাম। সেখানে আমার অনেক স্মৃতি। সব কিছু পাল্টানোর স্মৃতি। প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখলাম। এত গুণী গুণী শিক্ষককে পেলাম। এ-টু-জেড গানের একটা পরিবেশের মধ্যে ঢুকলাম। সেখানে সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত গানের মধ্যে বেড়ে ওঠা।

তারপর জীবনের প্রথম স্বাধীনভাবে থাকতে শেখা। নিজের দায়ভার নিজেরই নেওয়া। আমার শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলিমা সেন, সুদীষ বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, শান্তিদেব ঘোষ, মঞ্জু বন্দ্যোপাধ্যায়, অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। একেকজন শিক্ষক ছিলেন একেকটা স্তম্ভের মতো।

সবাই খুব স্নেহ করতেন আমাদের। বলতে গেলে হাতে ধরে ধরে শিখিয়েছেন। তাঁদের কাছে গিয়ে আমি রবীন্দ্রনাথের গানকে অন্য ভাবে চিনতে পারলাম। তাঁদের কাছে গানটা আটপৌরে হয়ে গিয়েছিল। কাজ করতে করতে, চা বানাতে বানাতে, ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে বসে গান করছেন। এভাবে আটপৌরে হিসেবে গানটাকে নিয়েছিলেন তাঁরা। বৃষ্টি পড়ছে? গান। চাঁদ উঠেছে, খুব সুন্দর পূর্ণিমা? গান। ঝড় হচ্ছে? তারও গান। সব কিছুতেই গান।

শান্তিনিকেতনের বিশেষ স্মৃতি?

শান্তিনিকেতনের রুটিনটা ডিফারেন্ট ছিল। আমরা ভোরবেলা উঠে রেওয়াজ করতাম। ৭টা থেকে ক্লাস শুরু হতো, ৯টা পর্যন্ত চলত। তারপর ব্রেক। হোস্টেলে এসে, খেয়েদেয়ে আবার ক্লাস—সাড়ে ৯টা থেকে ১১টা-সাড়ে ১১টা পর্যন্ত। তারপর হোস্টেলে ফিরতাম। স্নান, খাওয়াদাওয়া শেষে দুপুরে একটু রেস্ট।

৩টা-৪টা থেকে লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়াশোনা, নয়তো রিহার্সালে। সারা বছরই কোনো না কোনো অনুষ্ঠান থাকত। ওই সব অনুষ্ঠানের জন্য ১২ মাসই বিকেল থেকে রিহার্সাল চলত। যেদিন রিহার্সাল থাকত না, সে দিন আমরা হয়তো সিনেমা দেখতে যেতাম, বোলপুরে বেড়াতে যেতাম বা নিজেরা বসে গল্প করতাম।

তারপর রাত সাড়ে ৭টা-৮টার মধ্যে খাওয়া; ৯টার মধ্যে সবার শুয়ে পড়া। খুবই রুটিনবদ্ধ একটা জীবন ছিল। তবে সারা দিনই গানের মধ্যে থেকেছি।

এর মধ্যে বিশেষ কোনো দিন?

বর্ষাগুলো খুব সুন্দর ছিল। আমরা হোস্টেলের জানালা খুলে দিয়ে বর্ষা উপভোগ করতাম। গ্রীষ্মকালে ভীষণ গরম পড়ত শান্তিনিকেতনে। তখন ফ্যান ছিল না; এসির তো প্রশ্নই ওঠে না।

সকাল ১১টা থেকে ৪টা-৫টা পর্যন্ত লু হাওয়া বইত। তখন রুম থেকে বের হওয়া যেত না। ওই সময়ে শান্তিনিকেতনের মানুষ তো দূরের কথা, কাকপক্ষীও বের হতো না। বিকেল ৫টার পরে আবার স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড শুরু হতো। আমরা তাই সব জানালা ১১টার মধ্যে বন্ধ করে দিতাম। তারপর পর্দাগুলো ভিজিয়ে, মাটিতে শুয়ে থাকতাম।

অন্যদিকে শীতকালে দুপুরে আমরা কেউই শুয়ে কাটাতাম না; বরং হোস্টেলের সামনের মাঠটায় বসে রোদ পোহাতাম। আমাদের নাগরিক জীবনে তো প্রকৃতির এত বৈচিত্র্য, এত পালাবদল উপভোগ করি না; শান্তিনিকেতনে আমরা প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি ঋতু একেবারে আলাদা আলাদাভাবে উপভোগ করেছি; সত্যি কথা বলতে, চিনতে শিখেছি।

দেশে ফিরলেন কবে?

১৯৭৯ সালে স্নাতক এবং ১৯৮১ সালে মাস্টার্স পাস করে সে বছরই শান্তিনিকেতন থেকে দেশে ফিরলাম। তারপর আবার ১৯৯০ সালে সেখানে গেলাম আমার গুরু কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আলাদা করে গান শিখব বলে। এরপর ১৯৯২ সালে ফিরেছি।

ফিরেই ‘সুরের ধারা’ প্রতিষ্ঠা করলেন?

এটা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকনির্দেশনায়ই করেছি। ফেরার সময় তিনি বলে দিয়েছিলেন, ‘তুমি এবার নিজের মতো করে গান শেখাও।’ তার আগে আমি ছায়ানটে গান শিখিয়েছি। নিজের স্টাইলটা ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েই তিনি এ কথাটি বলেছিলেন। আমি ঠিক পারব কি না—নিশ্চিত ছিলাম না।

তবে তিনি আমার ব্যাপারে খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। ‘সুরের ধারা’ নামটাও তাঁরই দেওয়া। তিনি আমাকে খুব উত্সাহ দিলেন। ১৯৯০ সালে শান্তিনিকেতনে যাওয়ার পর কিন্তু তাঁর বাড়িতেই থাকতাম। গানে তিনিই আমার প্রধান গুরু। আমার মেইন মেন্টর। তাঁর গানের স্টাইল, তাঁর জীবনযাপন…। শুধু গান শেখানোই নয়, এমন এমন সুর, যেগুলোর স্বরলিপি হয়নি কিংবা স্বরলিপির সঙ্গে মেলে না—এ ধরনের অনেক গান শিখেছি তাঁর কাছে।

রবীন্দ্রনাথ গান সম্পর্কে কখন কী কথা বলেছেন, ওনার কী মতামত ছিল, অন্য কিংবদন্তি শিল্পীরা কী ভাবতেন গান নিয়ে—এসব জানা, এককথায় আমার শিক্ষাটা পরিপূর্ণ হয়েছে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে গিয়ে।

‘সুরের ধারা’ নিয়ে আপনার নিজের ভাবনা কী ছিল?

শুরুতে ভাবনা ছিল, একটা গান শেখানোর স্কুল করব। কিন্তু চলতে চলতে টের পেলাম, শুধু গান শেখালেই হবে না। এখানে গান শেখানোর আগে, মনুষ্যত্ববোধটা যেন বিকশিত হয়—সেটা দেখতে হবে। সেটা করতে গিয়ে আমি বাচ্চাদের শান্তিনিকেতনের আদলে তাদের যে সৃজনশীলতা…শুধু গান নয়, বরং নাচ, আবৃত্তি, ছবি আঁকা—সব শেখাই।

এর ভেতর দিয়ে ওরা নিজেদের বিকশিত করতে পারে; আমরাও বুঝতে পারি কোন বাচ্চাটার কোন দিকে ঝোঁক বেশি। তা ছাড়া সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আমরা ‘মিউজিক ফর ডেভেলপমেন্ট’ নামে একটি অনুষ্ঠান করি। ‘সুরের ধারা’রই অন্তর্ভুক্ত একটি প্রকল্প হিসেবে এটি শুরু করেছিলাম। এ বছর গান শেখানোর এই আয়োজনের ১০ বছর পূর্তি হচ্ছে।

আগামীতে সুরের ধারাকে কিভাবে দেখতে চান?

আমাদের সংস্কৃতিচর্চা, আমাদের মনুষ্যত্ববোধ বিকশিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা রাখার চেষ্টায় সব রকমের কর্মপ্রচেষ্টা চালানোর মতো একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই ‘সুরের ধারা’কে আমি দেখতে চাই। শিশু, কিশোর, তরুণরা যেন গান-বাজনার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের আদর্শকে বুঝতে পারে, চিনতে পারে এবং সেই বোধ থেকে ভালো রুচিবোধের মানুষ হয়ে ওঠে।

ধরুন, কেউ হয়তো খুব ভালো রবীন্দ্রসংগীত গায়, কিন্তু খুব বাজে একটা মানুষ—তাহলে তো হবে না। তাকে একজন ভালো মানুষ হতে হবে, তা সে যদি গান একটুখানি কম ভালোও গায়, তাতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু ভালো মানুষ হওয়াটাই আমাদের জন্য জরুরি।

রবীন্দ্রসংগীত আপনার কাছে কী?

এ পর্যন্ত আনুমানিক আট-নয় শ রবীন্দ্রসংগীত আমি গেয়েছি। রবীন্দ্রসংগীত আমার পথচলার দিকনির্দেশনা। প্রতিদিনের জীবনযাপনে আমাকে পথ দেখায় রবীন্দ্রসংগীত। যখনই একটু সংকটে পড়ি, গানের মধ্যে খুঁজি সব কিছু। কোন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে—রবীন্দ্রনাথের গানে সব উপায় খুঁজে পাই।

রবীন্দ্রসংগীত বিকৃত করে গাওয়ার অভিযোগ, বিশেষত রক গায়কদের বিরুদ্ধে নানা সময়েই উঠেছে। এরই মধ্যে আপনি ‘শিরোনামহীন’ ব্যান্ডের ‘রবীন্দ্রনাথ’ অ্যালবামের মুখবন্ধ লিখেছেন…

রবীন্দ্রনাথ নিজে মানুষ হিসেবে গোঁড়া ছিলেন না; বরং অসম্ভব উদারমনা ছিলেন। শান্তিনিকেতনের মূল ব্যাপারটাই ছিল উদ্ভাবন, আবাহন আর যেকোনো নতুন প্রচেষ্টাকে অনুপ্রাণিত করা। সেই হিসাবে এই তরুণ প্রজন্ম যে রবীন্দ্রসংগীত গাচ্ছে, ওরা নিশ্চয়ই কোনো একটা ভাবনা থেকে গাইছে। নিশ্চয়ই রবীন্দ্রসংগীতের কিছু একটা ওদের আকৃষ্ট করেছে।

আমি মনে করি ওদেরকে ওদের মতো গাইতে দেওয়া উচিত। কারণ আমরা যখন ছোট ছিলাম, আমাদের তরুণ বয়সে আমরা আমাদের মতো করে ভাবতাম; এখন যারা তরুণ—তারা তাদের মতো করে ভাববে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, আজ থেকে এক শ বছর পরে, তখনকার তরুণরাও ওদের মতো ভাববে। আমি যদি আমার ভাবনার সঙ্গে ওদেরটা মেলাতে যাই, তাহলে তো হবে না। সময়ের সঙ্গে চলতে হবে আমাদের।

প্রথম গান পরিবেশনের স্মৃতি?

১৯৭৯ সালের কথা। শান্তিনিকেতন থেকে আমরা একটা গ্রুপ এসেছিলাম ঢাকা চারুকলার বকুলতলায় গান গাইতে। সেটিই ঢাকায়, মঞ্চে করা আমার প্রথম অনুষ্ঠান। সম্ভবত ‘তোমায় নতুন করে পাব বলে’ গানটি গেয়েছিলাম। আমি খুবই নার্ভাস ছিলাম।

প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের স্মৃতি?

প্রথম অ্যালবাম বের হওয়ার সময় আমি খুবই রোমাঞ্চিত ছিলাম। সেটি ১৯৮৬ সালের ঘটনা। সারগাম থেকে বেরিয়েছিল। মিউজিক করেছিলেন পান্না দাশ। খুব হিট হয়েছিল অ্যালবামটি। এত যে বিক্রি হবে, আমি তখন বুঝিনি। আমি রোমাঞ্চিত ছিলাম নতুন গান করতে পেরেই। মনে পড়ে সবাই মিলে একসঙ্গে সারা দিন ধরে রেকর্ডিং করতে খুব আনন্দ লাগত।

‘বাজে রম্যবীণা’ দিয়ে সেই যে শুরু, এরপর ‘কবি প্রণাম’, ছিন্নপত্র’, ‘শ্রাবণ তুমি’, ‘পাতার ভেলা ভাসাই’, ‘সুরের খেয়া’, ‘মনের মাঝে যে গান বাজে’, ‘সুদূরের মিতা’, ‘খেলার সাথী’, ‘স্বপন চারিণী’, ‘দুজনে দুজনার’…কত যে অ্যালবাম বেরিয়েছে আমার! শতাধিক তো হবেই।

গান পরিবেশনা করতে গিয়ে বিশেষ কোনো স্মৃতি?

অনেক সুখকর স্মৃতি আছে, যেগুলো ভাবলে আমার নিজেরও ভালো লাগে। এই তো কিছুদিন আগে, লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজের এক অধ্যাপক এসেছিলেন ঢাকায়। তিনি মূলত পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের মানুষ। দীর্ঘকাল লন্ডনে থেকেছেন। একেবারেই একটি সাধারণ পরিবারের সন্তান থেকে অনেক লড়াই করে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

তিনি এসেছিলেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির এক সেমিনারে। আসার আগে শর্ত দিয়েছিলেন, ‘যদি রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার সঙ্গে আমার মিট করিয়ে দেন, তবেই আসব।’ ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি আমাকে নিমন্ত্রণ করল। সেখানে সেই ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি ১৭ বছর ধরে আপনার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু কোনোমতেই পেরে উঠিনি।

’ কথায় কথায় তিনি জানালেন, তাঁর মা যখন মারা যান, তখন তিনি একেবারে ছোট্ট, কোলের শিশু। তাঁর বোন তখন তাঁকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, আর তাঁর মায়ের চিতাটা পুড়ছিল। বললেন, ‘আমি তো তখন সেসব বুঝিনি, তবে একটা কমফোর্ট অনুভব করেছিলাম। মায়ের চিতা পুড়তে দেখছি, বোন কাঁদছে আর আমি বোনের কোলের মধ্যে, কিন্তু আমার যেন মনে হচ্ছে বোনই আমাকে সুরক্ষিত রাখবে।’

এর বহু বছর পরে, যখন তিনি চাকরিতে, বিয়েশাদি করেছেন, দুই ছেলে, তখন ওনার বাবা মারা গেলেন। তিনি তখন লন্ডনে; দেশে ফিরতে পারেননি। তখনকার অবস্থা বোঝাতে বললেন, ‘আমার কেমন পাগল-পাগল লাগছিল।’ তখন তিনি রবীন্দ্রসংগীত বাজিয়েছেন আমার গাওয়া ‘তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে’সহ আরো কোনো একটি গান সারা দিন নাকি শুনেছেন।

আর তা শুনতে শুনতে অনুভব করেছিলেন, ‘আমার বোনের কোলে যে কমফোর্টটা পেয়েছিলাম, এই গানটার মধ্যে সেটিই যেন ফিরে পেলাম। আমার ছেলেদেরও শোনালাম। আর গান শুনতে শুনতে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলাম। এই কথাটি আপনাকে বলার জন্য আমি ১৭ বছর ধরে অপেক্ষা করছি।’

‘হাজার কণ্ঠ’ অনুষ্ঠানটির ভাবনা কিভাবে এলো?

‘হাজার কণ্ঠ’ তো এক বিশাল আয়োজন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে প্রথমবার করেছিলাম। তখন আয়োজনটির ভাবনা ছিল, সারা দেশের রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীরা একসঙ্গে একটা ট্রিবিউট দেবেন। সেই হিসাবে এক হাজার শিল্পী। এটি মূলত ‘সুরের ধারা’ শুরু করলেও পরের বছর ‘চ্যানেল আই’ আমাদের সঙ্গী হলো।

প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ আমরা এ অনুষ্ঠানটি করি। এবার অষ্টম আসর হবে। করতে করতে আমাদের অভিজ্ঞতাও একটু বেড়ে গেছে। ভবিষ্যতে আরেকটু দুঃসাহসীও হতে পারি।

১০ বছরপূর্তি অনুষ্ঠানে হয়তো ‘হাজার কণ্ঠ’ থেকে আরো বাড়াতেও পারি আমরা। আমাদের এই উত্সাহ পাওয়ার কারণ, প্রতিবছরই অংশগ্রহণে আগ্রহীদের সংখ্যা বাড়ছে। এবার হাজারেরও ওপরে এসেছিল; আমরা কিছু বাদ দিয়েছি। আপাতত হাজারের বেশি আমরা নিতে পারব না।

আপনি শিক্ষকতা করছেন নৃত্যকলায়…

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার ও প্রফেসর হিসেবে কাজ করছি। এটি মূলত আমার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ জব। নতুন একটা ডিপার্টমেন্ট চালু করতে গেলে, সব নিয়মের মধ্যে থেকেই বাধা-বিপত্তি সামলাতে হয়। এখানে সেটাই মূলত আমার কাজ। এ ছাড়া আমি রবীন্দ্র নৃত্যকলা বিষয়ে পড়াই। এই ডিপার্টমেন্ট পাঁচ বছর হলো চালু হয়েছে।

প্রচুর সম্মাননা পেয়েছেন…

আমাদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা—স্বাধীনতা পদক পেলাম। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘বঙ্গভূষণ’ ও ‘সংগীত মহাসম্মান’, ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ‘সংগীত সম্মান পুরস্কার’, ফিরোজা বেগম স্বর্ণপদক…আরো কত যে পদক পেয়েছি। পদক মানেই তো স্বীকৃতি। যেকোনো শিল্পীরই স্বীকৃতি পেতে ভালো লাগে, স্বীকৃতির জন্য সে অপেক্ষা করে, স্বীকৃতি তাকে আরো এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা দেয়। এ ছাড়া তার দায়-দায়িত্বও বাড়ায়।

আপনার ভাই-বোন…

ভাই-বোনদের মধ্যে আমি সবার বড়। দুই বোনের মধ্যে উর্মী রুবিনা মাজহার লন্ডনে থাকে; আর ফারিয়া আহমেদ থাকে দেশে। ভাই ইসমত আহমেদ খান ডাক্তার ছিল; এখন আর বেঁচে নেই।

আপনার জীবনযাপন

সামাজিক জীবন বলতে আমার কিচ্ছু নেই। এই ‘সুরের ধারা’ আর গান—ব্যস এটুকুই। তবু প্রত্যেক মানুষেরই জীবনধারণের একটা নিয়ম থাকে। যে মানুষটি চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল, তারও একটা নিয়ম থাকে—বিশৃঙ্খলার নিয়ম। আমি সকালবেলা উঠি। রেওয়াজ করে ১০টা-সাড়ে ১০টার মধ্যে কাজে বের হই। কোনো কোনো দিন কাজ থাকলে হয়তো আগেই বের হই। দুপুরের দিকে বাসায় ফিরে বিশ্রাম নিই। তারপর ক্লাস থাকলে ‘সুরের ধারা’য় আসি, না হয় বাসায় থাকি। হয়তো একটু গান শুনি, টিভি দেখি, বই পড়ি।

জীবনকে কিভাবে দেখেন?

আজ আছি, কাল নেই—এই তো জীবন। জীবনকে সব সময়ই আমার মনে হয় খুবই ক্ষণস্থায়ী। যেকোনো সময় সমাপ্ত হতে পারে। আমার কর্মের জন্য যেন আমাকে কখনো অনুতাপ করতে না হয়—সব সময় সে চেষ্টাই করি।

আপনার টেলিভিশন লাইভ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ফোন করেছিলেন…

ওটা ছিল একটা আকস্মিক ব্যাপার। আমার জন্য অসম্ভব আকস্মিক। ওটা আমার জীবনের একটা মাইলস্টোন হয়ে গেছে। এরপর যেখানেই যাই, সবাই বলে—‘আপনার জন্মদিনে প্রধানমন্ত্রী ফোন করেছিলেন, আমি সেই অনুষ্ঠানটা দেখেছি।’এটা আমার জীবনের একটা কোয়ালিফেকশন! সুত্র কালের কন্ঠ

এই বিভাগের আরও খবর