website page counter ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি – শিক্ষাবার্তা

বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৬

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি

রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ মহান শহীদ দিবস অমর ২১শে ফেব্রুয়ারি। জাতির জীবনে অবিস্মরণীয় ও চিরভাস্বর দিন, একুশে বাঙালির চেতনার প্রতীক। ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েকজন তরুণ শহীদ হন। ইতিহাসের পাতায় তাদের মধ্যে অন্যতম রক্ত পলাশ হয়ে ফোটা সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর সহ নাম অজানা অসংখ্য ভাষাশহীদ। তাদের এ আত্মত্যাগকে স্মরণ করতে গিয়ে প্রতি বছরের একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হয় মহান ভাষা শহীদ দিবস। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (ইউনেসকো) ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর তাদের ৩০তম সম্মেলনে ২৮টি দেশের সমর্থনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০০ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি এ বিশেষ দিবসটিকে বিশ্বের ১৮৮টি দেশ প্রথমবারের মতো ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করে এবং বর্তমানেও দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘ ভাষা শহীদদের প্রতি নিঃসন্দেহে ব্যাপক সম্মান দেখিয়েছে।

একুশ আমাদের চেতনায়,একুশ আমার প্রেরণায়, একুশ আমাদের অহংকার। কবির ভাষায়-“একুশ আমার ব্যাথায় কাতর চোখের বারিধারা, একুশ আমার শূণ্য হিয়ায় আকাশ ভরা তারা, একুশ আমার রক্ত রঙ্গিন কৃষ্ণ চূড়ার ডাল, একুশ আমার ঝাজরাঁ হওয়া চোট্ট ঘরের চাল। ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’ চিরকালের এ স্লোগান আর বুকে শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ ধারণ করে, এদিন খালি পায়ে আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই শামিল হই শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য।

১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ-ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে জন্ম নেয় ভাষা-বিরোধ।পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে অস্বীকার করে উর্দু ভাষাকে চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। প্রতিবাদে সোচ্চার হন বাংলার বুদ্ধিজীবীরা। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দম্ভভরে উচ্চারণ করেন, ‘উর্দু, কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অন্য ভাষা নয়।’ জিন্নাহ’র এই ঘোষণার সাথে সাথে ময়দানে উপস্থিত জনগণ সমবেতভাবে এ ঘোষণার প্রতিবাদ করেন আবার ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে গিয়ে একই রকম ভাষণ দেন এখানেও একই রকম প্রতিবাদ হয়। মূলত তখন থেকেই সূচনা হয় ভাষা আন্দোলনের।

১৯৪৮ সালের মার্চে এ নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আন্দোলন হয় এবং ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তার চরম প্রকাশ ঘটে। ঐদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে বেরিয়ে আসেন। শ্লোগানে-প্রতিবাদে উজ্জীবিত তরুণদের রুখতে শাসকগোষ্ঠী তার প্রশাসনযন্ত্র নিয়ে মাঠে নামে। আমতলায় সমাবেশশেষে আইন পরিষদের দিকে ছাত্র-যুবারা এগিয়ে যেতে থাকেন, তাদের উপর লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে পুলিশ, ছাত্রদের দুর্বার গতি থামাতে গুলি ছোঁড়ে। মায়ের মুখের ভাষার মর্যাদা রাখতে তপ্ত রাস্তায় বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিলেন বরকত, রফিক, জব্বার, সালাম। একুশে ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে দেশবাসী প্রচন্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। উপায় না দেখে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতির মধ্যে যে চেতনার উন্মেষ ঘটে, তার চরম বিস্ফোরণ ঘটে ঊনসত্তর থেকে একাত্তরে। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে একটি সংগ্রামী ঐতিহ্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ চেতনা। বাঙালি জাতি কোনো দিন এ দিনটির স্মৃতি ভুলতে পারবে না। তাই তো প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আমরা সমস্বরে গেয়ে উঠি—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।‘২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের অহংকার, আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক।

লেখকঃ শামছুল হক

সিনিয়র শিক্ষক, সৈয়দপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ

সৈয়দপুর,নীলফামারী।

এই বিভাগের আরও খবর