নিজস্ব প্রতিবেদক।।
কোরআন ও হাদিস গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে দেখা যায়—ভোট প্রদানের বিষয়টি ইসলামের মৌলিক কয়েকটি নীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। বিশেষত, ভোটকে সাক্ষ্য, সুপারিশ, উকিল নিয়োগ এবং আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভোট মানে সাক্ষ্য প্রদান
ইসলামে সাক্ষ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ন্যায়বিচার, অধিকার সংরক্ষণ ও সমাজ পরিচালনার ভিত্তিই হলো সঠিক সাক্ষ্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা ন্যায়বিচারের ওপর অবিচল থাকো এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দাও—তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে হলেও, মাতা-পিতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৩৫)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে সাক্ষ্য গোপন করা বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া কবিরা গুনাহ।
ভোট কিভাবে সাক্ষ্য : ভোট দেওয়ার সময় একজন ভোটার মূলত এই সাক্ষ্যই প্রদান করেন—‘আমি মনে করি, এই ব্যক্তি নেতৃত্বের যোগ্য।’ অর্থাৎ ভোটের মাধ্যমে একজন প্রার্থী সম্পর্কে ভালো বা মন্দ মূল্যায়নের সাক্ষ্য দেওয়া হয়।
যদি অযোগ্য, দুর্নীতিগ্রস্ত বা জালিম কাউকে জেনে-বুঝে ভোট দেওয়া হয়, তবে তা মিথ্যা সাক্ষ্যের শামিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সাক্ষ্য গোপন কোরো না। যে ব্যক্তি তা গোপন করে, তার অন্তর অবশ্যই পাপী।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮৩)
অতএব, ভোট না দেওয়া বা ভুল ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া—উভয়ই সাক্ষ্যের ব্যাপারে গাফিলতির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
ভোট মানে সুপারিশ করা
ইসলামে সুপারিশ ভালো ও মন্দ—উভয় ধরনের হতে পারে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজে সুপারিশ করবে, সে তার অংশ পাবে। আর যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজে সুপারিশ করবে, সে তার বোঝা বহন করবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৮৫)
ভোট মূলত একটি লিখিত বা প্রকাশ্য সুপারিশ। একজন ভোটার যখন কোনো প্রার্থীকে ভোট দেন, তখন তিনি কার্যত রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে এ সুপারিশই করেন—এই ব্যক্তিকে ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেওয়া হোক।
যদি সেই ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি করে, জুলুম চালায় বা ইসলামী মূল্যবোধের বিরোধিতা করে, তবে ভোটদাতা তার দায় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে পারেন না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো জালিমকে তার জুলুমে সাহায্য করে, সে ইসলামের বন্ধন থেকে বের হয়ে যায়।’ (মুসনাদে আহমাদ)
ভোট মানে উকিল নিয়োগ
ইসলামে প্রতিনিধি বা উকিল নিয়োগ একটি স্বীকৃত ব্যবস্থা। ফিকহে ‘ওকালাহ’ অধ্যায় রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—যাকে উকিল করা হবে, তাকে অবশ্যই বিশ্বস্ত ও যোগ্য হতে হবে।
ভোটের মাধ্যমে জনগণ মূলত তাদের ক্ষমতা, মতামত ও অধিকার একজন প্রতিনিধির হাতে অর্পণ করে। অর্থাৎ ভোটপ্রাপ্ত ব্যক্তি জনগণের উকিল হিসেবে সংসদ, পরিষদ বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়। যদি কোনো অযোগ্য ব্যক্তিকে উকিল বানানো হয়, তাহলে এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত করা হয়, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।’ (সহিহ বুখারি)
ভোট একটি আমানত
আমানত ইসলামের একটি মৌলিক নৈতিক ভিত্তি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন—আমানত তার যোগ্য ব্যক্তির কাছে অর্পণ করতে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)
ভোটাধিকার আল্লাহ প্রদত্ত একটি সামাজিক আমানত, যা সঠিকভাবে ব্যবহার করা আবশ্যক।
ভোটে খিয়ানত মানে—লোভ, ভয় বা অর্থের বিনিময়ে ভোট দেওয়া। দলীয় গোঁড়ামির কারণে অযোগ্য ব্যক্তিকে সমর্থন করা; জেনে-বুঝে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার মধ্যে আমানতদারিতা নেই, তার ঈমান নেই।’ (মুসনাদে আহমাদ)
ভোট না দেওয়া : দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া
অনেকেই মনে করেন, ভোট না দিলেই দায়মুক্তি পাওয়া যাবে। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিতে বিষয়টি এত সহজ নয়। যখন ভোটের মাধ্যমে ভালো নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকে, তখন নীরব থাকা অনেক সময় মন্দকে শক্তিশালী করার শামিল হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নেক কাজে সহযোগিতা করো, পাপ ও সীমা লঙ্ঘনে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)
আখিরাতে জবাবদিহি
ভোট একটি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। ভোট মানে সাক্ষ্য দেওয়া, সুপারিশ করা, উকিল নিয়োগ করা এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত রক্ষা করা। অতএব, একজন সচেতন মুসলিমের উচিত যোগ্যতা, আমানতদারিতা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন করা। ব্যক্তিগত স্বার্থ, দলীয় মোহ ও আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ভোটকে আখিরাতের জবাবদিহির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সত্য সাক্ষ্যদানকারী, ন্যায়পরায়ণ ও আমানতদার বানান। আমিন।
শিক্ষাবার্তা /এ/১৫/০৩/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল