ফারুক মেহেদী।।
আর মাত্র অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশ একটি নতুন সরকার পেতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে রয়েছে। এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে বিএনপি জোট ও জামায়াত জোটের মধ্যে। এদের যেকোনোটিই সরকার গঠন করতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি অর্থনৈতিক কৌশল বা পরিকল্পনা প্রয়োজন হবে, যেখানে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানো এবং মূল্যস্ফীতি সহনীয় করাই হবে বড় কাজ।
এটি সবাই জানে যে বেশ কয়েক বছর ধরেই অর্থনীতি এক সংকটময় পরিস্থিতি পার করছে। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর আশা করা হয়েছিল, অর্থনীতি হয়তো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হবে। বাস্তবে তা হয়নি, বরং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, মব ভায়োলেন্সসহ নানা কারণে এর নেতিবাচক প্রভাব এসে পড়েছে অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর।
মোটাদাগে অর্থনীতিতে যে বিনিয়োগ স্থবিরতা ছিল, সেটি এখনো আছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে। ফলে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না, পুরনো শিল্পের সম্প্রসারণও থমকে আছে। ডলার সংকট কিছুটা সহনীয় হলেও এর যে দর বেড়ে গিয়েছিল, সেটি এখনো অসহনীয়।
ব্যবসায়ীরা আস্থাহীনতায়। রাজস্ব আয়ে বড় ঘাটতি। পুঁজিবাজার তলানিতে। বাজারে টাকার প্রবাহ কমাতে ও মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখতে সুদহার অনেক বাড়ানো হয়। অথচ মূল্যস্ফীতি সহনীয় হয়নি।
একের পর এক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বেকারত্ব বাড়ছে। নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। সরকারের বিনিয়োগও ঠিকমতো হচ্ছে না। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। ফলে এটিও জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারছে না। সব মিলিয়ে একটি কঠিন সংকটের মধ্যে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের জন্য পথচলাটি হবে অনেকটা ‘কাঁটা বিছানো পথে’ হাঁটার মতো। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে অর্থনীতি যখন স্থবিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির দ্বিমুখী চাপে পিষ্ট, তখন কেবল গালভরা প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন হবে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯৭ শতাংশে নেমেছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন, যদিও ২০২৬ সালে এটি ৫ শতাংশে ওঠার পূর্বাভাস রয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা এখনো বেশ কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন নতুন সরকারের জন্য অর্থনীতি পুনরুদ্ধারই হবে প্রধান অগ্নিপরীক্ষা।
গত কয়েক বছরে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের চিত্রটি ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। ২০২৫ সালের শেষার্ধে এই প্রবৃদ্ধি ৬.২৩ থেকে ৬.৫৮ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিনিয়োগকারীরা মূলত ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতি গ্রহণ করেছেন।
ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের মধ্যে চরম আস্থাহীনতা। নতুন সরকারকে প্রথমেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে সুদহার ১৫-১৬ শতাংশে নিয়ে গেছে। এতে ঋণের খরচ বাড়লেও বাজারে পণ্যের দাম কাঙ্ক্ষিত হারে কমেনি। উল্টো উচ্চ সুদের কারণে নতুন শিল্প স্থাপন থমকে গেছে। কেবল সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইনের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। সুদহারকে ধীরে ধীরে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে এনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে হবে। ডলারের বিনিময়হার কিছুটা স্থিতিশীল হলেও এলসি খোলা এবং বিশেষ করে সেটলমেন্ট বা দেনা মেটানোর ক্ষেত্রে এখনো ব্যবসায়ীরা বাধার মুখে পড়ছেন। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ কমেছে, যা ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের জন্য একটি অশনিসংকেত।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে প্রবাস আয়ের পাশাপাশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে। হুন্ডি বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রণোদনা অব্যাহত রাখতে হবে। রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকায় সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নিচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে এডিপি বাস্তবায়নের হার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ভাগে ছিল মাত্র ১৭.৫৪ শতাংশ, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
রাজস্ব খাতে ব্যাপক সংস্কার বা ট্যাক্স রিফর্ম জরুরি। করের আওতা বাড়িয়ে জিডিপিতে করের অনুপাত (যা বর্তমানে মাত্র ৬.৮ শতাংশের আশপাশে) বাড়াতে হবে। অলাভজনক মেগাপ্রজেক্টের চেয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করে এমন প্রকল্পে এডিপির বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বেকারত্ব, বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারত্বের হার বর্তমানে উদ্বেগের পর্যায়ে। শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়া এবং পুরনো কারখানাগুলোর উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়া (প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে নেমে আসা) কর্মসংস্থানকে সংকুচিত করছে।
বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো চালুর জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। আইটি ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ খাতে বিশেষ নজর দিতে হবে, যাতে তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর একক নির্ভরতা কমে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদ্যঃপ্রকাশিত ইকোনমিক আপডেট প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশে, যা নভেম্বরের তুলনায় আরো বেশি। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিই এই ঊর্ধ্বগতির প্রধান চালিকাশক্তি। বিপরীতে মজুরি মূল্যস্ফীতি প্রায় স্থবির থেকে ৮ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফলে দাম ও আয়ের মধ্যে ব্যবধান আরো বেড়েছে, যা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতাকে সংকুচিত করছে।
এই ব্যবধান দীর্ঘস্থায়ী হলে ভোগব্যয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে, যা সামগ্রিক চাহিদা ও উৎপাদন প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের সীমাবদ্ধতা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ দ্রুত কমছে না বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। নতুন সরকারের সামনে নিত্যপণ্যের দামে লাগাম টেনে মানুষকে স্বস্তি দেওয়া হবে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র সাড়ে ৬ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। অর্থাৎ মানুষ সঞ্চয় করলেও সেই অর্থ উৎপাদন ও বিনিয়োগে প্রবাহিত হচ্ছে না। এর বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এটি সামগ্রিক ঋণপ্রবাহকে বাড়িয়ে দেখালেও বাস্তবে তা বেসরকারি খাতের জন্য সুযোগ সংকুচিত করছে। নতুন সরকারকে বেসরকারি খাত চাঙ্গা করতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে হবে। সুদহার কমিয়ে আনাও একটি চ্যালেঞ্জ হবে আগামীর সরকারের জন্য।
বাজেট ঘাটতি ও রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতার কারণে সরকারকে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। এরই মধ্যে সরকার নতুন পে স্কেল ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দ্বিগুণ করার কথা বলা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করতে নতুন সরকারকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা খরচ করতে হবে। বিদ্যমান কাঠামোতে এত বিপুল অঙ্কের টাকার সংস্থান কিভাবে হবে, এর সঠিক রোডম্যাপ ঠিক করতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও বার্তাপ্রধান, কালের কণ্ঠ
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল