নিজস্ব প্রতিবেদক।।
‘করের বোঝা এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক বিরোধের’ কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের টেলিকম খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না বলে মনে করছেন দেশের অন্যতম প্রধান টেলিকম অপারেটর গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান।
তিনি বলছেন, বিনিয়োগের এই নেতিবাচক মনোভাবের প্রভাব কেবল টেলিকম নয়, অন্যান্য খাতেও পড়ছে।
গত ৬ জানুয়ারি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে ইয়াসির আজমান বলেন, “বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ (অ্যাপেটাইট) খুবই খুবই কম। এটা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় শঙ্কার কারণ।
“আমি শুধু গ্রামীণফোনের প্রেক্ষাপট থেকে এই কথাটা বলছি না। আমি অ্যামটবের (মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন) প্রেসিডেন্ট হিসেবে অন্য অপারেটরগুলোর ক্ষেত্রেও একই শঙ্কা দেখছি।”
এই ‘অনাগ্রহের’ পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গ্রামীণফোনের সিইও বলেন, “সবচেয়ে বড় বিষয়টা হচ্ছে আমাদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা আরোপ করা হয়েছে। এর ওপর আমাদের সবগুলো অপারেটরের আর্থিক বিরোধ (ফাইন্যান্সিয়াল ডিসপিউট) রয়েছে, যেগুলো বছরের পর বছর ধরে সমাধান হচ্ছে না।
“আমরা গত ২৮ বছর ধরে অপারেশনে আছি। এর মধ্যে একটি বছরও এমন নেই যখন অডিট আপত্তিগুলোর নিস্পত্তি হয়েছে। তিনটি অপারেটররেরই বিনিয়োগকারীরা হচ্ছেন বিদেশি। এই অবস্থায় তারা কী করে বাংলাদেশে অনেক বিনিয়োগ করার কথা ভাবতে পারেন?
দেশের অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগের ব্যবসা গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে যখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ‘অনাগ্রহের’ কথা বলা হচ্ছে, তখন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে উল্টো কথা শোনা যাচ্ছে।
বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়্যারম্যান আশিক চৌধুরী গত ১৫ জানুয়ারি এক ফেইসবুক পোস্টে লেখেন, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বেড়েছে ৮০ শতাংশ।
আশিক চৌধুরীর ভাষ্য, “বিদ্যুৎ, চিকিৎসা ও ব্যাংকিং খাতে বিদেশি বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি (বিনিয়োগ) এসেছে। দেশ হিসেবে চীন ও সিঙ্গাপুর থেকে এসেছে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ। ইকুইটি, রিইনভেস্টেড আর্নিং ও ইন্ট্রা-কোম্পানি লোন, সবগুলোই বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা আগেও বলেছি, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দেশে সাধারণত প্রথম বছর বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পায়।”
আর্থিক বিরোধে সমাধান কী
আর্থিক বিরোধ নিস্পত্তির জন্য আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যাওয়াকে সমাধান হিসেবে দেখছেন ইয়াসির আজমান।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব আছে। বিনিয়োগ না এলে বাংলাদেশকে ভুগতে হবে। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা কীভাবে বিষয়টা বিবেচনা করবেন? আমরা আদালতে গেছি। শুধু আমাদের (গ্রামীণফোনের) কাঁধেই সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা অনিষ্পত্তিকৃত আর্থিক বিরোধের বোঝা রয়েছে।
“রবি, বাংলালিংকেরও একই অবস্থা। এটার নিস্পত্তি হতে হবে এবং এটা (অডিট) নিয়মিত হতে হবে। আমরা আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশনে কোর্ট) যাওয়ার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন এই অপারেটরগুলো, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারকে এই অচলাবস্থার একটা গ্রহণযোগ্য উপসংহারে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।”
গ্রামীণফোনের সিইও বলেন, “(দেশের) আদালতে এই মামলা হয়ত আরও ১০ বছর ধরে চলবে। ১০ বছর পরে রায় এলে আমাদেরকে এই ১০ বছরের সুদও টানতে হবে। এভাবে কোনো ব্যবসা চলতে পারে না। যেহেতু দেশে এখন আরবিট্রেশন আইন রয়েছে, তাহলে আমরা কেন ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন কোর্টে যাব না।”
অডিট আপত্তিগুলো নিষ্পত্তির জন্য আন্তর্জাতিক সালিশির বিষয়টি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে পারে বলে মনে করছেন ইয়াসির আজমান।
তিনি বলেন, “ইনভেস্টেমেন্টের এই কনফিডেন্স যদি ফিরিয়ে না আনা যায়, তাহলে টেলিকমের মতো ক্যাপিটাল ইনটেন্সিভ খাতে লোকাল ইনভেস্টমেন্ট দিয়ে চালানো খুবই ডিফিকাল্ট। দেশের টাওয়ার কোম্পানিগুলো ব্যর্থ হয়েছে। এনটিটিএনগুলোও নাজুক অবস্থায় আছে, যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
“এখানে আসলে ভালো গ্লোবাল ফরেন ইনভেস্টর দরকার, সঙ্গে লোকাল পার্টনারশিপ থাকতে পারে। আমরা চাই ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন ল হোক। এটা সলভ করা খুবই দরকার। তিনটি অপারেটরই এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটা শুধু টেলিকম খাতের ক্ষতি করছে না, পুরো দেশের বিদেশি বিনিয়োগের ভাবমূর্তির ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”
মোবাইল সেবার করকাঠামো নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে ইয়াসির বলছেন, “বাংলাদেশের মত এত ট্যাক্স আর কোনো দেশে খুঁজে পাই না। এগুলো আমাদের সমাধান করতে হবে। প্রতি ১০০ টাকা রাজস্বের ৫৫ শতাংশই চলে যায় ট্যাক্স-ভ্যাটে। এরওপর পরিচালন ব্যায় রয়েছে। এর মধ্যে এসএমপি আমাদের নিচে নামিয়ে আনছে, আমাদের উদ্ভাবনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমাদের প্রতিটি প্রোডাক্ট ও সেবা চালুর ক্ষেত্রে তাদের অনুমোদন নিতে হয়। যেটা অনেক সময়সাপেক্ষ ও আলোচনায় বছর চলে যায়।”
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বিনিয়োগে ‘অনীহার’ কোনো সম্পর্ক আছে কি না জানতে চাইলে ইয়াসির আজমান বলেন, “বিনিয়োগের সঙ্গে আমি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যুক্ত করব না। আমরা বৈশ্বিক টেলিকম অপারেটর টেলিনর দ্বারা পরিচালিত। আমরা আমাদের নীতিগুলোকে ভিত্তি করে চলি। আমাদের আগেও সমস্যা ছিল, এখনো আছে।”
গ্রাহকের অভিযোগ, অপারেটরের ক্ষোভ
একদিকে অপারেটরগুলো বলছে তারা লাভ করতে পারছে না, অন্যদিকে গ্রাহকদের কাছে মোবাইল ডেটা ও কলসেবার মূল্য বৃদ্ধি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিনিয়োগের বাধাগুলো দূর করতে পারলে দুই পক্ষেরই এই সমস্যা কমে আসবে বলে মনে করেন ইয়াসির আজমান।
তিনি বলেন, “দুই বছর আগে যারা ১০০ টাকা ব্যায় করছিলেন, সেখানে এখন ২০০ টাকা করছেন। কিন্তু যখন আমরা আমাদের রিপোর্টগুলো দেখি, তখন দেখা যায় আমাদের আরপু (গ্রাহক প্রতি আয়) বাড়েনি।
“আমাদের প্রতি মেগাবাইট ডেটার দাম গত বছরই ১১ শতাংশ কমানো হয়েছে। আমরা আমাদের দিক থেকে দাম কমাচ্ছি, তাদের দিক থেকে প্রবৃদ্ধি কমছে। কিন্তু আবার গ্রাহকের দিক থেকে তারা দেখছেন তাদের খরচ বাড়ছে। কারণ তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি বেশি ডেটা ব্যবহার করছেন।”
বিনিয়োগের বাধাগুলো দূর করতে পারলে দুই পক্ষের সমস্যাই কমে আসবে মন্তব্য করে ইয়াসির আজমান বলেন, “ট্যাক্স এর উচ্চহার আমাদের অনেক কিছুর ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
ফিক্সড ব্রডব্যান্ড লাইনের সঙ্গে মোবাইল ডেটার দামের এত ফারাক কেন–এমন প্রশ্নের জবাবে গ্রামীণফোনের সিইও বলেন, “আপনি বাসায় যে ইন্টারনেট ইউজ করেন, তাদের ট্যাক্স-ভ্যাট দিতে হয় ৫ শতাংশ। আর আমরা দিই ৫৫ শতাংশ।
“এই হিউজ গ্যাপে দামের এই প্রবলেমগুলো থাকবে। এই সমস্যার সমাধান পেতে হলে ওটা (ব্রডব্যান্ডের করকাঠামো) একটু উঠতে হবে আর এটা (মোবাইলের কর) একটু নামতে হবে। কিন্তু সেটা হচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “আপনি ভাবছেন হোম ইন্টারনেটে আপনার হয়ে যাচ্ছে আর আপনি যখন বাইরে যাচ্ছেন তখন এক ঘণ্টার ইন্টারনেটের জন্য মোবাইল ডেটা কিনবেন। আবার আপনি আশা করছেন বাসা-বাড়ির দামে মোবাইল অপারেটরেরা আপনাকে ইন্টারনেট দেবে–এটা সম্ভব না।”
‘ডেটায় সাবসিডি’
ডেটার দাম বৃদ্ধি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে যাচ্ছেন গ্রাহকেরা। তবে গ্রামীণফোনের সিইও বলছেন, গত বছরও তারা ডেটার দাম কমিয়েছেন।
ডেটার ব্যবসাটা মূলত ভর্তুকি দিয়ে চালানো হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, “আপনি যদি প্রাইসিং দেখেন, বাংলাদেশে ডেটা আসলে সাবসিডিতে চলে, আমরা এখনো ভয়েস এ বিজনেস করতে পারছি বলে এটা করা সম্ভব হচ্ছে।
“নিয়ন্ত্রক সংস্থা চেষ্টা করেছিল একটা ন্যূনতম দর (ফ্লোর প্রাইস) বেঁধে দিতে। তারা এসে দেখে পুরো কস্ট পোষাইতে গেলে ফ্লোর প্রাইস অনেক ওপরে চলে যাবে। এ কারণে সেটা আর হয়নি। সো আমরা এখনো সাবসিডিতে আছি।”
তবে ভয়েস কলের হার দ্রুত কমছে জানিয়ে ইয়াসির আজমান বলেন, “একটা সময় ছিল আমাদের প্রতিদিন সাড়ে চারশ থেকে ৪৭০ মিলিয়ন মিনিট গেছে। এখন সেখানে তিনশ মিলিয়ন মিনিট উঠতে আমাদের সমস্যা হয়।
“ডেভেলপড মার্কেটে মিনিটের ব্যবসা একেবারে কমে গেছে। এখন আমাদের এখানেও তা হবে। এই অবস্থায় ট্যাক্সের চাপটা আমাদের ওপর মারাত্মকভাবে পড়ছে। আপনি যদি গ্রাফ দেখেন, এভাবে মিনিট কমতে থাকলে পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে গ্রামীণফোন আর লাভজনক থাকবে না।”
গ্রাহক কমছে কেন?
গত দেড় বছরে মোবাইল ফোনের গ্রাহক সংখ্যা ৯০ লাখের মত কমে যাওয়ার তথ্য মিলছে বিটিআরসির পরিসংখ্যানে।
কী কারণে এত গ্রাহক কমল জানতে চাইলে ইয়াসির আজমান বলেন, “এখন আইএসপির ভলিউম বাড়ছে। সো আমাদের ভলিউমটা ওখানে শিফট হয়ে যাচ্ছে। ট্যাক্সের কারণে (কম থাকায়) ওরা যে দাম দিতে পারছে আমরা সেটা দিতে পারব না।
“আরেকটা বিষয় হচ্ছে এখন একেটা ট্রনজিশন পিরিয়ড। ম্যাক্রো ইকোনমি ভেরি উইক। এই অবস্থায় গ্রাহকের মোবাইল ব্যবহার বাড়েনি। দামটা একটু এদিক-ওদিক করলেই গ্রাহক পড়ে যায়। এ বছর মনে হয় না তিনটা অপারেটরের কেউ গ্রোথ (প্রবৃদ্ধি) দেখাতে পারবে।”
টেলকো খাতে যা চলছে
বিগত বছরগুলোতে গ্রাহকদের কিস্তিতে স্মার্টফোন দিতে না পারাকে এই খাতের বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন ইয়াসির আজমান।
তার ভাষ্য, কিস্তিতে ফোন দিতে না পারায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীও বাড়ছে না। তবে সম্প্রতি ফোনে সিম লকের অনুমতি পাওয়ায় কিস্তিতে ফোন দেওয়া শুরু হয়েছে।
মোবাইল হ্যান্ডসেট নিবন্ধনের বহুল আলোচিত এনইআইআর পদ্ধতি নিয়ে কিছু বলতে চাননি গ্রামীণফোনের সিইও।
রবি ও গ্রামীণফোনের পাল্টাপাল্টি মামলা নিয়ে জানতে চাইলে ইয়াসির আজমান বলেন, “এটা আমার মনে হয় খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। এটা গ্রাহকদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। এটা হতে পারে তারা আমাদের মনে করিয়ে দিতে চায় যে এখানে একটা প্রতিযোগিতা কমিশন আছে, আমাদের সংযত আচরণ করতে হবে।
“তাদের দৃষ্টি থেকে তারা মনে করে আমাদের কাজে ভুল আছে, আবার আমরা মনে করি কোনো ভুল নেই। এটা আদালতে সমাধান হয়ে যাবে। এটা সরকার বা গ্রাহককে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।”
অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নতুন আশা দেখার কথা জানিয়ে গ্রামীণফোনের সিইও বলেন, “এই বছরে অনেক আপস অ্যান্ড ডাউনসের মধ্য দিয়ে গেলেও আমি প্রোগ্রেসের কথাই বলব। এখানে বছর জুড়ে টেলিকম পলিসি নিয়ে কাজ হয়েছে।
“এছাড়া রেগুলেটর নতুন স্পেক্ট্রাম নিলামের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। এটা আমাদের মধ্যে নতুন আশা জাগিয়েছে।”
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল