।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার নাজুক অবস্থার সবচেয়ে বড় প্রকাশ হয় পাঠ্যক্রমের ঘনঘন পরিবর্তনে। তিন বছরের ব্যবধানে তিনবার কারিকুলাম বদলে যাওয়ার নজির পৃথিবীর খুব কম দেশেই আছে। এই পরিবর্তনকে অনেক সময় “শিক্ষা উন্নয়নের পথ” হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এর সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর। পাঠ্যক্রম বদল মানেই বই বদল, পরীক্ষা বদল, শেখার ধরণ বদল—আর তার সঙ্গে জুড়ে যায় মানিয়ে নেওয়ার এক বিশাল চাপ। এই চাপ এখন অনেক শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিতে পরিণত হচ্ছে।
একটি শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি হলো স্থিতিশীলতা। শিশুরা নিয়মিত ও অভ্যাসগত শেখার মাধ্যমে ধীরে ধীরে জ্ঞান, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষাক্রমের অস্থিতিশীলতা শিক্ষার্থীদের শেখার ধারাকে প্রতিনিয়ত ভেঙে দিচ্ছে। ২০২২ সালে শুরু হওয়া নতুন কারিকুলাম এখনো ভালোভাবে বাস্তবায়নের আগেই তাতে এসেছে একাধিক ধাপে পরিবর্তন। কখনও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে, কখনও বিষয়বস্তুর কাঠামোয়, কখনও বা পরীক্ষার ফরম্যাটে এসেছে নতুন ধারা। শিশুদের জন্য এগুলো বুঝে ওঠা, মানিয়ে নেওয়া অনেক সময় প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিশু ও কিশোর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাদিয়া আফরিন সতর্ক করে বলেছেন— “খুব অল্প সময়ের মধ্যে কারিকুলাম বারবার পরিবর্তন করলে শিক্ষার্থীদের মানিয়ে নিতে বড় সমস্যা হয়। কেউ কেউ পড়ালেখায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, কেউ ঝরে পড়ে।” তাঁর মতে, অনেক শিশুই ইতিমধ্যে এমন মানসিক অবস্থায় পৌঁছে গেছে যেখানে স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে বা বই খুললেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে কারিকুলাম পরিবর্তনের কারণে যে মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তা একমাত্র পাঠ্য বোঝার সমস্যায় সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়ছে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক মেলামেশার ওপরও। এর ফলে – আগের পদ্ধতিতে ভালো রেজাল্ট করা শিশুরাও নতুন পদ্ধতিতে নিজেকে অক্ষম মনে করছে। ফলে স্কুলে যাওয়া বা পড়ালেখায় মনোযোগ কমছে। হঠাৎ করে পদ্ধতি বদলে যাওয়ায় শিশুদের মধ্যে এক ধরনের ‘আমি পারছি না’ মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে যাচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের মধ্যে বিষণ্নতা, খাওয়ায় অনাগ্রহ, আচরণগত পরিবর্তন—এসব দেখা দিচ্ছে। বাবা-মা শিশুকে পড়তে চাপ দিলে সেটা আরও মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। শিশু হয়ে উঠছে আরও সংবেদনশীল ও ভীত।
এই মানসিক চাপ কেবল সাময়িক নয়—এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে শিশুর শেখার ক্ষমতা, ভবিষ্যৎ একাডেমিক সাফল্য ও সামাজিক বিকাশে।
এই সংকটে শিশুর পাশে প্রথমেই দাঁড়াতে হবে শিক্ষক ও অভিভাবকদের। একজন শিক্ষকের ভূমিকাই হতে পারে শিশুর মানিয়ে নেওয়ার প্রথম সেতুবন্ধ। ডা. সাদিয়া আফরিন বলছেন, “শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের আগেই ধারণা দিতে পারেন—এই নতুন বিষয়টি ততটা কঠিন নয়, এটা আগেও কিছুটা ছিল, তুমি পারবে। এতে শিশুর ভয় কমে।” অভিভাবকদেরও এখানে ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান প্রথম দিকে যদি নতুন কারিকুলামে খারাপ রেজাল্ট করে, সেটা নিয়ে অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে তাকে উৎসাহিত করতে হবে। শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগানো—“তুমি পারবে”—এই বোধই তার মানসিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি। শিক্ষক ও অভিভাবকের সম্মিলিত সহানুভূতিশীল আচরণ শিশুদের জন্য হতে পারে নিরাপত্তার বলয়। যেখানে নতুন সিলেবাসকে ‘অভিশাপ’ নয়, ‘নতুন শেখার সুযোগ’ হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব।
শিক্ষানীতি প্রণয়নের সময় শিশুদের মনোজগত নিয়ে পরিকল্পনা খুব কমই করা হয়—এটাই মূল সংকট। কারিকুলাম প্রণয়ন বা পরিবর্তনের সময় যদি শিশু মনোবিজ্ঞানীদের অন্তর্ভুক্ত করা হতো, তবে এই ধরনের মানসিক চাপ অনেকটাই কমানো যেত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নতুন পদ্ধতি চালুর আগে স্কুল, শিক্ষক ও অভিভাবকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ বা অবহিত করা হয় না। ফলে হঠাৎ পরিবর্তন সবার জন্যই এক ধরণের ধাক্কা হয়ে আসে—আর সবচেয়ে বেশি ভোগে শিশু। মনোরোগ বিশেষজ্ঞেরা বলেছেন, “শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে যে নতুন কারিকুলাম আগের চেয়ে ভালো, এতে শেখার মান বাড়বে।” কিন্তু সেটি বোঝানোর জন্য যে প্রস্তুতি দরকার, তা এখনো অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।
পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষের কাঠামো—সবকিছু যদি সমন্বিত না হয়, তবে কারিকুলাম যতই ভালো হোক না কেন, তা শিশুদের কাছে হয়ে উঠবে আতঙ্কের প্রতীক। বিশ্বের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়—কারিকুলাম হঠাৎ বদলানো হয় না। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সামাজিক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে পরিবর্তন আনা হয়। যেমন ফিনল্যান্ডে নতুন শিক্ষা নীতি চালুর আগে অন্তত পাঁচ বছর পাইলট প্রোগ্রাম চালানো হয়েছিল। শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থী—সবার মতামত নেওয়া হয়েছিল, যাতে শিশুদের মানসিক চাপ কম থাকে। বাংলাদেশেও এমন একটি গবেষণাভিত্তিক, ধীরগতির ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতি গ্রহণ জরুরি। প্রতি দুই-তিন বছরে কারিকুলাম বদলে শিক্ষাব্যবস্থার কোনো উন্নয়ন হয় না—বরং তৈরি হয় এক প্রজন্মের মানসিক অস্থিরতা।
শিক্ষাক্রম পরিবর্তন বন্ধ করা সম্ভব না হলেও সেটিকে শিশু–বান্ধব ও বাস্তবসম্মত করে তোলা সম্ভব। এজন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনায় আনা জরুরি— কারিকুলাম পরিবর্তনের সময় শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতামত বাধ্যতামূলক করা। নতুন পদ্ধতি চালুর আগে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা দেওয়া। স্কুল পর্যায়ে অভিভাবকদের জন্য ওরিয়েন্টেশন আয়োজন করা। হঠাৎ করে নয়, বরং কয়েকটি ধাপে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন করা। স্কুলে কাউন্সেলর বা মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা।
এই পদক্ষেপগুলো নিলে শিশুদের জন্য কারিকুলাম পরিবর্তন আর আতঙ্কের বিষয় হবে না, বরং হয়ে উঠতে পারে নতুন শিক্ষাগত সম্ভাবনার দ্বার। প্রতিটি শিশুর শেখার গতি ও ধরণ আলাদা। কেউ খুব দ্রুত নতুন কিছু আয়ত্ত করতে পারে, আবার কেউ সময় নেয়। এই পার্থক্যটুকু বুঝতে না পারলেই তৈরি হয় হতাশা, বিষণ্নতা ও ঝরে পড়া। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যদি সত্যিকারের শিশুকেন্দ্রিক হতে চায়, তবে শিশুদের শেখার মানসিক গঠনকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাঠ্যক্রম হবে শিশুর জন্য—শিশুকে পাঠ্যক্রমের জন্য তৈরি করতে গিয়ে তার মনোবল ভেঙে ফেলা হবে না।
শিক্ষা কেবল বই ও পরীক্ষার বিষয় নয়—এটি একটি শিশুর আত্মবিশ্বাস, মানসিক বিকাশ ও সামাজিক সক্ষমতার ভিত্তি। সেই শিক্ষাব্যবস্থা যদি অস্থিতিশীল হয়, তবে শিশুর মনের ভেতর তৈরি হয় ভয়, অনাগ্রহ ও হতাশা।
ঘনঘন পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের এই প্রবণতা তাই শুধু শিক্ষাব্যবস্থার জন্যই নয়, একটি প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও বিপজ্জনক সংকেত। নীতি-নির্ধারকদের বোঝা উচিত, একটি ভালো কারিকুলামের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—একটি স্থিতিশীল, মানসিকভাবে সহায়ক এবং শিশুবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা। আর সে জন্য শিক্ষার্থীর মনোজগত, শিক্ষক ও অভিভাবকের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই হতে পারে একমাত্র সমাধান।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা /এ/১০/১০/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল