এইমাত্র পাওয়া

ডিপ্রেশন থেকে মৃত্যু: মাঝের গল্পটা আমরা কতটা জানি?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ আত্মহত্যার মাধ্যমে তাদের জীবন শেষ করে দেন। একটি নিঃশব্দ সিদ্ধান্ত—যার পেছনে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে জমে ওঠা এক অদৃশ্য যুদ্ধ। আমরা যখন কারো আত্মহত্যার খবর শুনি, তখন অবচেতনে প্রশ্ন করি—“কেন?” কিংবা “কার কারণে?” কিন্তু উত্তরটি সবসময় এত সরল নয়। আত্মহত্যা কখনো একটি সিদ্ধান্ত মাত্র নয়, বরং এটি অনেকগুলো সামাজিক, মানসিক ও পারিপার্শ্বিক সমস্যার জটিল সমষ্টি।

আজ ১০ সেপ্টেম্বর — বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। এই দিনে আমরা শুধু একটি সচেতনতা পোস্ট বা কিছু উদ্বেগের কথা বলেই থেমে যাই না, বরং গভীরভাবে ভাবি, “আত্মহত্যার পেছনে আসলে দায়ী কে?”

আত্মহত্যা হলো নিজের জীবনের প্রতি এক ধরনের পরাজয় স্বীকার করে নেওয়া। কিন্তু এটি কি কেবল ব্যক্তির দুর্বলতা? নাকি তার চারপাশের সমাজ, পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং সামষ্টিক ব্যবস্থারও ব্যর্থতা? আত্মহত্যার সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ, ভগ্নস্বপ্ন, ভয়, অনিশ্চয়তা, অবহেলা এবং অসহ্য একাকীত্ব।

একটি মানুষের আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেবার আগে সাধারণত সে বহু পর্যায়ে মানসিক অবসাদের মধ্য দিয়ে যায়। এই অবসাদের পেছনে অনেকগুলো কারণ কাজ করতে পারে। নিচে তা বিশ্লেষণ করে দেখানো হলো:

ডিপ্রেশন কারণটিকে আত্মহত্যার সবচেয়ে বড় উৎস বলা যায়। দীর্ঘদিন ধরে হতাশায় ভোগা, জীবনের প্রতি আগ্রহ হারানো, আত্মবিশ্বাসের ভাঙন, একাকীত্ব—এই সবকিছু একজন মানুষকে নিঃশেষ করে দেয়। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, বহু মানুষ এই যন্ত্রণা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে না। তারা হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে রাখে এক গভীর বিষাদ। অনেক সময় পরিবার-পরিজন, বন্ধুরাও বুঝতে পারে না—একটি চঞ্চল, সফল বা প্রাণবন্ত মানুষ আসলে ভেতরে কেমন যুদ্ধ করছে।

আর্থিক অনিশ্চয়তা ও বেকারত্ব আত্মহত্যার অন্যতম কারণ। সমাজে আজকের দিনে একজন ব্যক্তি তার মূল্য নির্ধারণ করে ‘উৎপাদন ক্ষমতা’ ও ‘আয়ের ভিত্তিতে’। এই চাপে অনেকেই নিজেকে ব্যর্থ মনে করে। যুব সমাজে আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হিসেবে রয়েছে চাকরির অভাব, স্বপ্নভঙ্গ, এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা। ঋণের বোঝা, পরিবারের প্রত্যাশা ও সামাজিক চাপে পড়ে অনেকেই বেছে নেয় আত্মহননের পথ।

মানুষের আবেগের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হলো তার কাছের সম্পর্কগুলো। প্রেমে ব্যর্থতা, বৈবাহিক কলহ, পরিবারের সদস্যদের অবহেলা—এসব বিষয় মানসিকভাবে মানুষকে ভেঙে দেয়। সম্পর্ক ভেঙে গেলে শুধু একজন সঙ্গী হারায় না, বরং আত্মবিশ্বাস, নিজের প্রতি বিশ্বাস, জীবনের লক্ষ্য—সব কিছু টুকরো টুকরো হয়ে যায়। অনেক কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণী শুধুমাত্র প্রেমের সম্পর্ক ভাঙার হতাশা থেকে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।

আমাদের সমাজে ‘ব্যর্থ’ শব্দটির জন্য কোনো সহানুভূতি নেই। পরীক্ষায় খারাপ ফল, পেশাগত ব্যর্থতা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের সংকট—যেকোনো কিছু মানুষকে সমাজের চোখে ছোট করে তোলে। ‘মানুষ কি বলবে?’ এই এক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই অনেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। আজও আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যকে নিয়ে কথা বলা লজ্জার বিষয় মনে করা হয়। ফলে অনেকেই সাহায্য চাইতে গিয়ে নিজেকে আরও বেশি একা ভাবেন।

মাদক সেবন মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্মকে প্রভাবিত করে। সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা কমে যায়, আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি অনেক সময় অল্প বিষণ্ণতা বা হতাশা থেকেই গুরুতর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। সমাজে মাদক সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় তরুণ সমাজের মধ্যে আত্মহত্যার হারও বাড়ছে।

জীবনের প্রতি আকর্ষণ তখনই থাকে, যখন বেঁচে থাকার মানে থাকে। কিন্তু ক্যানসার, কিডনি রোগ, পক্ষাঘাতের মতো দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতা অনেক সময় সেই মানে কেড়ে নেয়। যখন জীবন কেবল ব্যথা, নির্ভরতাভর এবং চিকিৎসার ব্যয়ে জর্জরিত হয়ে পড়ে, তখন কেউ কেউ ‘মুক্তি’ খোঁজেন মৃত্যুর মধ্যে।

বর্তমানে কিশোর ও তরুণদের আত্মহত্যার পেছনে একটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে সাইবার বুলিং। অনলাইনে ট্রল, অপমান, ব্ল্যাকমেইলিং কিংবা অপপ্রচার—এসব মানসিকভাবে একজন ব্যক্তিকে চূড়ান্তভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। অনেক সময় একজন কিশোর তার সামান্য ভুলের জন্যও ব্যাপক সামাজিক চাপের মুখে পড়ে। যাদের মানসিক সহ্যশক্তি কম, তারা এই চাপ নিতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

এতসব কারণের পেছনে মূল বিষয় একটাই—মানসিক স্বাস্থ্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমরা এখনো মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেই না। মানসিক কষ্টকে ‘দুর্বলতা’ মনে করি। কাউকে কাউন্সেলিং করতে বললে, তাকে ‘পাগল’ তকমা দিই। অথচ শারীরিক অসুস্থতায় যেমন ডাক্তার দেখানো হয়, তেমনই মানসিক কষ্টেও চিকিৎসা দরকার।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে -স্কুল, কলেজ, কর্মস্থলে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা এবং কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা। পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীদের মধ্যে সহানুভূতিশীল মনোভাব গড়ে তোলা। হেল্পলাইন, অনলাইন কাউন্সেলিং সার্ভিস সহজলভ্য করে তোলা। যাতে মানুষ নির্ভয়ে কাউন্সেলিং নিতে পারেন। আত্মহত্যা নিয়ে রিপোর্ট করার সময় যেন সেটি কাউকে উদ্ভূত না করে, সেই বিষয়ে গাইডলাইন অনুসরণ করা।

প্রশ্নটা খুব সহজ, উত্তরটা জটিল। আত্মহত্যার পেছনে দায়ী কেবল ব্যক্তি নিজে নয়, বরং তার চারপাশের পরিবেশও। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, এমনকি বন্ধুদের অবহেলাও দায়ী হতে পারে। অনেক সময় একটি সহানুভূতির স্পর্শ, একটি প্রশ্ন—“তুমি কেমন আছো?”, কিংবা কিছু সময় মন দিয়ে শুনে নেওয়া—একটি জীবন বাঁচাতে পারত।

আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়। এটি আরেকটি অজস্র হৃদয়বিদারক যন্ত্রণার সূচনা। আত্মহত্যাকারীর কষ্ট হয়তো শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার প্রিয়জনদের কাছে শুরু হয় এক অনন্ত শূন্যতা। আজ এই আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব—নিজের চারপাশের মানুষগুলোকে বোঝা, মনোযোগ দেওয়া, পাশে থাকা।

লেখক: সম্পাদক,  শিক্ষাবার্তা। 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.